বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং এর ভবিষ্যৎ

0
2117

বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং এর ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের ব্যাংকিং অঙ্গনে বর্তমানে ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তি’ ধারণাটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। মূলত স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু উপায়ে মূলধারার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে আর্থিক সেবাবঞ্চিত সাধারণ মানুষের কাছে সাধ্যের মধ্যে সঠিক আর্থিক সেবা পৌঁছানোর কৌশলগত প্রক্রিয়ার নামই ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তকরণ’ বা ‘ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন’।

অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জাতীয় লক্ষ্যার্জনে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা আর্থিক খাতের অভিভাবক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক তার মূল কাজের পাশাপাশি সমাজের কৃষক, বর্গাচাষী, ক্ষুদে ও নারী উদ্যোক্তা, পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের মতো উৎপাদনশীল খাতগুলোয় অর্থায়ন বাড়ানোসহ আর্থিক সেবার বাইরে থাকা জনসাধারণকে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে দেশব্যাপী আর্থিক অন্তর্ভুক্তকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করে। অনেকের কাছে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেয়ার এ কৌশল বাংলাদেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা অর্জনেও বিরাট ভূমিকা পালন করে চলেছে।

এ অভিযানে বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত ও স্বল্পবিত্তদের উৎপাদনমুখী উদ্যোগে কৃষি ও অকৃষি খাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণের জোগান, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এবং নামমাত্র জমায় নতুন ব্যাংক হিসাব খোলার মতো বহুমাত্রিক উদ্যোগগুলোর বিপুল বিস্তারে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান, সমবায় সমিতি স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গেই শামিল হয়। অল্প টাকার বিনিময়ে বিনা খরচের হিসাবের এ কাফেলায় সর্বশেষ যুক্ত হয় আমাদের গার্মেন্ট শ্রমিক ও কর্মজীবী পথশিশুরা। ব্যাংকিং খাতে প্রযুক্তিনির্ভর সহজ সেবা হিসেবে চালু করা হয় মোবাইল ব্যাংকিং সেবা, যা তরুণদের মাঝে এরই মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের মূলধারায় সামাজিক দায়বোধ দৃঢ়ভাবে সুপ্রোথিত করার উদ্যোগ জোরদার করা হয়।এসব উদ্যোগে সক্রিয় অংশগ্রহণ করায় ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশংসা করতেই হয়।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অংশ হিসেবে গরিব কৃষকদের ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ করে দেয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ বিতরণ, অসহায় মুক্তিযোদ্ধা, ক্ষুদ্র জীবন বীমাগ্রহীতা, বেকার তরুণ, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গার্মেন্ট শ্রমিক, এমনকি কর্মজীবী পথশিশুরাও ব্যাংক হিসাব খুলতে পারছে। এরই মধ্যে ৯৭ লাখ কৃষকসহ ১ কোটি ৩৩ লাখ সাধারণ মানুষ নতুন হিসাব খুলে ব্যাংকিং সেবা নিতে পারছে। এ ধরনের বেশির ভাগ হিসাবের ক্ষেত্রে ন্যূনতম স্থিতি রাখার বাধ্যবাধকতা নেই। নেই কোনো চার্জ বা ফি। শুধু হিসাব খোলাই নয়, এসব হিসাব সচল রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব উত্স থেকে ২০০ কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে। এ তহবিল থেকে তারা সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ পাবে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ত্বরান্বিত করার পথে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো ‘স্কুল ব্যাংকিং’। এটি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। গত চার বছরে ৪৮টি ব্যাংকে ৩ লাখ ৬৬ হাজার স্কুল ছাত্রছাত্রী ব্যাংক হিসাব খুলেছে। সে হিসাবে জমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৭১ কোটি টাকা।

