বন্ধ হচ্ছে বিমানের ম্যানেচস্টার অফিস

0
512

ফারুক যোশী, নর্থওয়েস্ট থেকে : নর্থওয়েস্ট ইংল্যান্ডের বাঙালি অভিবাসীদের বহুকাক্ষিত বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট চালু হবার ক্ষীণ সম্ভাবনা টুকুও শেষ হয়ে গেল। দীর্ঘদিন থেকে এক লাখেরও অধিক বাঙালি অধ্যুষিত অভিবাসীরা এ স্বপ্নই দেখে আসছিল যে, বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট আবার চালু হবে ম্যানচেস্টার থেকে।

কিন্তু মাত্র এক সপ্তাহ আগের একটা ইমেইলের মাধ্যমে নর্থওয়েস্টের বাঙালিদের সে স্বপ্ন হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। বিমানের বোর্ড অব ডাইরেক্টরস-এর এক আদেশে বিমান ম্যানচেস্টার অফিসটি বন্ধ করার জন্যে যথাযোগ্য পদক্ষেপ নিতে ম্যানচেস্টার অফিসকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ বিমানের ম্যানচেস্টারের অফিসটি চালু হয়েছিল ১৯৭৭ সালে। শহরের ব্যয়বহুল পোর্টল্যান্ড স্ট্রিটে অফিসটির অবস্থান। একজন রিজিওনাল ম্যানেজারসহ এখানে কাজ করেন ৫ জন কর্মকর্তা।

বিমানের স্থানীয় অফিস সূত্রে জানা যায়, ম্যানচেস্টার অফিসের মাধ্যমে বছরে ৩ মিলিয়ন পাউন্ডের অধিক ব্যবসা হয়। বিমান অফিসের প্রতি মাসের সরাসরি বিক্রয় প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার পাউন্ডের মতো। যদিও এ অফিসের খরচই আছে মাসে ১২ হাজার পাউন্ডের অধিক।

ব্রিটেনে প্রায় ৫ লাখ বাঙালিদের বসবাস। এদের অধিকাংশ থাকে লন্ডনেই। ২০১১ সালের ব্রিটেনের আদমশুমারি অনুযায়ী নর্থওয়েস্ট ইংল্যান্ডে বাস করেন ৪৫৯৮৭ জন, নর্থইস্টে ১০৯৭২ জন, ইয়র্কশিয়ার এবং হামবারে ২২৪২৪ জন, স্কটল্যান্ডে বাস করেন ৩৭৮৮ জন বাংলাদেশি বংশদ্ভূত মানুষ।

এ ছাড়া নর্থওয়েস্ট ইংল্যান্ডের পার্শ¦বর্তী ইস্ট মিডল্যান্ডে বাস করেন ৫২৪৭৭ জন মানুষ। এ সংখ্যা বেড়েছে গত ৫ বছরে এক লাখেরও বেশি। এসব এলাকার বাঙালিরা প্রতিদিন বিভিন্ন ফ্লাইট ব্যবহার করে ম্যানচেস্টার এয়ারপোর্ট থেকে। ব্রিটেনের ব্যস্ততম ম্যানচেস্টার এয়ারপোর্ট থেকে অধিকাংশ বাঙালি দেশে যাতায়াত করে আমিরাত এবং ইত্তেহাদ এয়ারলাইন্সে।

কমিউনিটির মানুষের প্রয়োজনীয়তা এবং বিমানের ব্যবসায়িক চাহিদাকে সামনে রেখেই ২০০৬ সালে বিমান ম্যানচেস্টার-ঢাকা ফ্লাইট চালু করে। ম্যানচেস্টারের একটা অভিজাত হোটেলে আয়োজন করা হয় জমকালো অনুষ্ঠানের। বিএনপি আমলের মন্ত্রীদের উপস্থিতিতে আর বিমান কর্মকর্তাদের প্রচুর অর্থ খরচের মধ্য দিয়ে চালু হওয়া ম্যানচেস্টার-ঢাকা ফ্লাইট চলেও কিছুদিন। আরো ৫ বছর পর ২০১১ সালে আবার ফ্লাইট চালু করে বিমান। ভালোই চলেছে বিমানের ফ্লাইট।

