বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু ১ সেপ্টেম্বর থেকে

0
465

বিশেষ প্রতিনিধি : নিজ কক্ষপথে ভালো মতোই কাজ করছে দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (বিএস-১)। উৎক্ষেপণের পর এর ‘ইন অরবিট’ টেস্ট সম্পন্ন হয়েছে সফলভাবে। এখন চলছে ‘নেটওয়ার্ক এক্সেপটেন্স’ টেস্টের কাজ। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে স্যাটেলাইটটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ জন্য প্রথম থেকেই বাজার দরের চেয়ে অনেক কম দামে ফ্রিকোয়েন্সি ভাড়া দেয়ার পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএসসি)। দেশি-বিদেশি বড় বড় গ্রাহকের পাশাপাশি ভি-স্যাট ব্যবহারকারী ছোট গ্রাহকদের কাছেও ফ্রিকোয়েন্সি ভাড়া দেয়ার আগ্রহ রয়েছে তাদের।

বিসিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল ইসলাম জানান, সমুদ্র ও নদীতে নৌযানগুলোর সঙ্গে রেডিও যোগাযোগের জন্য বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ব্যবহার করা হবে। শিগগিরই এ বিষয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তি হবে।

এ ছাড়া দেশীয় টেলিভিশন চ্যানেল, সশস্ত্র বাহিনীসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ স্যাটেলাইট ব্যবহার করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে সিঙ্গাপুরে এজেন্ট নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার কথাও জানান তিনি।

গাজীপুরের গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে বর্তমানে স্যাটেলাইটটি নিয়ন্ত্রণ করছেন নির্মাণকারী ফরাসি প্রতিষ্ঠান থ্যালাস এলেনিয়ার প্রকৌশলীরা। বাংলাদেশের প্রকৌশলীরাও রয়েছেন তাদের সঙ্গে।

সেখানকার একটি সূত্র জানায়, স্যাটেলাইটের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারগুলো ঠিকমতো কাজ করলেও নিজ কক্ষপথ থেকে অনেক সময় সরে যেতে চাইছে বিএস-১। একে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার কক্ষপথে গ্রহণযোগ্য মাত্রায় স্থির রাখতে হবে। নইলে বাণিজ্যিক কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ে শুরু করা যাবে না।

তবে কক্ষপথ থেকে সরে যাওয়ার এ প্রবণতা স্বাভাবিক বলে জানিয়েছেন গ্রাউন্ড স্টেশনে কর্মরত বাংলাদেশি এক প্রকৌশলী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই প্রকৌশলী জানান, স্যাটেলাইট তার অরবিটাল উইন্ডো থেকে বের হয়ে যেতে সব সময় চেষ্টা করে। সেটাকে কক্ষপথে ঠিক রাখার জন্য গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে নির্দেশনা পাঠাতে হয়। এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আগামী ১৫ বছর ধরেই এ কাজ করতে হবে বলে জানান তিনি।

গত ১১ মে (বাংলাদেশ অনুযায়ী ১২ মে) যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ কেনাভেরালে স্পেস এক্সের উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে ফ্যালকন-৯ রকেটে মহাকাশ যাত্রা করে বিএস-১। পরদিন ইন্দোনেশিয়ার সুমবা দ্বীপের ওপর দিয়ে উড়ে নিজ কক্ষপথের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চিত্র প্রকাশ করে স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান স্টাফ ল্যায়ার।

প্রথম ধাপ ‘লঞ্চ এন্ড আরলি অরবিট ফেইজ (এলইওপি)’ সম্পন্ন করে গত ২৩ মে দ্বিতীয় ধাপে নিজ কক্ষপথে অবস্থান নেয় স্যাটেলাইটটি। সেখানে স্যাটেলাইটটি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় ২০ দিন ধরে গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম চালানো হয়। ইন অরবিট টেস্টের মাধ্যমে তা শেষ করা হয়। বতর্মানে স্যাটেলাইটের ফ্রিকোয়েন্সির সঙ্গে নেটওয়ার্ক সংযোগ স্থাপনের কাজ বা নেটওয়ার্ক এক্সেপটেন্স টেস্ট চলছে।

সব ধরনের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষে স্যাটেলাইটের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প পরিচালকের কাছ থেকে বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানির (বিসিএসসি) কাছে হস্তান্তর করা হবে। এটি আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে হতে পারে। এরপর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হবে।

এ প্রসঙ্গে বিসিএসসির জেনারেল ম্যানেজার বখতিয়ার আহমেদ জানান, আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি রয়েছে তাদের। এ জন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো আগেই সেরে রাখছেন তারা। তিনি বলেন, আমরা ফ্রিকোয়েন্সির জন্য প্রাথমিক একটি দাম নির্ধারণ করেছি। আর তা বাজারদরের চেয়ে অনেক কম। তবে ব্যবসায়িক গোপনীয়তার স্বার্থে তিনি এখনই ইউনিট মূল্য প্রকাশ করতে রাজি হননি।

গত বছরের ১৫ জানুয়ারি রাশিয়ার ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে ২৮ মিলিয়ন ডলারে ১৫ বছরের জন্য অরবিটাল প্লট ভাড়া নেয় বাংলাদেশ। এখানে আরো ২টি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা যাবে। এটি পরিচালনার জন্য মূল গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণ করা হয় গাজীপুরে। তবে রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়া গ্রাউন্ড স্টেশন থেকেও প্রয়োজনে এটি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের খরচ ধরা হয় ২ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে হংকং-সাংহাই ব্যাংকের (এইচএসবিসি) সঙ্গে ১ হাজার ৪শ কোটি টাকার একটি ঋণ চুক্তি সই করে বিটিআরসি।

স্যাটেলাইট নির্মাণ, সিস্টেম কেনা ও গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণের জন্য এই টাকা দেয় ব্যাংকটি। তবে পরে এ ব্যয় কমে গিয়ে ২ হাজার ৯০২ কোটি টাকায় নেমে আসে। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা এবং বাকি ১ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা বিডার্স ফাইনান্সিংয়ের মাধ্যমে সংস্থান করা হয়েছে।

স্যাটেলাইটটি নির্মাণ করে ফ্রান্সের কোম্পানি থ্যালাস এলেনিয়া। চুক্তি অনুযায়ী তিন বছর পর্যন্ত এ স্যাটেলাইটটির কারিগরি পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে তারা। তিন বছর পর বাংলাদেশের কাছে পরিচালনার পুরো দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হবে। এ জন্য ৩৪ জন বাংলাদেশি প্রকৌশলীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

মূলত যোগাযোগধর্মী এ স্যাটেলাইট দিয়ে টেলিভিশন সম্প্রচার ছাড়াও ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, ভি-স্যাট ও বেতার, ই-সেবাসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা পাওয়া যাবে। এতে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার রয়েছে যার মধ্যে ২০ বাংলাদেশ নিজস্ব প্রয়োজনে রেখে বাকি ২০টি ভাড়া দেয়া হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here