নগর সমাজে অবহেলা, অনাদর, অযত্ন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে ওঠা কর্মজীবী পথশিশুরাও বাংলাদেশ ব্যাংকের দৃষ্টির বাইরে যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংকিং খাত ও অসরকারি সংস্থা মিলে এক অনন্য উদ্যোগের মাধ্যমে ভাগ্যবিড়ম্বিত এ পথশিশুদের ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এ উদ্যোগ কর্মজীবী পথশিশুদের সঞ্চয়ের প্রতি আগ্রহী করে তুলবে। তারা তাদের ক্ষুদ্র আয়ের কিছুটা হলেও ব্যাংকে জমা করার সুযোগ পাবে।

কৃষি খাতে ব্যাপক ঋণ সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি ঋণ সরবরাহ প্রক্রিয়ায় গুণগত পরিবর্তন এসেছে। এখন বর্গাচাষী, ভূমিহীন কৃষক, প্রান্তিক কৃষক, নারী কৃষক সবাই ব্যাংকঋণ পাচ্ছে। কৃষকরা যেন স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়, হয়রানিমুক্তভাবে ও সময়মতো কৃষিঋণ পায়, সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি ও বিদেশী ব্যাংকগুলোও এখন কৃষিঋণ বিতরণ করছে। কৃষকদের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে কৃষিঋণ বিতরণ করা হচ্ছে। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সামনে প্রকাশ্যে কৃষিঋণ বিতরণের ব্যবস্থাও চালু হয়েছে।

উপেক্ষিত বর্গাচাষীদের দোরগোড়ায় সহজ শর্তে কৃষিঋণ পৌঁছে দিতে একটি বৃহৎ অসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় গত পাঁচ বছরে ৮ লাখ ৬৩ হাজার বর্গাচাষীকে ১৩২৮ কোটি টাকা অর্থায়ন করা হয়েছে। ঋণ পাওয়া এসব বর্গাচাষীর জীবনমানেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। আর প্রকৃত কৃষক, প্রান্তিক চাষী ও বর্গাচাষীরা ঋণ পাওয়ায় কৃষি উৎপাদন বেড়েছে। বাংলাদেশের খাদ্যোৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬ লাখ টন। বর্তমানে বাংলাদেশকে চাল আমদানি করতে হয় না বললেই চলে।

নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই খাতে অর্থায়নের ওপর জোর দিয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট’ নামে নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে। গত চার বছরে ব্যাংকগুলো ১৮ লাখ ৩৫ হাজার এসএমই উদ্যোক্তাকে ২ লাখ ৬২ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা এসএমই ঋণ বিতরণ করেছে, যার মধ্যে ৯০ হাজার নারী উদ্যোক্তাকে ঋণ দেয়া হয়েছে ৯ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। এসএমই খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল, আইডিএ, এডিবি ও জাইকার অর্থায়নে বেশ কয়েকটি পুনঃঅর্থায়ন তহবিল চালু করা হয়েছে।

ডিসিসিআইয়ের সহায়তায় নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে ১০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের কাজ এগিয়ে চলেছে। এসএমই খাতের পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের ১৫ শতাংশ অর্থ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত চার বছরে ৯ হাজার ৬১২ জন নারী উদ্যোক্তা ৭৫৪ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পেয়েছে। সারা দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদে উদ্যোক্তাদের আর্থিক সেবার আওতায় আনতে ক্লাস্টারভিত্তিক এসএমই ঋণ বিতরণের কর্মসূচিও হাতে নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে জামালপুর ও যশোরের হস্তশিল্প, সিলেটের মনিপুরী তাঁত, সিরাজগঞ্জের জরিপল্লী, টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্প, বগুড়ার হালকা প্রকৌশল ও কৃষি যন্ত্রপাতি; সৈয়দপুরের ক্ষুদ্র গার্মেন্টশিল্পসহ এমন অনেক ক্ষুদ্রশিল্প ক্লাস্টার চিহ্নিত করে এসএমই ঋণের আওতায় আনা হয়েছে।

