ইমরান হোসেন : ২৬ বছর পর একমাসের মধ্যে নতুন জাহাজ যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনে(বিএসসিতে)। প্রায় ৬ বছর পর আরপিও অর্থ ব্যবহার শুরু করছে বিএসসি। ২০১৮ সালের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান বিএসসির বহরে আরও ৬টি নতুন জাহাজ যুক্ত হবে। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন বিল-২০১৭ পাশ হয়েছে। এখন বিএসসির শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০০ থেকে ১০ হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরো গতিশীল করতে ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে সদ্য নির্মিত আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন ২৫ তলা বিশিষ্ট বাণিজ্যিক উদ্বোধন করেছেন (গত ১৫ এপ্রিল)প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

 বিএসসির বার্ষিক রির্পোটে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য

নতুন জাহাজগুলো যুক্ত হলে বিএসসির বার্ষিক আয় কযেকগুণ বাড়বেচট্টগ্রাম বন্দরের শহীদ মোহাম্মদ ফজলুর রহমান মুন্সী অডিটোরিয়ামে  ২২ মার্চ বিএসসির ৩৯তম বার্ষিক সাধারণ সভায় এ সব কথা বলেন নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাহাজাহান খান।নৌ পরিবহন মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, শেয়ার বাজার থেকে আরপিও এর মাধ্যমে বিএসসি অর্জিত টাকা ও নিজস্ব অর্থ ব্যয়ে প্রায় ৩৬ হাজার ডিডব্লিউটি সম্পন্ন একটি ক্যামিকেল, ক্রুড অয়েল ট্যাংকার কেনার প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। এটি শীঘ্রেই বিএসসির বহরে সংযোজন হবে।

ডিএসইতে প্রকাশিত অয়েল ট্যাংকার ক্রয়ে নিউজ।

বিএসসি’র বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরো গতিশীল করতে ২৫ তলা ভবন তৈরি করা হয়েছে ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে। যার অনেকগুলো ফ্লোর ইতোমধ্যে ভাড়া হয়ে গেছে  বলে জানা গেছে।  এছাড়া চট্টগ্রাম ও খুলনায় নতুন ভবন তৈরির পরিকল্পনা করেছে বিএসসি।

ঢাকা প্রাণকেন্দ্রে সদ্য নির্মিত আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন ২৫ তলা বিশিষ্ট বিএসসির  বাণিজ্যিক  ভবণ।

বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন অর্ডার রহিত করে পুনঃপ্রণয়নের বিধান করে গত মার্চ সংসদে  একটি বিলটি পাস করা হয়। নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান বিলটি পাসের প্রস্তাব করেন। গত ২৯ জানুয়ারি মন্ত্রী বিলটি উত্থাপন করেন। বিলে বিদ্যমান বিধানের অধীন প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন পূর্বাবস্থায় বহাল রাখার বিধান করা হয়েছে। বিলে কর্পোরেশনের অনুমোদিত মূলধন ১ হাজার কোটি, পরিশোধিত মূলধন ৩৫০ কোটি টাকা করার বিধান করা হয়েছে। বিলটি পাসের ফলে বিএসসির অভিহিত মূল্য হচ্ছে ১০০ টাকার পরিবর্তে ১০ টাকা করায় বাঁধা দূর হয়েছে। ইতোমধ্যে বিএসসি অভিহিত মূল্য হচ্ছে ১০০ টাকার পরিবর্তে ১০ টাকা করার জন্য ৩১ মে রেকর্ড ডেট ঘোষণা করা হয়েছে।ডিএসইতে প্রকাশিত ফেজভেলূ  পরিবর্তনের নিউজ।

শেয়ার বাজার বিশেষষ্ণ ও  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু আহমদ সাহেব মনে করেন, অভিহিত মূল্য হচ্ছে ১০০ টাকার পরিবর্তে ১০ টাকা হওয়ার ঘোষণায় কিছু লোক অতি উৎসাহী, এতে কোম্পানির ফান্ডমেন্টালি কোন পরির্বতন হয় না। তবে একে কেন্দ্র করে কিছু লোক খেলার চেস্টা করতে পারে।