ফ্লাইট সিডিউলের অনিশ্চয়তা, সময়ের অনিয়ম প্রভৃতি থাকলেও বাঙালিরা এর পরেও বিমানকেই বেছে নিত দেশভ্রমণে। আর সে কারণে ২০১১ সালে বিমানের ম্যানচেস্টার অফিসকে সে সময় ব্যবসার লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছিল ৫২ কোটি টাকার। কিন্তু মাত্র ৯ মাস পরেই ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায়।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে এ সময়ে বিমানের ফ্লাইট শুরু হলে প্রথমাবস্থায় যাত্রীদের লোড (আসন পরিপূর্ণতা) পুরোপুরি না হলেও ৭ মাস চলার পর পঁচাত্তর শতাংশ আসন তারা প্রতিটি ফ্লাইটে পূর্ণ করতে পারত। আর সে কারণেই ম্যানচেস্টার অফিস ৯ মাসেই তাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বেশি বিক্রি করেছে অর্থাৎ মোট বিক্রি হয়েছে সাড়ে ৫৪ কোটি টাকা।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর অন্যান্য জায়গার তুলনায় বিমানের ম্যানচেস্টার অফিস ছিল একটা লাভজন প্রতিষ্ঠান। অথচ প্রায় চল্লিশ বছরের বিমান ম্যানচেস্টারের ইতিহাসে বলতে গেলে মাত্র বছর দেড়েক চলেছে বিমানের ফ্লাইট।

এদিকে বিমানের অফিসটি এখান থেকে তুলে দেয়ার নির্দেশনা নর্থওয়েস্টে আনঅফিসিয়ালি প্রচার হবার পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া এসেছে জনসাধারণের পক্ষ থেকে। যদিও বিমান তার দীর্ঘদিনের লাভক্ষতির হিসেবে কষে একসঙ্গে নিউইয়র্ক এবং ম্যানচেস্টার অফিসটি বন্ধের নির্দেশনা জারি করেছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে। কিন্তু ম্যানচেস্টার ওল্ডহ্যাম, রচডেল হাইড, লিভারপুল, লিডসহ নর্থওয়েস্ট ইংল্যান্ডের কোনো বাঙালিই চান না এ অফিসটি এখান থেকে উঠিয়ে নেয়া হোক।

এদিকে গত মাসে ম্যানচেস্টারের এক প্রতিনিধিদল ঢাকায় বিমানের এমডি ও চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ ম্যানচেস্টার শাখার সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মীর গোলাম মোস্তফাও এ প্রতিনিধিদলে ছিলেন।

বিমান ম্যানচেস্টার অফিস বন্ধ হবার খবরে তার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি জানান, এটা বর্তমান সরকারের একটা ভালো উদ্যোগ। বিমান কর্তৃপক্ষ আমাদের আশ্বস্ত করেছেন এই্ বলে যে, ২০১৮ তে তারা বিমানের ম্যানচেস্টার-ঢাকা কিংবা সিলেট ফ্লাইট চালু করতে পারে। তবে এ রকম ফ্লাইট চালু করার জন্যে আজকের ডিজিটাল দুনিয়ায় এত বিলাসবহুল ও ব্যয়বহুল অলাভজনক একটা অফিসের কোনো প্রয়োজন নেই।

এক প্রতিক্রিয়ায় ওল্ডহ্যাম বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মওদুদ আহমদ জানান, যেহেতু এ অফিসের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ খুব একটা সেবা পাচ্ছে না এবং দীর্ঘদিন থেকেই এ অফিসে বিমান ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে, সে হিসেবে বিমান ম্যানচেস্টার অফিস বন্ধ করে দেয়া হলে সরকারের সাশ্রয়ই হবে। তবে আমাদের দাবি অচিরেই যেন স্বল্প পরিসরে একটা অফিস রেখে ম্যানচেস্টার-ঢাকা কিংবা সিলেট ফ্লাইট চালু করা হয়।

স্থানীয় একজন ট্রাভেলস ব্যবসায়ী ওল্ডহ্যামের প্রাইম এক্সপ্রেসের পরিচালক ইকবাল আহমদ জানান, বিমানকে এখনো লাভজনক করা যেতে পারে। দুবাইতে বিমানের একটা বড় চাহিদা আছে, সেখানে বিমানের যাত্রী সংখ্যাও প্রচুর। সে হিসেবে এখনো সময় আছে, ম্যানচেস্টার থেকে দুবাই হয়ে ঢাকায় কিংবা সিলেটে ফ্লাইট চালু করা যেতে পারে এবং এটা একটা লাভজনক রুট হবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

জানা গেছে, ২০১৯ পর্যন্ত বিমান অফিসটির লিজ কিংবা এগ্রিমেন্ট আছে। তা ছাড়া আরো কিছু অফিসিয়াল নিয়ম-কানুন শেষ করতে হয়ত সময় লাগতে পারে। ম্যানচেস্টার বিমান অফিসের এক কর্মকর্তার সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিমান বন্ধের নির্দেশনার কথা স্বীকার করেন, তবে কীভাবে কখন এ অফিস বন্ধ হবে, তা তিনি বলতে পারেননি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here