ফিরে দেখা : সম্পদ ছিল বিনিয়োগ হয়নি

0
1232

অর্থনীতিবিদেরা সব সময়ই মনে করেন, গত বছরটাই আসলে বিনিয়োগ বা কেনাকাটার জন্য ভালো ছিল। ২০১৫ সালে অর্থনীতিবিদদের নিয়ে প্রচলিত এই কথাটা কেবল মিলল না বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই। বিদায়ী বছরটি বিনিয়োগের জন্য ভালো ছিল না, তেমনি ভালো ছিল না শেয়ারবাজারে কেনাবেচার দিক দিয়েও।

000সামগ্রিকভাবে ২০১৫ বিনিয়োগ স্থবিরতা আরও প্রকট হওয়ার বছর, মন্দা শেয়ারবাজারের বছর। বিদায়ী বছরটি সব ধরনের বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার বছর। তবে এসব অস্বস্তির পাশাপাশি স্বস্তিও ছিল। অনেকটা অর্থনীতিবিদদের সেই ‘অন দ্য আদার হ্যান্ড’-এর মতো। বিশ্বজুড়ে অর্থনীতির মন্দার মধ্যেও রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছেন উদ্যোক্তারা। তবে সবচেয়ে বড় স্বস্তি ছিল নিয়ন্ত্রণে থাকা মূল্যস্ফীতি। বাজার এবার খুব বেশি যন্ত্রণা দেয়নি। মাঝেমধ্যে উত্তাপ ছড়ালেও বাজারে আগুন লাগেনি।

২০১৫ সালে মনে রাখতে হবে ১ জুলাই তারিখটিকে। ওই দিন দেশের মানুষের আয় হয়তো এক টাকাও বাড়েনি, তবে দিনটি ছিল কলার উঁচিয়ে চলার বছর। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ ছিল স্বল্প আয়ের দেশ। আর এখন বাংলাদেশ নিম্ন–মধ্যম আয়ের দেশ। বিদায়ী বছরটিতে মাথা উঁচু করে বাংলাদেশ কথা বলেছে পদ্মা সেতু নিয়েও। নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতুর মূল নির্মাণকাজ শুরু করা হয়েছে এ বছরেই। যদিও পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে একটি মামলা এখনো কানাডার আদালতে বিচারাধীন।

বাংলাদেশে এখন সম্পদের অভাব নেই; অভাব কেবল উদ্যোগ, আগ্রহ ও আস্থার। ব্যাংকে পড়ে আছে এক লাখ কোটি টাকারও বেশি অলস অর্থ। বিনিয়োগের তুলনায় দেশে সঞ্চয়ের হার বেশি। ব্যবহার করতে না পারায় দাতাদের দেওয়া সাহায্য পড়ে আছে দুই হাজার কোটি ডলারেরও বেশি। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত এখন ২ হাজার ৭৩৫ কোটি ডলার।

কাঁচামালসহ বিশ্ববাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এমনকি বিনিয়োগ করার মতো উদ্যোক্তারও অভাব নেই। অথচ নিয়োগ নিয়ে চলছে হাহাকার। একদিকে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট। এ কারণে বিনিয়োগযোগ্য অর্থ আছে প্রচুর, কিন্তু নতুন বিনিয়োগ করছেন না কেউ। নির্মলেন্দু গুণের কবিতার ভাষায়, ‘এ রকম বাংলাদেশ কখনো দেখনি তুমি, কখনো দেখেনি কেউ’।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য শামসুল আলম মনে করেন, এখনই বিনিয়োগের সবচেয়ে ভালো সময়। কেননা, মূল্যস্ফীতি, নিম্নমুখী প্রবণতা রয়েছে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামও কম। স্থানীয় বাজারে শিল্প খাতের পণ্য যেমন রডের দাম ৪৪ হাজার টাকায় নেমে এসেছে।

তবে তিনি বলেন, বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে অবশ্যই জমির প্রাপ্যতা, ব্যাংকঋণ, জ্বালানি-সংকটের বিষয়গুলোতে নজর দিতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এক দিনে হবে না, এটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। আর বিনিয়োগকারীর পুঁজির নিরাপত্তা সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর মতে, এ দেশে পুঁজি অনিরাপদ বলেই বিদেশে চলে যায়।

