‘পুঁজিবাজার নয়, পুঁজি হারানোর বাজার’

1
1829

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা : গণপিটুনি, প্রকাশ্য খুন দেখে আমরা যখন মূল্যবোধের পতন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করছি, তখন আরেকটি বড় পতন আলোচনার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। দু’একটি গণমাধ্যম অবশ্য রিপোর্ট করছে। অনেকদিন ধরে চলছে সূচকের লাগামহীন পতন। এতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন ঋণ নিয়ে বিনিয়োগে আসা লোকজন।

কারণ ঋণের অর্থ আদায়ে অনেকের পোর্টফোলিওতে থাকা শেয়ার ফোর্সড সেলের আওতায় পড়েছে। পত্রিকায় রিপোর্ট হলো—গত ৩০ জুন চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট পাস হওয়ার পর থেকে গতকাল পর্যন্ত মাত্র ১৫ কার্যদিবসে বিনিয়োগকারীদের লোকসান হয়েছে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা।

কেন এমন হচ্ছে? পুরনো এক ব্রোকার বললেন, এটি পুঁজিবাজার নয়, পুঁজি হারানোর বাজার। ২০১০ সালে ধসের পর থেকেবিনিয়োগকারীর কাছে এখনও আস্থাহীন দেশের শেয়ারবাজার। ভালো-মন্দ বেশিরভাগ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে লাভের দেখা পেয়েছেন খুব কম বিনিয়োগকারীই।

তার মতে, ‘বাজারে বিনিয়োগকারী নেই বললেই চলে। সবাই শেয়ার বিক্রি করতে কম্পিউটারের বোতাম টিপছেন। কিন্তু ক্রেতার দেখা নেই। ফলে দাম পড়ছে হু হু করে। বাজার কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা বলা মুশকিল।’

এই বাজারের গভীরতা যারা জানেন, তারা বলাবলি করছিলেন বেশ কয়দিন আগে থেকেই, যখন বাংলাদেশ ব্যাংক হঠাৎ করেই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অবসায়নের সিদ্ধান্ত জানায়। একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমন পরিণতি আস্থাহীন বাজারে আস্থাকে উবিয়ে নিয়ে গেছে। অন্যান্য কারণ তো আছেই। আকস্মিক এই অবসায়নকে অনেকে বলেছে ভুল সময়ে ভুল পদক্ষেপ।

দেশের আর্থিক খাত অনেকদিন ধরে নেতিবাচক আলোচনায়। তার মধ্যে শেয়ারবাজারের এই অবস্থাকে অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থা স্থির জলাশয়ের মতো নয়, সেখানে ঢেউয়ের ওঠাপড়া চলবেই। পুঁজির নিয়মই হলো, মুনাফার লোভে নতুন বিনিয়োগ, নতুন কর্মকাণ্ডের পেছনে ধাওয়া করে বেড়ানো। কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের পুঁজিবাজার দীর্ঘ মন্দায় স্থির হয়ে আছে। কিছু কিছু ব্যবস্থা নিলে ঝাপটা কম লাগতে পারে, মন্দার খপ্পর থেকে বেরোনো যায় তাড়াতাড়ি।

মুশকিল হলো, রোগীকে ঠিকঠাক দাওয়াইটা দেওয়া হচ্ছে না, বরং মাঝে মধ্যে ভুল ওষুধ খেয়ে হিতে বিপরীত হচ্ছে। এর পেছনে সাধারণ মানুষ আর রাজনীতিকদের অর্থনৈতিক বোধের অভাব কিছুটা কাজ করছে। বাকিটা এক শ্রেণির ক্ষমতাধরের খেলা।

আধুনিক অর্থব্যবস্থায় সবার সঙ্গে সবার যোগসূত্র আছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যখন ঝড় আসে, ঋণের লেনদেন গুটিয়ে আসে, ব্যক্তিখাত লোকসান দিতে থাকে, সংক্রামক রোগের মতো অর্থনৈতিক ব্যাধি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বাজার নিয়ন্ত্রণে ও ব্যবস্থাপনায় যারা আছেন, তারা কাজ করছেন রি-অ্যাকটিভ ফ্যাশনে, প্রো-অ্যাকটিভ মুডে নয়। মাঝে মাঝে নানা টোটকা প্রয়োগ করে বাজার চাঙা করার চেষ্টা চলে।

যেমন সম্প্রতি বড় দরপতনের কারণ অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটি কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউস থেকে যেসব শেয়ার ক্রয় করা হচ্ছে, তা যথাযথ নিয়মকানুন মেনে করা হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

