বড়াল নদের ওপর দেশবন্ধু সিমেন্ট কারখানা

0
1169

স্টাফ রিপোর্টার : সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ী এলাকায় বড়াল নদের ওপর দীর্ঘ সেতু। সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে পূর্বদিকে তাকালেই চোখে পড়ে নদের ওপর বিশাল এক স্থাপনা। দূর থেকে প্রথমে বড় জাহাজ মনে হলেও আসলে এটি একটি সিমেন্ট কারখানা। বড়াল নদের ২০ বিঘা জমিতে স্থাপিত কারখানাটি দেশবন্ধু গ্রুপের।

সরেজমিন দেখা গেছে, সিরাজগঞ্জ-পাবনা মহাসড়কে বড়াল সেতু পার হয়ে বাঘাবাড়ী দক্ষিণ বাসস্টেশন। এখান থেকে নদঘেঁষে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মিত সরু একটি পাকা রাস্তা চলে গেছে পূর্বদিকে। এ রাস্তা ধরে ৩০০ মিটার এগোলেই হাতের বাম পাশে দেশবন্ধু সিমেন্ট কারখানা।

সম্পূর্ণ কারখানাই নদের ওপর। ফলে বিপরীত তীর থেকে কারখানাটিকে দেখলে মনে হয় যেন ভাসমান জাহাজ। নদের ওপর সিমেন্ট কারখানা তো রয়েছেই, উপরন্তু পাশেই মাটি ভরাট করেছে দেশবন্ধু গ্রুপ।

এ বিষয়ে দেশবন্ধু সিমেন্ট কারখানার জেনারেল ম্যানেজার একেএম কামরুজ্জামান বলেন, ২০০০ সাল থেকে এখানে কারখানা রয়েছে। প্রথমে ছিল পদ্মা সিমেন্ট। তৃতীয় পক্ষ হিসেবে আমরা কারখানাটি ক্রয় করে ২০১২ সাল থেকে সিমেন্ট উত্পাদন করছি। এর আগে আরো দুই পক্ষের মালিকানায় ছিল এটি। তার দাবি, ‘কারখানাটি নদের ওপর নয়; নদের ওপর হলে এটি ১৭ বছর ধরে চলতে পারত না।’

তবে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মো. আতাহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমি নিজে গিয়ে দেখে এসেছি সম্পূর্ণ কারখানাটি নদের ওপর। প্রথমে নোটিস করেছিলাম। তার পর জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছি কারখানাটি উচ্ছেদ করতে। কিছু জমি নিজেদের ব্যক্তিমালিকানায় আছে বলে আপিল করে কারখানা কর্তৃপক্ষ।

তবে আমি সরেজমিন দেখেছি, কারখানাটি নদীতীরে নয়, সম্পূর্ণ নদীর মধ্যে। ডিসিকে নির্দেশ দিয়েছি ব্যক্তিমালিকানায় কোনো অংশ রেকর্ড হয়ে থাকলেও দ্রুত তা সংশোধন করে ভেঙে ফেলতে। আর যে অংশ খাস রয়েছে, তাত্ক্ষণিক ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছি আমি। এছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।’

ওই সিমেন্ট কারখানাটি ছাড়া আশপাশে বড়াল নদের ওপর আর কোনো স্থাপনা নেই। কারখানার কিছু জমি ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড হলেও বাকি অংশ সরকারি খাসজমি। ২০১২ সালে এটি ক্রয় করে সিমেন্ট উত্পাদন শুরু করে দেশবন্ধু গ্রুপ।

সিমেন্ট কারখানা বিষয়ে জানতে চাইলে সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, ‘সম্পূর্ণ কারখানাটিই নদীর ওপর, এটা খালি চোখেই দেখা যায়। তবে সর্বশেষ ভূমি জরিপে ভুলবশত কিছু জায়গা ব্যক্তিমালিকানা হিসেবে রেকর্ড হয়ে যায়। বাকি অংশ খাসই রয়ে গেছে। এর পর ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড হওয়া অংশটি কিনে নেয় দেশবন্ধু গ্রুপ।

DESH BANDU
বড়াল নদের ২০ বিঘা জমিতে স্থাপিত কারখানা দেশবন্ধু গ্রুপের

যেটুকু ব্যক্তিমালিকানা হিসেবে রেকর্ড হয়েছে, তা সংশোধনের জন্য আমরা দেওয়ানি আদালতে মামলা করেছি। রেকর্ডের ভুল সংশোধন হলে আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা নেব। আর যে অংশটি খাস রয়ে গেছে, সে বিষয়ে আমরা নোটিস পাঠিয়েছি। এখনো জবাব পাইনি। নদীর উপরের এ স্থাপনা নিয়ে জেলা প্রশাসন সজাগ রয়েছে।’

নদীপথ ও নদীতীর দেখভালের দায়িত্ব বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ)। বাঘাবাড়ী নৌবন্দরের দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএর সহকারী পরিচালক আকমল হুদা মিঠু বলেন, নদীতীরের মালিক বিআইডব্লিউটিএ হলেও জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে আমাদের এখনো তা বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। সিমেন্ট কারখানার বিষয়টি তাই জেলা প্রশাসকই দেখভাল করছেন। আর তার পাশে যে মাটি ভরাট করা হয়েছে, তা অপসারণ করতে নোটিস দেয়া হয়েছে।

শুধু নদী দখলই নয়; কারখানাটি আশপাশের জনজীবনেও বিরূপ প্রভাব তৈরি করেছে। স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিমেন্ট কারখানার কাঁচামাল লোড-আনলোড করা হয় প্রধানত সন্ধ্যার সময়। ওই সময় চারদিক ধুলায় ছেয়ে যায়। ধুলা কমানোর জন্য ওয়াটার স্প্রে করা হয় না। ধুলা আটকে রাখার জন্য কোনো পর্দাও ব্যবহার করা হয় না কারখানাটিতে।

কারখানা লাগোয়া জনবসতির নাম পূর্বপাড়া। এ গ্রামের বাসিন্দা মো. শরিফুল ইসলাম ও মো. সাব্বির হোসেন জানান, এখানে লোড-আনলোড হয় সন্ধ্যার পর। এ সময় ধুলার কারণে চলাচলে খুবই সমস্যা হয়।

আরেক বাসিন্দা মো. আনিস বলেন, ধুলার কারণে বাড়িতে খাবার নষ্ট হয়ে যায়। এ বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষকে লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। সূত্র : বণিক বার্তা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here