বাজার ধরে রাখার ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন

2
1912

হোসাইন আকমল : পুঁজিবাজারে সম্প্রতি শুরু হয়েছে লেনদেনের ঢল বা সূচকের পতন। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত চলমান রয়েছে পতনের ধারা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিনিয়োগকারী ও সরকারের বিনিয়োগকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। বাজার পরিবর্তনের ধারা নিম্নমুখী হওয়ায় আস্থার সংকট বাড়ছে।

নেতিবাচক প্রভাবের কারণ হিসেবে রাজনৈতিক সংকটকেও অনেকে দায়ী করেছেন। ফলে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে- তা অর্থনীতিকে স্থবির করছে বলে তারা মন্তব্য করেন ।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আগের দিনের তুলনায় ২৫ ফেব্রুয়ারি ডিএসইতে সূচক কমেছে ৬৪ পয়েন্ট। এরপর ২ মার্চ ৩০ পয়েন্ট, ৩ মার্চ ২৩ পয়েন্ট, ৪ মার্চ ১৪ পয়েন্ট, ৫ মার্চ ১৭ পয়েন্ট, ৮ মার্চ ৪০ পয়েন্ট, ১১ মার্চ ৬৩.৬ পয়েন্ট, ১২ মার্চ ২৮.৮ পয়েন্ট ও ১৫ মার্চ ২০.৫ পয়েন্ট কমেছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সূচক ছিল ৪৮০৬ পয়েন্ট। ১৫ মার্চে এসে তা হয়েছে ৪৫৩৬.৪। সে হিসেবে ৯ কার্যদিবসে সূচক কমেছে ২৬৯.৬ পয়েন্ট। যা বাজারের নেতিবাচক অবস্থার শোচনীয় প্রকাশ।

পুঁজিবাজারের নাজুক পরিস্থিতির উত্তরণে দৈনিক স্টক বাংলাদেশ’র প্রতিবেদকের কথা হয় সিকিউরিটিজ হাউজ ট্রেডার, কিছু বিনিয়োগকারী ও বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত জাতীয় ঐক্য’র সভাপতি রুহুল আমীনের সঙ্গে।

বাজার পরিস্থিতি নিয়ে তারা বলেন, পুঁজিবাজার স্বাভাবিক তরঙ্গের মধ্য দিয়ে চলতে থাকবে। তবেই বাজার এবং বিনিয়োগকারী- উভয়ের জন্যই তা হবে ইতিবাচক। এর বিপরীতে তরঙ্গ বা উত্থান-পতনের ধারা অস্বাভাবিক হলে- পুঁজিবাজারের জন্য তা কখনো সুফল বয়ে আনবেনা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিনিয়োগকারীরা এবং নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাজারে। দীর্ঘমেয়াদে এ প্রভাব থাকলে বাজারে ধ্বস বা মহা ধ্বস নামলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবেনা। সুতরাং, বাজারে সম্ভাবনাময় ও ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে সবার এগিয়ে আসা দরকার বলে মনে করছেন বিনিয়োগকারীরা।

পুঁজিবাজার টেকনিক্যাল এ্যানালাইসিস কোর্সের প্রশিক্ষক মেহেদী আরাফাত বলেন, ব্যাংকের সুদের হার যেভাবে কমানো হয়েছে, সঞ্চয়পত্রের সুদের হারও সেভাবে কমানো হলে পুঁজিবাজার আরো শক্তিশালী হবে। সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রির মাধ্যমে টাকার সংস্থান করছে। সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমে গেলে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ হ্রাস পাবে। সেক্ষেত্রে সরকার পুঁজিবাজরে সরকারি কেম্পানিগুলোর শেয়ার ছেড়ে টাকার সংস্থান করতে পারে। এমন নীতি গ্রহণ করলে পুঁজিবাজারের জন্য অনেক ভালো হবে।

তিনি বলেন, ব্যাংগুলোতে অলস অর্থ হিসেবে হাজারো কোটি টাকা পড়ে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক অন্যান্য ব্যাংকগুলোকে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগসীমা বৃদ্ধি করার অনুমতি দিলে বাজার আরো শক্তিশালী হবে। তিনি আরো বলেন, দেশে প্রথম শ্রেণীর অনেক কোম্পানি রয়েছে- যারা এখন পর্যন্ত পুঁজিবাজারে আসেনি। সরকার এসব কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে নিয়ে আসার পদক্ষেপ নিলে এ বাজার বিনিয়োগবান্ধব হবে।

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত জাতীয় ঐক্য’র সভাপতি রুহুল আমীন বলেন, পুঁজিবাজারের সাথে লাখো পরিবার জড়িত। কর্ম সংস্থানের বিকল্প হিসেবে পুঁজিবাজার বিবেচিত হতে পারে। তাই এ বাজার রক্ষায় সকলের ঐক্যবধ্য প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতা প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বিএসইসি, ডিএসই, সিএসই ও বাংলাদেশ ব্যাংক মিলে সমন্বয় মিটিং করতে হবে; যাতে বাজারে কোন নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।