শীর্ষস্থানীয় ১০টি ব্রোকারেজ হাউসের শীর্ষ ৫০ জন করে গ্রাহকের ছয় মাসের লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়েছে। গত জানুয়ারি থেকে ওইসব গ্রাহকের লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য তদন্ত কমিটিকে দিতে বলা হয়। এগুলো সবই প্রতিক্রিয়াভিত্তিক পদক্ষেপ, বাস্তবিক নয়।

আস্থার সংকট আসল সংকট। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ওপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা নেই। আস্থার সংকট আছে আর্থিক খাতে। ব্যাংকিং খাতে নগদ অর্থের টান থাকলে পুঁজিবাজার কখনো গতিশীল থাকতে পারে না। কারণ পুঁজিবাজারের লেনদেনের একটি বড় অংশ আসে আর্থিক খাত বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে।

তাছাড়া আর্থিক খাতে টাকার কমতি থাকলে আমানতের সুদের হার বেড়ে যায়, তখন বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজারের পরিবর্তে ব্যাংকে টাকা রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আর ব্যাংকিং সেক্টরে নগদ টাকার সঙ্কট এতটাই বেশি যে, সুদের হার এক অংকে নামানোর ঘোষণা দিয়েও ব্যাংকগুলো তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ব্যাংকিং খাতের আরেকটি বড় সমস্যা একজন একক ব্যক্তির কর্তৃত্বে অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান।

অতিমাত্রায় প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রিও একটি কারণ। ইদানীং বেশিরভাগ কোম্পানিই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আগে আইপিওর মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে যে মূলধন উত্তোলন করে, তার চেয়ে বেশি টাকা তোলে প্লেসমেন্ট শেয়ার ছেড়ে। আর এসব প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডার কোম্পানিটি তালিকাভুক্তির মাস দুয়েকের মধ্যেই তাদের শেয়ার বিক্রি করে দেন। অথচ কোম্পানিটি তালিকাভুক্ত হতে প্রসপেক্টাস অনুমোদনের পর প্রায় ১০ মাস লেগে যায়। এদিকে বাজার থেকে কোম্পানির মূলধন উত্তোলনের পাশাপাশি হঠাৎ করে প্লেসমেন্টের শেয়ারের মাধ্যমেও বড় অংকের টাকা চলে যাওয়ায় বাজার তারল্য সংকটে পড়ে। বাজারে দরপতনের আরেকটি কারণ, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে যাওয়া।

তবে সবচেয়ে বড় কারণের একটি এ বাজারে জবাবদিহিতার বড় অভাব। বাজারের অনেক কোম্পানিই দিনের পর দিন ভালো মুনাফা করলেও বছর শেষে তারা ভালো লভ্যাংশ দেয় না। এতে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারিয়ে ফেলেন। ফলে বিনিয়োগকারীরা ভালো মুনাফা দেখে বিনিয়োগ করেও ঠকছেন।

পুঁজিবাজার যারা দেখভাল করেন, তাদের ঢিলেমি আর প্রস্তুতির অভাব দেখে আশ্চর্য হতে হয়। এত বড় পতন দেখার আগে ব্যাপারটার গুরুত্ব কি তারা বুঝতে পারেননি? হু হু করে পড়ছে শেয়ারের দাম। নির্বাচনের পর থেকে দেশে কোনও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা নেই। প্রত্যাশা ছিল বাজেটের পর শেয়ারবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু শেয়ারবাজার যেখানে চলে যাচ্ছে, তাতে বাজেটে প্রস্তাব কতটা তার মুখ ঘোরাতে পারবে—সেই প্রশ্নই এখন  বাজারে।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

1 COMMENT

  1. পূজিবাজার নয়,পূজিহারানোর বাজার। পূজিবাজার নয়, পুজি দেউলিয়ার বাজার।পুজিবাজার নয়, আত্নহত্যার বাজার।,পূজিবাজার নয়, অনিয়মের বাজার,পুজিব্জার নয়, নয় ছ্যের বাজার,পুজিবাজার নয় , পুজি হাতিয়ে নেওয়ার বাজার,সাধারন বিনিয়োগকারিদের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার বাজার,সাধারন বিনিয়োগকারিদের নিস্ব করার বাজার, উদ্যোক্তাদের খেয়াল খুশির বাজার, দশ টাকার শেয়ারের দাম ১.৪০টাকা,২.৯০টাকা….তবুও দেখভাল করার কেঊ নাই….. খাও দাও ফূর্তি কর….আইনের তোয়াক্কা নেই। ২%,৩০% মানে না। অতএব এই বাজারের ভবিষ্যত কি?ইহাকে দিয়ে কি হবে? শিল্পের বিকাশ হবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here