কম খরচে দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে টাকা পাঠানো ও ব্যাংকিং খাতে সেলফোন প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা প্রবর্তন করা হয়েছে। ব্যাংকের নেতৃত্বাধীন এ সৃজনশীল সেবার মাধ্যমে বিদেশ থেকে প্রেরিত ও দেশের ভেতরের রেমিট্যান্স বিতরণ সহজ হয়েছে। মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবের প্রসার দিন দিনই বাড়তি গতি পাচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিং গ্রাহকের সংখ্যা এখন ১ কোটি ৫৩ লাখ। ব্যাংকগুলো ৩ লাখ ২৬ হাজার এজেন্টের মাধ্যমে এ সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় গড়ে প্রতিদিন ২৭০ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। নতুন এ ব্যাংকিং সেবা গ্রামীণ এলাকার গরিব মানুষের খুবই উপকারে আসছে। এটি সফল উদ্যোগ হিসেবে দেশের সর্বস্তরের জনগণের কাছে স্বীকৃতি পেয়েছে। এমনকি এ মোবাইল ব্যাংকিং মডেলটি সারা বিশ্বেই একটি উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়েছে।

এখনো দেশের অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেননি। তাদের অধিকাংশই গ্রামীণ এলাকার সাধারণ মানুষ। তাই গ্রামীণ জনপদের মানুষের কাছে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছাতে ব্যাংকগুলোর অন্তত অর্ধেক শাখা পল্লী অঞ্চল বা গ্রামে খোলার জন্য নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে শহরের চেয়ে গ্রামেই এখন ব্যাংকের শাখা বেশি। দেশে বর্তমানে ব্যাংক শাখার সংখ্যা ৮ হাজার ৬৮৫, যার মধ্যে ৪ হাজার ৯৬২টিই পল্লী শাখা। এ সময়ে ব্যাংকগুলো ২৫৩টি কৃষি বা এসএমই শাখাও খুলেছে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অভিযানকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিতে এজেন্ট ব্যাংকিং নীতিমালা প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশে ব্যাংক। সারা দেশে নেটওয়ার্ক আছে, এমন প্রতিষ্ঠান ছাড়াও শিক্ষিত ও প্রযুক্তিনির্ভর কাজে দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তিও ব্যাংকের এজেন্ট হতে পারবেন। এজেন্টের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো তাদের কিছু কিছু ব্যাংকিং সেবা যেমন বৈদেশিক রেমিট্যান্স বিতরণসহ স্বল্প পরিমাণের অর্থ জমা ও উত্তোলন, ব্যাংক হিসাব খোলার কাগজপত্রাদি বিতরণ ও সংগ্রহ, ছোট আকারের ঋণ বিতরণ ইত্যাদি কার্যক্রম প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনপদে পৌঁছে দিতে পারবে। এরই মধ্যে কয়েকটি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করেছে। দেশের আনাচে-কানাচে ব্যাংকের অনুরূপ এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ব্যাংকিং কার্যক্রম আরো দ্রুত ও ব্যয়সাশ্রয়ী করবে বলে আশা করা যায়।

ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে বাংলাদেশে গরিব মানুষের অবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রসার ঘটছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থাকে নানাভাবে যুক্ত করেছে। যেসব ব্যাংকের পর্যাপ্ত শাখা নেটওয়ার্ক নেই, সেগুলোকে এমএফআই লিংকেজের মাধ্যমে এসএমই ও কৃষিঋণ বিতরণে উত্সাহিত করা হয়েছে। এখন ক্ষুদ্র ঋণের একটি বড় অংশের জোগান দিচ্ছে ব্যাংকিং খাত। বর্তমানে প্রায় তিন কোটি গরিব মানুষ গ্রামীণ ব্যাংক ও ৭০০ এমএফআইয়ের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণসেবা পাচ্ছে।

