বিক্রি বাড়লেও মতিন স্পিনিংয়ের মুনাফায় ধস

0
789

সিনিয়র রিপোর্টার : নতুন ইউনিট উৎপাদনে আসার পর মতিন স্পিনিং মিলস লিমিটেডের বিক্রি বেড়েছে। তবে উৎপাদন, প্রশাসনিক ও বিপণন সব পর্যায়ে কোম্পানিটির খরচ তার চেয়ে বেশি বেড়েছে।

পাশাপাশি এফডিআর থেকে সুদ আয় কমলেও বেড়েছে ঋণের বিপরীতে সুদ ব্যয়। সব মিলিয়ে ২০১৬-১৭ হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে কোম্পানিটির নিট মুনাফা ৪৬ শতাংশের বেশি কমে গেছে।

বস্ত্র খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির সর্বশেষ অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, নতুন মিল্যাঞ্জ ইউনিটে পুরোপুরি ও সিনথেটিক ইউনিটে আংশিক উৎপাদন শুরু হওয়ায় ২০১৬ সালের জুলাই থেকে গত মার্চ পর্যন্ত (প্রথম তিন প্রান্তিক) মতিন স্পিনিংয়ের বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৬ দশমিক ৩০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ২১১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

তবে গ্যাস সংকট, বেতন-ভাতা ও অবচয় বাবদ ব্যয় বাড়ার কারণে কোম্পানির উৎপাদন খরচ ৬৬ দশমিক ৩১ শতাংশ বেড়ে হয় ১৮৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এতে মোট (গ্রস) মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ২৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

এরপর কোম্পানিটির প্রশাসনিক ও বিপণন ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২ দশমিক ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এতে প্রথম তিন প্রান্তিকে পরিচালন মুনাফা ৪১ দশমিক ৬০ শতাংশ কমে ২২ কোটি ৯৫ লাখ টাকায় নেমে আসে।

এদিকে এফডিআরের সুদ বাবদ ২০১৫-১৬ হিসাব বছরের প্রথম নয় মাসে ১৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা আয় হলেও এবার তা ৫০ দশমিক ১২ শতাংশ কমে ৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। এর আগে ২০১৪-১৫ হিসাব বছরে এফডিআরের সুদ বাবদ ২০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা আয় হয়েছিল কোম্পানিটির।

এফডিআর থেকে সুদ আয় কমলেও হিসাব বছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানির সুদ ব্যয় বেড়েছে ৪০ শতাংশ। এরপর শ্রমিক তহবিল ও কর পরিশোধের পর নিট মুনাফা দাঁড়ায় ১৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যেখানে গত বছরের একই সময়ে মুনাফা হয়েছিল ২৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে নিট মুনাফা কমেছে ১৩ কোটি টাকা বা ৪৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। এ সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ১ টাকা ৫৬ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২ টাকা ৯১ পয়সা।

মতিন স্পিনিংয়ের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা এএইচএম আরিফুল ইসলাম বলেন, গ্যাস সংকটের মধ্যে কারখানা সচল রাখতে গিয়ে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করতে হয়েছে আমাদের। এ খাতে ব্যয় প্রায় চার গুণ বেড়েছে।

এছাড়া ২০১৬-১৭ হিসাব বছরে নতুন দুই প্রকল্পের যন্ত্রপাতির বিপরীতেও অবচয় ধার্য করতে হয়েছে কোম্পানিকে, যা মোট অবচয় ব্যয় বাড়িয়েছে। বেতন-ভাতা বাবদ কোম্পানির ব্যয়ও বেড়েছে। এফডিআর থেকে সুদ বাবদ আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। মুনাফা হ্রাসের পেছনে প্রতিটি কারণই গুরুত্বপূর্ণ। তবে আগামীতে পরিস্থিতির উন্নতি সম্পর্কে তিনি আশাবাদী।

প্রসঙ্গত, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৪ সালে মিল্যাঞ্জ ও সিনথেটিক প্রকল্প হাতে নেয় মতিন স্পিনিং মিলস লিমিটেড। এর মধ্যে মিল্যাঞ্জ প্রকল্পের জন্য আইপিওর মাধ্যমে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে পুঁজিবাজার থেকে ১২৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা সংগ্রহ করে মতিন স্পিনিং। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১২৩ কোটি টাকা।

আইপিওর অর্থ হাতে পাওয়ার এক বছরের মধ্যেই মিল্যাঞ্জ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের ১৪ মাস পরে ২০১৬ সালের ২৮ মার্চ থেকে এ প্রকল্পের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে মতিন স্পিনিং। দৈনিক ১০ টন উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এ প্রকল্প চালুর ফলে কোম্পানির মোট উৎপাদনক্ষমতা দৈনিক ৩৫ টনে দাঁড়ায়।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্নে ব্যর্থতা ও অনুমোদন ছাড়া আইপিওর অর্থ ব্যাংকে এফডিআর হিসেবে জমা রাখার কারণে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) মতিন স্পিনিংয়ের চেয়ারম্যান ও এমডিসহ আট পরিচালককে জরিমানাও করেছিল।

অন্যদিকে ২০১৪ সালের নভেম্বরে দৈনিক সাত টন উৎপাদন সক্ষমতাসম্পন্ন সিনথেটিক ইয়ার্ন ইউনিটের স্থাপনের ঘোষণা দেয় মতিন স্পিনিং। পরে ২০১৬ সালের এপ্রিলে সিনথেটিক ইয়ার্ন ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা দৈনিক সাত থেকে ১৬ টনে উন্নীত করার কথা জানায় কোম্পানিটি।

এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১৫১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৮৬ কোটি টাকা বা ১ কোটি ১২ লাখ ডলার এইচএসবিসি ব্যাংক থেকে ঋণ হিসেবে নেয়া হয়। আর বাকি ৬৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থায়ন করা হয়। সিনথেটিক ইয়ার্ন ইউনিটে ২০১৬ সালের ১০ নভেম্বর আংশিক উৎপাদন এবং চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন শুরু হয়।

ডিবিএল (দুলাল ব্রাদার্স লিমিটেড) গ্রুপের স্পিনিং প্রকল্প মতিন স্পিনিং মিলস লিমিটেড ২০০৬ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়। ২০১৪ সালে কোম্পানিটি শেয়ারবাজারে আসে। তাদের কারখানায় মূলত টেক্সটাইল মিলের জন্য কার্ডেড, কম্বড, স্ল্যাব, সিনথেটিক ও মিল্যাঞ্জ— পাঁচ ধরনের সুতা প্রস্তুত হয়।

মতিন স্পিনিংয়ের অনুমোদিত মূলধন ১৫০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ৯৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। রিজার্ভ ২১৬ কোটি ৪২ লাখ টাকা। কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা ৯ কোটি ৭৪ লাখ ৯০ হাজার। এর মধ্যে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে ৩২ দশমিক ৭২ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ৫০ দশমিক ৭৬ ও বাকি ১৬ দশমিক ৫২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে।

ডিএসইতে গতকাল সর্বশেষ ৪০ টাকা ৩০ পয়সায় মতিন স্পিনিংয়ের শেয়ার বেচাকেনা হয়। গত এক বছরে কোম্পানিটির শেয়ারদর ৩৫ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ৪৯ টাকা ৭০ পয়সার মধ্যে ওঠানামা করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here