বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ 

0
212

স্টাফ রিপোর্টার : উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। আর এ বিষয়টিকে স্বাধীনতা-পরবর্তী জাতীয় জীবনের বড় অর্জন হিসেবে দেখছে সরকার। এ অর্জনের জন্য ২২ মার্চ সংবর্ধনা দেয়া হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। একই দিন সারা দেশে আয়োজন করা হবে আনন্দ মিছিল। এই আনন্দ উৎসব চলবে ২৬ মার্চ অর্থাৎ স্বাধীনতা দিবস পর্যন্ত।

দেশকে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল  দেশে (ডেভেলপিং কান্ট্রি-ডিসি) পরিণত হতে গেলে যে তিন সূচকের যোগ্যতা অর্জন করতে হয়, বাংলাদেশ সেই তিনটি শর্তই পূরণ করেছে। দেশের মাথাপিছু আয় ১২৪২ মার্কিন ডলার হতে হয়, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১৬১০ মার্কিন ডলার।

দেশের ৬৬ ভাগ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার কথা, বাংলাদেশ অর্জন করেছে ৭২ দশমিক ৯ ভাগ। অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর না হওয়ার মাত্রা ৩২ ভাগের নিচে থাকতে হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই মাত্রা ২৫ ভাগ। এই বড় সফলতা অর্জনের পাশাপাশি যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা নিয়ে কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশের সবকিছুতেই উন্নয়নের ছোঁয়া লাগাতে হবে বলেছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশে পরিণত হতে পেরেছে হাতে গোনা কয়েকটি দেশ। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া ছাড়া উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই কোনো দেশে। আমাদের দেশও প্রবৃদ্ধির দিকে যাচ্ছে, অর্জনটা বড় এবং সম্মানের। আবার শঙ্কাও আছে। উন্নয়নশীল দেশের পাশাপাশি দেশের সবকিছুতেই উন্নয়নের ছোঁয়া লাগাতে হবে।

আমাদের ইনিস্টিটিউশনগুলো সংস্কার করতে হবে। দেশ আরো বিনিয়োগবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে। সর্বোপরি সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সংস্কৃতি সব কিছুতেই উন্নয়নের ছোঁয়া লাগাতে হবে।

দেশের জনসাধারণ মনে করছে, তাদের আর্থিক অবস্থা খারাপ হচ্ছে। এটার একটা বড় কারণ, নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া। সার্বিকভাবে দ্রব্যমূল্যেও বৃদ্ধি সাধারণ মানুষকে বেশ বিপর্যস্ত করেছে, মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বেড়েছে। অন্যদিকে বাণিজ্যিকভাবে রপ্তানি বাড়ছে না, প্রবাসী আয়ও কমে গেছে। কিন্তু আমদানির পরিমাণ বেড়েছে। অর্থনীতিতে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা লক্ষ্য করা গেছে। এখনই যদি সরকার এটা আমলে না নেয় তাহলে আগামীতে আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তবে এটাও ঠিক, দেশে যেসব বড় বড় প্রকল্প হচ্ছে সেখানে আমদানির যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে।

এ বছর রাজনীতির বছর, নির্বাচনের বছর। আসলে দেশে কী ঘটবে তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দুশ্চিন্তা তো আছেই। তবে প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে সব ধরনের সমস্যা কাটিয়ে উঠা সম্ভব। আরেকটা বিষয় হলো, দেশে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা নিয়ে এক ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। এ সমস্যা দূরীকরণের ক্ষেত্রে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।

সিপিডির  সম্মানিত সিনিয়র গবেষক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এলডিসি তালিকা থেকে বের হওয়া মানে দরিদ্র বা গরিব দেশের তালিকা থেকে বের হওয়া। দরিদ্র দেশ হিসেবে আমাদের আর কেউ দুর্বল ভাববে না। এটা যে কোনো দেশের জন্য গৌরবের বিষয়, গর্বের বিষয়, মর্যাদার বিষয়। ২০২৪ সালে আমরা উন্নত দেশে পরিণত হব। সেই হিসেবে আরো ৬ বছর অপেক্ষা করতে হবে আমাদের। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যেগুলো খুবই দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করতে হবে। এর মধ্যে প্রথম এবং প্রধান কাজ হবে সম্পদের প্রবাহ বাড়ানো। এ ছাড়া আয়কর বৃদ্ধির দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি বৈদেশিক সাহায্য কমানোর দিকে নজর দিতে হবে।

আফ্রিকার মতো দেশ উন্নয়নের গতিপথে থাকার পরও বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও আঞ্চলিক সংকটের কারণে পিছিয়ে পড়েছে। এ জন্য বাংলাদেশে আরো শিল্পায়ন হতে হবে। উৎপাদন বাড়াতে হবে, কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। আর এটা করতে হলে শ্রমঘন আরো শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বাড়াতে হবে। এ জন্য রাজস্ব আহরণের গতি বাড়ানো ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সুশাসন, সমাজের বৈষম্য দূরীকরণ জরুরি।

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর যেসব ঝুঁকি মোকাবেলা করতে হবে তা হলো, বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে পাওয়া ঋণে সুদের হার বেড়ে যাবে। গ্রেস পিরিয়ড কমে আসবে অথবা থাকবে না। আবার ঋণের টাকা ফেরত দেয়ার সময়ও কম ধরা হবে। এতে বৈদেশিক ঋণ সংক্রান্ত ব্যয় বাড়বে। রপ্তানি বাজার কিছুটা সংকুচিত হয়ে যাবে। সব ধরনের শুল্ক সুবিধা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া রপ্তানি বাজারে নতুন নতুন শর্ত যুক্ত হতে পারে। এসব সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আগেই পরিকল্পনা করতে হবে।

এফবিসিসিআই সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা উন্নত দেশে পরিণত হব। ইতোমধ্যে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। তবে আমাদের আত্মতুষ্টিতে ভুগলে চলবে না, আমাদের এ অগ্রগতি বজায় রাখতে হবে।

এ ছাড়া ২০২১ সাল নাগাদ আমাদের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। যার জন্য আমাদের প্রচুর অর্থের প্রয়োজন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিদেশিরা আমাদের দেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছেন, কিন্তু যে আগ্রহটা জন্মেছে তার থেকে সুবিধা নিতে হবে। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনের চোখে সবাইকে সমান হিসেবে বিবেচনা করে যথাযথ আইনের প্রয়োগে দৃষ্টান্তমূলক বিচারকার্য সম্পন্ন এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। তারপর অর্থনৈতিক বিষয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। তারই অংশ হিসেবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের আয় কাজে লাগানো, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা, আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি পণ্যের তালিকা দীর্ঘ করা এবং সেগুলোকে আরো বহুমুখী করতে সহায়তা করতে হবে।

ইউরোপ-আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বে আমাদের দেশীয় পণ্যের কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সে সঙ্গে তৈরি পোশাক খাতে জিএসপি সুবিধা আদায়ে আরো তৎপর হতে হবে। অন্যদিকে ২০০০-১৫ পর্যন্ত জাতিসংঘ সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এমডিজি) যে আটটি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়েছে, ঠিক একইভাবে ২০১৫-৩০ পর্যন্ত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৭ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাই অর্জিত সম্ভব হবে। কারণ বাংলাদেশ এরই মধ্যে আর্থিক খাতে যে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়ে আশা জাগিয়েছে, সেখানে নিরাশ হওয়ার সুযোগ নেই। কাজেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং তা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here