ব্যাংকগুলো সমাজের মানুষের কাছ থেকেই মুনাফা অর্জন করে। তাই তাদের কিছু সামাজিক দায়িত্ব পালন করা উচিত। এ ধারণার ওপর ভিত্তি করে ব্যাংকিং খাতে সিএসআর কার্যক্রম উত্সাহিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষভাবে নজর দিয়েছে। সিএসআরের অধীন প্রাকৃতিক ও মানবিক বিপর্যয় মোকাবেলায় এবং সমাজের দুর্বলতর জনগোষ্ঠীর অগ্রযাত্রার সুযোগ বিকাশে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে বহুমুখী কার্যক্রম সক্রিয় করা সম্ভব হয়েছে। খুবই সন্তোষের সাথে লক্ষ করছি, পাঁচ বছরের ব্যবধানে ব্যাংকিং খাতে সিএসআর ব্যয় প্রায় আট গুণ বেড়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবেলা ও বাংলাদেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গ্রিন ব্যাংকিং ধারণা চালু করা হয়েছে। গ্রিন ব্যাংকিংয়ের নীতি-কৌশল বাস্তবায়ন ও সিএসআর কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকির জন্য ‘গ্রিন ব্যাংকিং অ্যান্ড সিএসআর ডিপার্টমেন্ট’ নামে নতুন বিভাগ খোলা হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব অর্থায়নযোগ্য খাতে ২০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল চালু করা হয়েছে, যেটি থেকে এরই মধ্যে ১৪৪ কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব ইটভাটা স্থাপনে এডিবির অর্থায়নে ৪০০ কোটি টাকার আরেকটি তহবিল গঠন করা হয়েছে। এ তহবিল থেকে এখন পর্যন্ত ৭৫ কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন করা হয়েছে।

সুদৃঢ় আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলার জন্য আর্থিক সেবাবঞ্চিত জনসাধারণকে অর্থনীতির মূল স্রোতে নিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির যে অভিযান পরিচালনা করছে, তাতে ব্যাংক ও অব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অনেকটাই বেড়েছে। প্রান্তিক কৃষক, বর্গাচাষী, ক্ষুদে ও নারী উদ্যোক্তারা যারা এত দিন ব্যাংকঋণ পেত না, তারা এখন ব্যাংকঋণ পাচ্ছে। ব্যাংকে হিসাব খোলার সুযোগ পাচ্ছে। গরিব কৃষক ও হতদরিদ্র মানুষ ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খুলে সরকার প্রদত্ত আর্থিক সহায়তা পাচ্ছে। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে কৃষি ও ক্ষুদ্রঋণ পাচ্ছে। এসব হিসাব সচল রাখা এবং তাদের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে অধিকতর গতিশীল করার লক্ষ্যে ২০০ কোটি টাকার একটি আবর্তনশীল তহবিল গঠন করা হয়েছে। এ তহবিল থেকে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষক থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয় উত্সারী কর্মকাণ্ড প্রসারে সহজ শর্তে ঋণ দেয়া হবে।

ক্ষুদে ও নারী উদ্যোক্তারা এসএমই ঋণ পাচ্ছে। স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা ব্যাংক হিসাব খুলে বিভিন্নভাবে তাদের হাতে আসা টাকার কিছুটা জমা করতে পারছে। কর্মজীবী পথশিশু ও গার্মেন্টকর্মীরা ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ পেয়েছে। ফলে তারা তাদের আয়ের একাংশ জমাতে পারছে। সমাজের অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া মানুষ ব্যাংকের সিএসআরের অধীন উপকৃত হচ্ছে। এমনকি চর, হাওড়ের মতো অনগ্রসর এলাকার ছেলেমেয়েরা এ কর্মসূচির অধীন শিক্ষাবৃত্তি পেয়ে আজকাল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে পারছে। আজ মোবাইল ব্যাংকিং রীতিমতো বিপ্লব সাধন করেছে।

