প্রশ্নবিদ্ধ কোম্পানি নিয়ে ‘সেকেন্ডারি মার্কেটে’ মন্দাভাব

1
3131

শাহীনুর ইসলাম : পুঁজিবাজারে ‘আসা কোম্পানিগুলোর মান নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন’ থাকায় দীর্ঘদিন ধরে ‘সেকেন্ডারি মার্কেটে’ মন্দাভাব চলছে। সেই ধাক্কা লেগেছে আইপিওর বাজারেও। যে কারণে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও শেয়ারেও লোকসান গুনতে হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের।

তবে বছরের শুরুতে মন্দার বিপরিতে স্থান করে নিতে দেখা যায় ইনফরমেশন টেকনোলজি কনসালটেন্টস লিমিটেডের (আইটিসি) শেয়ার দর। তর তর করে বাড়ছে শেয়ারপ্রতি দর।

অন্যদিকে বৃহস্পতিবার লেনদেনে আসা এসইএমএল লেকচার ইক্যুয়িটি ফান্ড দর বৃদ্ধিতে চমক সৃষ্টি করেছে। প্রথম দিনের লেনদেন শেষে ফান্ডটির ইউনিটের দর দাঁড়িয়েছে ১৪.৯ টাকায়। ৪৯ শতাংশ বেড়ে দিনশেষে ফান্ডটির দর বেড়েছে ৪.৯ টাকা। গত বছরের ফান্ডগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বিস্ময়!

সদ্য বিদায়ী ২০১৫ সালে ১৪টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ড বাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। আইপিওর মাধ্যমেই এসব শেয়ার বাজারে এসেছে। বছর শেষে দেখা যাচ্ছে, তালিকাভুক্তির প্রথম দিনের আইপিও শেয়ার থেকে বিনিয়োগকারীদের যে আয়, সেটি আগের বছরের চেয়ে ৪০ শতাংশ কমেছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে তালিকাভুক্তির প্রথম দিনে আইপিও শেয়ার থেকে বিনিয়োগকারীদের গড় আয় ছিল ১১৪ শতাংশ। ২০১৫ সালে সেটি কমে নেমে এসেছে ৭৮ শতাংশে। অর্থাৎ আইপিওর শেয়ারের মুনাফা ৪০ শতাংশ কমেছে এক বছরের ব্যবধানে।

পরিসংখ্যানগত বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়, ২০১৪ সালে যে বিনিয়োগকারী কোনো এক কোম্পানির আইপিও শেয়ারে ৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন, লেনদেনের প্রথম দিনে ওই কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে তার মুনাফা হয়েছিল ৫ হাজার ৯০০ টাকা। আরও সহজ করে বললে, ২০১৪ সালে তালিকাভুক্তির প্রথম দিনে ৫ হাজার টাকার সমমূল্যের আইপিও শেয়ার বিক্রি করে একজন বিনিয়োগকারী গড়ে পেয়েছিলেন ১০ হাজার ৯০০ টাকা।

২০১৫ সালে সেই মুনাফার পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে গড়ে ৩ হাজার ৯০০ টাকায়। অর্থাৎ ২০১৫ সালে তালিকাভুক্তির প্রথম দিনে ৫ হাজার টাকার আইপিও শেয়ার বিক্রি করে একজন বিনিয়োগকারী পেয়েছেন গড়ে ৮ হাজার ৯০০ টাকা। এত গেল বাজারে নতুন তালিকাভুক্ত হওয়া আইপিও শেয়ারের প্রথম দিনের লেনদেনসংক্রান্ত মুনাফার চিত্র।

তালিকাভুক্তির পর দিন যত গেছে, হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি ছাড়া বেশির ভাগেরই শেয়ারের দাম কমেছে। ফলে যেসব বিনিয়োগকারী তালিকাভুক্তির প্রথম দিনে আইপিও শেয়ার বিক্রি না করে বেশি লাভের আশা করেছিলেন, তাদের আরও বেশি লোকসান গুনতে হয়েছে।

