`বিকলাঙ্গ ব্যাংকিং ব্যবস্থা’

0
286

স্টাফ রিপোর্টার : তারল্য সমস্যার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ব্যাংকগুলোর বিধিবদ্ধ নগদ জমার (সিআরআর) পরিমাণ কমানোর সিদ্ধান্তের ব্যাপক সমালোচনা করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

সংস্থাটির সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ব্যাংক খাতে তারল্যের ঘাটতি কোনো সমস্যা নয়। এটা রোগের উপসর্গের মতো। রোগ হচ্ছে, দেশে বিকলাঙ্গ ব্যাংকিং ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। এ খাতটিকে ‘এতিম’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক এ খাতটিকে রক্ষার পরিবর্তে অপব্যবহার করছে।

মঙ্গলবার আসন্ন ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এসব কথা বলেন। ওই অনুষ্ঠানে বাজেট প্রস্তাবের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতিও তুলে ধরেন সংস্থাটির গবেষকরা।

রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। এ ছাড়া সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বক্তব্য রাখেন। বাজেট প্রস্তাব তুলে ধরেন গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।

বাজেট প্রস্তাবে আসন্ন ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে জিডিপির অনুপাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে সিপিডি। এই তিন খাতে আগামী অর্থবছরের জিডিপির ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ বরাদ্দ করার প্রস্তাব করেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে নির্বাচনী ভাবনায় প্রকল্প না নিয়ে চলমান বড় প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন, করপোরেট কর হার হঠাৎ না কমানো, রফতানি খাতের প্রণোদনা পুনর্বিবেচনাসহ বিভিন্ন প্রস্তাব এসেছে সংস্থাটির পক্ষ থেকে।

সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিষয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, প্রবৃদ্ধি, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আয়- এই চারটির মধ্যে সমন্বয় নেই। কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি থেকে বেরিয়ে এখন আয়হীন কর্মসংস্থান হচ্ছে। কর্মসংস্থান বেড়েছে, কিন্তু প্রকৃত ২ দশমিক ৫০ শতাংশ কমেছে। নারীদের আয় কমেছে পুরুষের চেয়ে বেশি। আবার গ্রামের আয় কমেছে শহরের চেয়ে বেশি। পড়াশোনা করে বেকার থাকছে বেশি।

আঞ্চলিক বৈষম্য বেড়েছে। এ জন্য ভাবতে হবে- কী ধরনের উন্নয়ন হচ্ছে। কর্মসংস্থান হচ্ছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। এর অন্যতম কারণ প্রবৃদ্ধি যতটা বেড়েছে, তার পুরোটাই সরকারি বিনিয়োগের কারণে। প্রবৃদ্ধির যে চরিত্র কর্মসংস্থানে দেখা যাচ্ছে, তাতে গরিব মানুষ মারা যাবে। যে উন্নতির কথা বলা হচ্ছে, তার কোনো ইতিবাচক ফল সাধারণ মানুষ পাবে না। এ জন্য সিডিপির পরামর্শ- সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধির হিসাবে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়েনি। কিন্তু ব্যাংকে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি মুদ্রানীতির লক্ষ্য ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ ছাড়িয়ে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। বিনিয়োগ বাড়ল না, কিন্তু ঋণ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য অতিক্রম করল, তাহলে টাকা কোথায় গেল? আমদানি অনেক বেড়েছে। পুঁজিবাজারেও উত্থান-পতন চলছে। ব্যাংক, পুঁজিবাজার ও আমদানির মাধ্যমে অর্থ পাচার হয়ে থাকে। এটা নির্বাচনের বছর। ফলে এ সময় সতর্ক থাকা দরকার।

তিনি বলেন, নির্বাচনের বছরে এমন বাজেট হওয়া উচিত যাতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সংযত থাকে। কিন্তু তা সম্ভব হবে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেদের ঘোষণা করা মুদ্রানীতি মানছে না। সিআরআর কমিয়ে দিচ্ছে। ২০১৭ সাল ছিল ব্যাংকিং কেলেঙ্কারির বছর। এবার আমার মনে হয়, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এতিমে পরিণত হয়েছে। ব্যাংক রক্ষার দায়িত্ব যাদের, তারা এখন এতিমের ওপর অত্যাচার করছে।

তিনি বলেন, মানুষের করের টাকা দিয়ে এইভাবে ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা এবং এখানে যে পরিমাণ দুর্নীতি হচ্ছে, এ জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়াটা ঠিক না। এ ধরনের ব্যাংকের জন্য অর্থের অন্য উৎস খোঁজার পরামর্শ দেন তিনি। প্রয়োজনে ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার পক্ষেও মত দেন তিনি।

আরেক সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না। অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এ রকম সময়ে করপোরেট কর হার হঠাৎ কমিয়ে দিলে চ্যালেঞ্জ আরও বড় হবে। করপোরেট কর হার কমানোর বিরোধী নয় সিপিডি। তবে তা যাচাই-বাছাই করে নিতে হবে।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, পুঁজিবাজার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর ভূমিকা আছে। কিন্তু ব্যাংকগুলো এখনও ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের মতোই আচরণ করছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর যে দায়িত্ব, তা পালন করছে না। এ জন্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর ভূমিকা কী হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা থাকা উচিত।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, অনেক সমস্যাই রয়েছে। তবে এগুলো সমাধানের ঊর্ধ্বে নয়। এ জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here