নজর দিই বিশ্ব অর্থনীতির দিকে। ২০১৫ সালে বিশ্ব অর্থনীতিকে থাকতে হয়েছে ‘রোলার কোস্টারে’। কেবল চড়াই-উতরাই। শুরু হয়েছিল গ্রিসের অর্থনীতিকে বাঁচানোর মধ্য দিয়ে, মাঝে ঘটেছে গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় অঘটন-শ্লথ হয়ে পড়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের অর্থনীতি, যার প্রভাব পড়ছে সারা বিশ্বে।

বছর জুড়ে চলেছে অবমূল্যায়নের মুদ্রাযুদ্ধ। আর বছরের ঠিক শেষে বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক নীতি নির্ধারণী সুদের হার বাড়িয়ে তেজি ডলারের লাগাম টেনে ধরার পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা সহজে কাটবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবে বিদায়ী বছরটি মানুষ বেশি মনে রাখবে ১১ বছরের মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম সবচেয়ে নিচে চলে যাওয়ার বছর হিসাবে। কেবল জ্বালানি তেলই নয়, প্রায় সব ধরনের ভোগ্য পণ্যের দরই ছিল প্রায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে।

যদিও বিশ্ব অর্থনীতির এই টালমাটাল অবস্থা ছিল বাংলাদেশের জন্য আদার ব্যাপারীর জাহাজের খোঁজ নেওয়ার মতোই। কারণ জ্বালানি তেলের দাম কমার কোনো প্রভাব নেই দেশের মানুষের জীবনযাপনে। মুদ্রাযুদ্ধেও অংশ নেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশ্ববাজারের নিম্নগতি সরকারের ব্যয় কমিয়েছে, হয়েছে অর্থের সাশ্রয়, কিন্তু সাধারণ মানুষ পায়নি এর সুফল।

বছরটা কিন্তু শুরু হয়েছিল খুব খারাপভাবে। এগিয়ে চলা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ছাপিয়ে গিয়েছিল রাজনীতি। বিএনপি জোটের টানা অবরোধ চলেছে দিনের পর দিন। সহিংসতায় ঘটেছে প্রাণহানি। অর্থনীতিও হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত। ভেঙে পড়েছিল সরবরাহ ব্যবস্থা। ব্যবসায়ীরাও ব্যস্ত ছিলেন ক্ষতির হিসাব-নিকাশে। সেখান থেকেও ঘুরে দাঁড়ায় অর্থনীতি। বিদায়ী বছরটি ছিল ২০১৪-১৫ অর্থবছরের শেষ ৬ মাস। ওই অর্থবছরে দেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ। আর পরের ৬ মাসের গতি প্রকৃতি দেখে বিশ্বব্যাংক বলছে প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ হবে। তবে সরকারের প্রত্যাশা ৭ শতাংশের।

ড. শামসুল আলম এ বিষয়ে বলেন, এ বছরের প্রথম প্রান্তিকে দুর্যোগপূর্ণ সময় গেছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দুর্যোগ বন্ধ হলে দ্রুত হতাশা কাটিয়ে উঠে অর্থনীতি স্বাভাবিক ধারায় এসেছে।

বছরের শুরুটা খারাপ হলেও এখন পর্যন্ত রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৬.৭১ শতাংশ। তবে আমদানি ব্যয় কমেছে। খানিকটা বিশ্ববাজারে কম দামের কারণে, বাকিটা বিনিয়োগ মন্দার প্রভাব। কমেছে শিল্পে ব্যবহারের পুঁজি পণ্য ও যন্ত্রপাতির আমদানি। অস্বস্তি আরও বাড়িয়েছে প্রবাসী-আয়। নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে এ ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি। কমেছে শিল্প উৎপাদন সূচকও।

সামগ্রিকভাবে বিদায়ী অর্থবছরের অর্থনীতি ছিল আক্ষরিক অর্থেই ঠান্ডা। বৈশ্বিক উত্তাপ তেমন স্পর্শ করেনি দেশের অর্থনীতিকে। তবে রাজস্ব আদায়, প্রবাসী-আয় ও বিনিয়োগের মতো কিছু অভ্যন্তরীণ সূচক অস্বস্তি বাড়াচ্ছে। তবে অর্থনীতিকে হয়তো প্রশ্ন করা যাবে না-‘হে পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছো’? কিন্তু এ কথা অবশ্যই বলা যাবে, অর্থনীতি পথ হারায়নি ঠিকই, তবে খানিকটা উত্তাপ অবশ্যই হারিয়েছে।

লেখক- শওকত হোসেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here