২০১৫ সালে নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানি তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ রিজেন্ট টেক্সটাইলের কথাই ধরা যাক- ১০ টাকা অভিহিত মূল্য বা ফেসভ্যালুর সঙ্গে ১৬ টাকা অধিমূল্য বা প্রিমিয়াম যোগ করে আইপিওতে তসরিফার প্রতিটি শেয়ারের বিক্রয়মূল্য ছিল ২৬ টাকা। লেনদেন শুরুর প্রথম দিনে এটির সর্বোচ্চ দাম উঠেছিল ৩৬ টাকায়। এরপর দাম কমতে কমতে প্রতিটি শেয়ার বৃহস্পতিবার বিক্রি হয় ১৯ টাকা ৩০ পয়সায়।

রিজেন্ট টেক্সটাইলের আইপিও শেয়ার নিয়ে আরও বাজে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় বিনিয়োগকারীদের। লেনদেন শুরুর দ্বিতীয় দিনেই এটির শেয়ারের বাজারমূল্য আইপিও দামের নিচে নেমে যায়। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের সঙ্গে ১৫ টাকা অধিমূল্য যোগ করে রিজেন্ট টেক্সটাইলের প্রতিটি শেয়ারের আইপিও মূল্য ছিল ২৫ টাকা। লেনদেনের প্রথম দিনে এটির সর্বোচ্চ দাম উঠেছিল ২৫ টাকা ৫০ পয়সায়। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের বাজারমূল্য ছিল প্রায় সাড়ে 21.20 টাকা।

কোম্পানি নিয়েছে ১৫ টাকা প্রিমিয়াম এবং ১০ টাকা শেয়ারের অভিহিত মূল্য। সব মিলে ২৫ টাকা মূল্যে আইপিও অনুমোদন পাওয়া কোম্পানির প্রথম দিন সোমবার শেয়ার দর বেড়েছে মাত্র .৫০ পয়সা। রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের শতকরা হিসাবে দরবৃদ্ধির হার মাত্র ২ শতাংশ। যা নজিরবিহীন দর ও বিস্ময়!

আইপিও বাজারে এমন পরিস্থিতির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বাণিজ্য অনুষদের ডিন মোহাম্মদ মুসা বলেন, প্রথমত বাজারে আসা কোম্পানিগুলোর মান নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন ছিল।

দ্বিতীয়ত, ২০১৪ সালের চেয়ে ২০১৫ সালে বেশ কিছু কোম্পানি বেশি প্রিমিয়াম নিয়ে বাজারে এসেছে। তৃতীয়ত, নতুন তালিকাভুক্তির শুরুতে কারসাজি করে দাম বাড়ানো হয়, কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই দাম আর থাকে না। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন শেয়ারের বিপরীতে ঋণসুবিধা বন্ধ হওয়ায় নতুন শেয়ারের কারসাজি কিছুটা কমেছে।

২০১৫ সালে যে ১৪টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ড মিলে আইপিওর মাধ্যমে বাজার থেকে প্রায় ১ হাজার ৩৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা তুলে নেয়। সদ্য বিদায়ী বছরে বাজারে নতুন তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডগুলো হলো- কেডিএস এক্সেসরিজ, অলিম্পিক এক্সেসরিজ, বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস (বিএসআরএম), ইফাদ অটোস, আমান ফিড, ন্যাশনাল ফিড মিল, এশিয়ান টাইগার সন্ধানী লাইফ গ্রোথ ফান্ড, ইউনাইটেড পাওয়ার, সিমটেক্স, তশরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ, জাহীন স্পিনিং, শাশা ডেনিমস, সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল ও রিজেন্ট টেক্সটাইল।

এগুলোর মধ্যে- ন্যাশনাল ফিড, সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল, রিজেন্ট টেক্সটাইল, তশরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ, এশিয়ান টাইগার গ্রোথ ফান্ড, সিমটেক্স, শাশা ডেনিমসের শেয়ারের বর্তমান বাজারমূল্য হয়তো আইপিও মূল্যের কাছাকাছি অথবা নিচে রয়েছে।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here