নতুন জাহাজ ক্রয়ের ফলে কোম্পfনি ইনকামে প্রভাব পড়বে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘জাহাজ ক্রয়ের পর কেমন ইনকাম হয় সেটা দেখে বিনিয়োগকারীরা সিদ্ধান্ত নিলে উপকৃত হবে বলে আমি মনে করি।’

নতুন ভবণ নির্মাণ থেকে ভাড়া বাবদ কোম্পারির আয় কেমন বাড়তে পারে এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন ,‘বাংলাদেশে ভবণ নির্মাণের কস্ট প্রাইসের বিপরীতে এখনও আয় কম।’

 এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিযোগকারী ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কাজী আবদুর রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) শেয়ারের ফেসভ্যালু ১০ টাকা হলে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভবনা অনেক বেশি। তিনি বলেন,মার্কেটে শুধুমাত্র বিএসসির স্পিট হতে বাকী ফলে বিনিয়োগকারীদের বিএসসির উপর নজর আছে। ফেসভ্যালু ১০ টাকা হলে সাধারণ ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা এই শেয়ার কিনতে পারবেন।

ফেসভ্যালু ১০০ টাকা হওয়ায় অনেকেই এই শেয়ারটি কিনতে পারেন না। ফেসভ্যালু ১০ টাকা হলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজ হবে। এতে শেয়ারবাজারের প্রতি মানুষের আস্থা আরও বেড়ে যাবে।স্পিটকে কেন্দ্র করে যেন শেয়ারটি দাম অতিমাত্রায় না বাড়ে সে দিকে দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।

নতুন জাহাজ যুক্ত হওয়াকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন এর ফলে বিএসসির ইনকাম বাড়বে বলে আমি মনে করি।

উল্লেখ্য, নানা জটিলতার প্রেক্ষিতে ২০১১ সালে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকা নির্ধারণ করে। ভিন্ন ভিন্ন মূল্যের শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকায় রূপান্তরে ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু আইনগত জটিলতার কারণে গত ৬ বছরেও কোম্পানির শেয়ারের অভিহিত মূল্য পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকনে করেন, বিএসসির মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে ২৫ থেকে ৩০টি মাদার ট্যাংকার ও সেলুলার কনটেইনার জাহাজ দরকার হলেও বিগত ২৬ বছরে কোনো জাহাজ কেনা হয়নি। সর্বশেষ ১৯৯১ সালে এমভি বাংলার শিখা নামে একটি জাহাজ কেনা হয়েছিল।

এ অবস্থা উত্তরণের জন্য সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, জিটুজি ভিত্তিতে চীন সরকারের ঋণের টাকায় তিনটি নতুন প্রডাক্ট অয়েল ট্যাংকার ও তিনটি নতুন বাল্ক ক্যারিয়ার(যে জাহাজে মালামাল কন্টেনারের পরিবহন না করে খোল অবস্থায় বহন করা হয়) ক্রয়ে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চীনা ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের সঙ্গে জাহাজ নির্মাণে চুক্তিও স্বাক্ষর হয়েছে।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডের মাধ্যমে ২৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে চীন থেকে এ অয়েল ট্যাংকার কিনছে বিএসসি। এর মধ্যে আরপিওর মাধ্যমে শেয়ার বিক্রির প্রায় ২৩৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। বাকি ৪৯ কোটি টাকার জোগান দেয়া হবে কোম্পানির নিজ তহবিল থেকে। এর আগে প্রায় পাঁচ বছর অব্যবহূত ছিল আরপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে উত্তোলিত প্রায় ৩১৪ কোটি টাকার বড় একটি অংশ। উত্তোলিত অর্থ প্রসপেক্টাসে উল্লেখিত খাতে নির্ধারিত সময়ে খরচ না হওয়ায় আরপিওতে বিনিয়োগ করে যথেষ্ট সুফল পাননি বিনিয়োগকারীরা।ফলে বিনিয়োগকারীরা আরপিওতে বিনিয়োগে সুফল পেতে শুরু করবেন খুব শীঘ্রই।

নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানা যায়, ১৯৭২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। আশির দশকের শুরুতে বিএসসির বহরে ২৬টি জাহাজ ছিল। বর্তমানে বিএসসি বহরে ৩টি জাহাজ রয়েছে।

যে কারণে আরো ৬টি জাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বর্তমানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন রিফাইন্ড প্রোডাক্ট যথা-ডিজেল, কেরোসিন, জেট ফুয়েল, পেট্রোল ইত্যাদি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কুয়েত ও অন্যান্য তেল রফতানিকারক দেশ থেকে সি এ্যান্ড এফ ভিত্তিতে আমদানি করে। অদুর ভবিষ্যতে এর পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। এ জন্য উপযোগী প্রোডাক্ট ক্যারিয়ার ক্রয় করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক শিপিং ট্রেডে বাল্ক কার্গো পরিবহনের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায়  ৪০০ থেকে ৫০০ লাখ মেট্রিক টন বাল্ক কার্গো প্রতি বছর আমদানি হয়। এর মধ্যে খাদ্যশস্য, সুগার, সিমেন্ট ক্লিংকার, সার ইত্যাদি স্থায়ী আমদানি পণ্য হিসাবে বিবেচিত। এ সব পণ্যের অধিকাংশ বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজে পরিবহন হয়ে থাকে।

সম্প্রতি সরকার বাংলাদেশে কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এ জন্য প্রচুর পরিমাণ কয়লা বিদেশ থেকে আমদানি করার প্রয়োজন হবে। বিএসসি জাতীয় পতাকাবাহী সরকারী সংস্থা হিসেবে বিদেশ থেকে কয়লা পরিবহনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ জন্য উপযোগী বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজ ক্রয় করা প্রয়োজন।

বর্তমানে ভাড়া করা জাহাজের মাধ্যমে রিফাইন্ড প্রোডাক্ট ও বাল্ক কার্গো পরিবহন করতে গিয়ে ভাড়া বাবদ সরকারকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। বিএসসি প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রোডাক্ট ক্যারিয়ার ও বাল্ক ক্যারিয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে এ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে বলে মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে।

নতুন জাহাজ বহরে যুক্ত হলে পরিবহন সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক চাহিদা পূরণ ও বিএসসিকে অধিকতর লাভজনককরণ, দেশের জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সহায়তা প্রদান, দেশের শিপিং সেক্টরে অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে। সথে সাথে বিএসসির বার্ষিক আয় কযেকগুণ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

http://বিএসসির দ্বিতীয় অনুসন্ধানী রির্পোট আগামীতে প্রকাশ করা হবে।

14 COMMENTS

  1. ধন্যবাদ। অনুসন্ধানী রিপোর্ট বেশি বেশি চাই এবং রিপোর্টের সাথে কোম্পানির বর্তমান ফান্ডমেন্টালের বিশ্লেষণ থাকলে ভাল হয়।

  2. অনুসন্ধানী কিন্তু নির্দেশনামূলক রিপোর্টের জন্যে ধন্যবাদ। বিএসসির দ্বিতীয় অনুসন্ধানী রির্পোটের অপেক্ষায় রইলাম।

  3. বিএসসি সেই কোম্পানি যে আরপিও এর মাধ্যমে টাকা তুলে ব্যাংকে এফডিয়ার রাখে,আরে বাবা টাকা যদি ব্যাংকেই রাখতে হয় আমি নিজেই রাখতে পারি।বিএসসিকে আমরা টাকা দিয়েছি ব্যবসা করার জন্য সে দায়িত্ব পালন করতে তার ৬ বছর লাগছে!

Mosharrof Hoshen শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন Cancel reply

Please enter your comment!
Please enter your name here