তিনি বলেন, পুঁজিবাজারের সাথে অর্থমন্ত্রণালয় অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কোন বাজেট প্রণয়নের আগে তা পুঁজিবাজারবান্ধব কিনা, সেদিকে সজাগ থাকতে হবে অর্থমন্ত্রণালয়ের। পুঁজিবাজার এতে দুরবস্থা থেকে রক্ষা পাবে বলে আশা করা যায়।

বিডিবিএল সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারী এ্যাডভোকেট রাসেল বলেন, বাজার ধরে রাখতে আইপিও বন্ধ করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে নামসর্বস্ব কোম্পানিকে আইপিওতে আসার অনুমতি দেয়া হয়। এ কোম্পানিগুলো আইপিও’র মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ যথাযথ ব্যবহার না করে ব্যক্তিস্বার্থে লাগায়। এতে বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারী লোকসানের সম্মুখীন হয়। ক্রমাগত লোকসানের ফলে বিনিয়োগকারীরা একসময় আস্থা হারিয়ে ফেলে। বাজার তখন আরো পড়তে থাকে। তাই বাজারের পতনরোধে নতুন করে আইপিও অনুমোদন দেয়া অন্তত নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য বন্ধ করতে হবে।

তিনি বলেন, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ও মিউচুয়্যাল ফান্ডগুলোকে শেয়ার ক্রয়ের জন্য চাপ প্রয়োগ করতে হবে। সেইসাথে ব্যক্তি ও কোম্পানি পর্যায়ে অব্যাখ্যায়িত টাকা বিনা বাধায় শেয়ারবাজারে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। বাজার পতনের সময় শেয়ার বিক্রয় না করে বরং আইসিবি তখন যেন শেয়ার ক্রয় করে, -এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে। এসব পদক্ষেপ নিলে বাজারে ক্রেতা বাড়বে এবং পতনের হাত থেকে রক্ষা পাবে। বিনিয়োগকারীরা লাভবান হবে।

একই হাউজের বিনিয়োগকারী ইঞ্জিনিয়ার আসির উদ্দিন বলেন, শেয়ারবাজারে ইতিবাচক ধারা বজায় রেখে পতন রোধ করতে হবে। এজন্য ইপিএস (আর্নিং পার শেয়ার) বাণিজ্য এবং বোনাস বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। কিছু কিছু কোম্পানি শেয়ার বিক্রয়ের সময় ভাল দর পাওয়ার জন্য কারসাজি করে তাদের ইপিএস বেশি দেখায়। আর তারা যখন শেয়ার ক্রয় করে- তখন ইপিএস কম দেখায়। এতে ঐসব কোম্পানির কাছে বিনিয়োগকারীরা প্রতারিত হয়।

আবার, বেশি দরে শেয়ার বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে কোন কোন ক্ষেত্রে ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে অথবা কোম্পানির রিজার্ভ কমিয়ে ডিভিডেন্ড বাড়ানো হয়। সাধারণ বিনিয়োগকারী এতে ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ায় তাদের মাঝে আস্থার সংকট দেখা দিচ্ছে। এতে পুঁজিবাজারে ক্রেতাদের উপস্থিতি দিন দিন কমছে। তাই বাজার রক্ষায় এ বিষয়গুলোতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সতর্ক দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।

মিকা সিকিউরিটিজের শাখা ব্যবস্থাপক নিজাম উদ্দিন বলেন, পুঁজিবাজারে গতিশীলতা আনতে ইনস্টিটিউট বা মিউচুয়্যাল ফান্ডগুলোর আস্থাহীনতা দূর করতে হবে। এতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং বাজার স্বাভাবিক হবে।

হ্যাক সিকিউরিটিজের বিনিয়োগকারী রুমি বলেন, শেয়ারবাজরের পতন ঠেকিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হবে। নিত্যদিনের সংঘাত-সংঘর্ষের ফলে জনতার মাঝে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে- তা দূর করতে হবে। কারণ, সার্বিক পরিস্থিতি প্রতিকূল হওয়ায় জান-মাল এবং অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে তাদের মাঝে। এতে বিনিয়োগ ব্যহত হচ্ছে এবং বাজার পড়ছে। সুতরাং, পুঁজিবাজার রক্ষায় জনতার সংশয় দূর করে বাজারমুখী করতে হবে তাদের।

এ্যাপেক্স সিকিউরিটিজের কর্মকর্তা নুসরাত জাহান লুবনাও একই কথা বলেন। তিনি বলেন, শেয়ারবাজারে স্বাভাবিক অবস্থা ধরে রাখতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হবে। রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে সব কিছুতেই অস্থিরতা বিরাজ করছে। যার খারাপ প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারে।

তিনি আরো বলেন, বাজার ধরে রাখতে মার্কেট ডাউন হওয়ার সময় ব্যাংকগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। এ সময় বেশি পরিমাণে শেয়ার ক্রয় করে বাজারে ইতিবাচক ধারা ফিরিয়ে আনতে পারে ব্যাংকগুলো। এমন করা হলে বিনিয়োগবান্ধব হবে পুঁজিবাজার। বাজার পতনের সম্ভাবনা তখন ক্ষীণ হয়ে যাবে।

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here