এ সেবার মাধ্যমে প্রতিদিন যেসব লেনদেন হচ্ছে, তার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শহরের টাকা গ্রামে যাচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হচ্ছে। প্রবাসীরাও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সুবিধা পাচ্ছেন। প্রবাসীদের পাঠানো টাকাও গ্রামে বিনিয়োগ হচ্ছে। গ্রামে কর্মসংস্থান ও মজুরি বেড়েছে। গ্রামীণ মানুষের আয়ও কয়েক গুণ বেড়েছে। একজন ক্ষেতমজুর এখন একদিনের মজুরি দিয়ে ১০ কেজির মতো চাল কিনতে পারে। পাঁচ বছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় দেড় গুণেরও বেশি বেড়েছে। বর্তমানে মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৮০ ডলার, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড় আয়ের চেয়ে বেশি। গড় আয়ের দিক থেকে অচিরেই উচ্চমধ্যম আয়ের দেশগুলোর কাতারে দাঁড়াবে বাংলাদেশ।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তকরণ একক কোনো দেশের নয়, এটি এখন বৈশ্বিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সারা বিশ্বই এখন আর্থিক অন্তর্ভুক্তি প্রসারে বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এরই মধ্যে অ্যাসোসিয়েশন অব ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশনের (এএফআই) সদস্যপদ লাভ করেছে। ফলে খুব সহজেই সহযোগী রাষ্ট্রসংঘের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সহায়ক তথ্য-উপাত্ত সম্পর্কে অবগত হয়ে বাংলাদেশের জন্য উপযোগী নীতিমালা তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের নেয়া আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মকাণ্ড ভবিষ্যতে পরিত্যক্ত হবে বলে ভাবার কোনো অবকাশ নেই। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়েই নেয়া হয়েছে এসব অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ। এসব উদ্যোগের অবদান অবশ্যই আছে, থাকবে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের ফিন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন প্রোগ্রাম, মোবাইল ব্যাংকিং, গ্রিন ব্যাংকিং কর্মকাণ্ড বিশ্বে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। তাই এসব কাজের অগ্রগতির ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে অবশ্যই অব্যাহত থাকবে।

দেশকে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক দায়বোধপ্রণোদিত নানা উদ্যোগের কারণে বিশ্ব আর্থিক খাত বিপর্যয় ও তার পর থেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিরাজমান প্রবৃদ্ধি মন্দার মধ্যেও এক দশক ধরে আমাদের দেশজ উৎপাদনে প্রকৃত প্রবৃদ্ধি গড়ে ৬ শতাংশের বেশি মাত্রায় গতিশীল রয়েছে। এ প্রবৃদ্ধির গুণগত মানও যথেষ্ট উন্নত। এতে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়ার কারণে দারিদ্র্য হারও দ্রুত কমছে। ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সামাজিক দায়বোধসম্পন্ন অবদান সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্য এবং স্থিতিশীলতাকেও দৃঢ়তর করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচি এরই মধ্যে দেশে-বিদেশেও ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সূচকে বাংলাদেশ অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ২০১১ সাল পর্যন্ত তৈরি ‘গ্লোবাল ফিনডেক্স’ অনুযায়ী বাংলাদেশ (৩৯ দশমিক ৬ শতাংশ) দক্ষিণ এশিয়াভুক্ত দেশগুলোর গড়ের (৩৩ শতাংশ) চেয়ে বেশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি অর্জন করেছে। হালের মোবাইল ব্যাংকিং ও ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের অর্জন ৭০ শতাংশের মতো যে হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যুগোপযোগী উন্নত সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি দেশের দারিদ্র্য মোকাবেলায়ও আশাব্যঞ্জক ভূমিকা পালন করে চলেছে। মূলধারার মুদ্রানীতির পরিসরে থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক এ সৃজনশীল আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কৌশল গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে চলেছে। সারা বিশ্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের এ অভিনব আর্থিক নীতি-কৌশল আগ্রহের সঙ্গে অবলোকন করছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রহণও করছে।

লেখক: গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here