জানুয়ারিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কম, ফেব্রুয়ারিতে ইতিহাস সৃষ্টির আভাস

0
5130

বিশেষ প্রতিনিধি : বাজার মূলধনের হিসাবে জানুয়ারি মাসে শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক ও উদ্যোক্তা-পরিচালকদের বিনিয়োগ কমেছে। একই ধারা ছিল গত ডিসেম্বরেও। পরিশোধিত মূলধনের হিসাবেও একই সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক, উদ্যোক্তা ও সরকারের অংশের শেয়ার কমেছে।

তবে জানুয়ারি মাসের বিনিয়োগ পরিমাণকে ফেব্রুয়ারি মাসে ইতোমধ্যে ছড়িয়ে গেছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে দ্বিগুণ-তিনগুণভাবে। তবে চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কি পরিমাণ বেড়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা এখনি প্রকাশ করছে না। তবে বিনিয়োগের নতুন ইতিহাস সূচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা।

তবে উভয় হিসাবেই বেড়েছে বিদেশি এবং দেশি ব্যক্তি-শ্রেণির বিনিয়োগের পরিমাণ। বিদ্যুৎ পরিচালন কোম্পানি ডেসকোর শেয়ার বিক্রি করায় মূলধনের হিসাবে সরকারের সার্বিক শেয়ার ধারণ কমলেও অন্য সরকারি কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজার মূলধনের হিসাবে সরকারের অংশ বেড়েছে।

গত জানুয়ারি শেষে তালিকাভুক্ত ২৯৪ কোম্পানির মধ্যে প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসই সূত্রে প্রাপ্ত ২৮৫টিতে বিভিন্ন ক্যাটাগরির শেয়ার ধারণের হিসাব পর্যালোচনায় এ তথ্য মিলেছে।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ পরিসংখ্যান : গত জানুয়ারি পর্যন্ত তালিকাভুক্ত ২৯৪ কোম্পানির মধ্যে ২৮৬টিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল। গত ডিসেম্বরের তুলনায় ১১৯টিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কমেছে ও বেড়েছে ১১৮টিতে। বাকি ৪৯টিতে অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে যেসব কোম্পানিতে বিনিয়োগ বেড়েছে, সে বৃদ্ধির তুলনায় অন্যগুলোতে বিনিয়োগ হ্রাসের হার ছিল অনেকটাই বেশি।

প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক মাসের ব্যবধানে একক কোম্পানিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ সর্বাধিক ২৮ শতাংশ কমেছে কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্সে। ডিসেম্বর শেষে বীমা কোম্পানিটিতে প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার ছিল ৪০ দশমিক ৩১ শতাংশ। জানুয়ারি শেষে তা নেমেছে সোয়া ১২ শতাংশে।

প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ার ধারণ হ্রাসে এর পরের অবস্থানে ছিল বিআইএফসি (১২.৯৩ শতাংশ), সিএমসি কামাল (১২.৭৭), সেন্ট্রাল ফার্মা (১১.১৩), প্রগতি ইন্স্যুরেন্স (১০.৩৩), এসিআই (৯.৪৭), সিএনএ টেক্সটাইল (৮.২২), ইসলামিক ইন্স্যুরেন্স (৭.৫৩), সালভো কেমিক্যাল (৭.৪২), বিবিএস (৭.৩৩), বিডি থাই (৭.০১)। এ ছাড়া ৫ থেকে প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ার ধারণ কমেছে তুংহাই, আরামিট সিমেন্ট, ওরিয়ন ইনফিউশন্স, হামিদ ফেব্রিক্স, ইনটেক অনলাইন, জেনারেশন নেক্সট, সায়হাম কটন, তসরিফা এবং আর্গন ডেনিমে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডিসেম্বর মাস শেষে বাজার মূলধনের হিসাবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের অংশ ছিল মোটের ১৫ দশমিক ১৪ শতাংশ। জানুয়ারি শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ৯২ শতাংশে। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ কমেছে। যদিও এ সময়ে ২৯৪ কোম্পানির বাজার মূলধন ২৪ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা বা সাড়ে ৭ শতাংশ বেড়ে ৩ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

অন্যদিকে, জানুয়ারি শেষে ২৯৪ কোম্পানিতে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার ছিল মোটের ৫৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। সরকারি অংশ ছিল ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ। বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ৬ দশমিক ১৪ শতাংশ ও ব্যক্তি বিনিয়োগ ছিল ১৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এ সময়ে ২৯৪ কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ছিল ৫৪ হাজার ৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ ছিল ১৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

গত ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত পরিশোধিত মূলধন মাত্র ৮৫ কোটি টাকা কম ছিল। ওই সময় প্রাতিষ্ঠানিক অংশ ছিল মোটের ১৯ দশমিক ০৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত শেয়ার ধারণ কমেছে শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশ।

গত জানুয়ারি শেষে পরিশোধিত মূলধনের হিসাবে ২৯৪ কোম্পানিতে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের অংশ ছিল ৪১ দশমিক ০১ শতাংশ। সরকারি অংশ ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ৩ দশমিক ০৯ শতাংশ ও ব্যক্তি বিনিয়োগ ছিল ৩২ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

শেয়ারবাজারের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত নভেম্বর থেকেই একটু করে প্রাতিষ্ঠানিক ও উদ্যোক্তা-পরিচালকদের বিনিয়োগ কমেছে। বেশিরভাগ শেয়ারের দরবৃদ্ধির সুবিধা নিতে অধিকাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং কিছু উদ্যোক্তা-পরিচালক শেয়ার বিক্রি করেন।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ কমার কারণ ব্যাখ্যায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রিকে চিহ্নিত করেছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। গত নভেম্বর থেকে শেয়ারদর বৃদ্ধির কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের বিনিয়োগ আইনি সীমার মধ্যে রাখতে শেয়ার বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে।

এ বিষয়ে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর সংগঠন বিএমবিএর সভাপতি ছায়েদুর রহমান স্টক বাংলাদেশকে বলেন, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সব শেয়ারের দর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেড়েছিল। বাজারদর বৃদ্ধির কারণে তাদের এক্সপোজার (মোট বিনিয়োগ) বেড়েছিল। এ অবস্থায় শেয়ার বিক্রি করা ছাড়া উপায় ছিল না।

তবে ফেব্রুয়ারি শেষে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গত বছরের আর্থিক প্রতিবেদন নিরীক্ষা শেষে যে মুনাফা আসবে, তার কিছু অংশ মূলধনে যোগ হবে। তখন বিনিয়োগ সীমা বাড়বে। এসব প্রতিষ্ঠান সে সুযোগ নেবে বলে তার আশা। তখন এ চিত্রে পরিবর্তন আসবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অর্থনীতিবিদ ও শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহমেদ বলেন, বছর শেষে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করে মুনাফা নেবেন এটাই স্বাভাবিক। তারা একদিকে শেয়ার বিক্রি করেন, অন্যদিকে কেনেন। এ ক্ষেত্রে ভারসাম্য না রাখলে বাজারের সার্বিক ভারসাম্য ঠিক থাকে না। গত জানুয়ারি শেষে তেমনটি দেখা গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here