পুঁজিবাজার উন্নয়নে অর্থমন্ত্রীর কাছে ডিএসইর প্রস্তাবনা

0
752

সিনিয়র রিপোর্টার : দেশের পুঁজিবাজারকে একটি টেকসই, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধির স্তরে উন্নীত করেতে কিছু প্রস্তাবনা দিয়েছেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. আবুল হাশেম। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের কাছে পাঠানো প্রস্তাবনাগুলোর বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে সোমবার এ তথ্য জানা গেছে।

প্রস্তাবনাগুলো হচ্ছে-

স্মল ক্যাপিটাল প্ল্যাটফর্ম : যে কোনো অঞ্চলের উন্নয়নে বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আর্থ-সামাজিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে অন্যতম চালিকাশক্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বা এসএমই। ডিএসই মনে করে স্বল্প মূলধনি কোম্পানির জন্য আলাদা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হলে তা একটি উদ্যোক্তাবান্ধব উদ্যোগ হিসেবে পরিগণিত হবে।

এতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্বল্প মূলধনের কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে এক জায়গায় তথা নিয়ন্ত্রক সংস্থার আওতায় নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হবে।

অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) : বিভিন্ন বাজারের সঙ্গে কৌশলগত সমন্বয় সাধন এবং বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার মধ্য দিয়ে নতুন, উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিকেও পুঁজিবাজারের মাধ্যমে সহায়তা করা সম্ভব বলে মনে করে ডিএসই। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বিদেশের বিভিন্ন বাজার বিশ্লেষণ বা পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, প্রচলিত বাজার ধারণার বাইরেও এটিবি খাতে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে।

সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেড : বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ক্লিয়ারিং অ্যান্ড সেটেলমেন্ট রুলস- ২০১৭ এর আওতায় ডিএসই, সিএসই, সিডিবিএল ও ব্যাংক যৌথভাবে একটি ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট কোম্পানি গঠনের কাজ করছে।

ইতোমধ্যে ‘সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিসিবিএল) নামে কোম্পানিটির নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে। সিসিবিএলের জন্য আলাদা সফটওয়্যার নির্বাচনের কাজ শুরু হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি চালু হলে বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে, যা তারল্য সংকট কাটাতে সহায়তা করবে।

বেমেয়াদি মিউচুয়্যাল ফান্ডের লেনদেন : বর্তমানে বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড রয়েছে। যা রাজস্ব বৃদ্ধিতে অবদান রাখার পাশাপাশি পুঁজিবাজারের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। বেমেয়াদি মিউচুয়্যাল ফান্ডগুলোর লেনদেনের সুযোগ তৈরি হলে তা লেনদেনে বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি বিনিয়োগ ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হবে।

ট্রেকহোল্ডার কোম্পানির শাখা অফিস খোলার অনুমোদন : ট্রেকহোল্ডার কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে শাখা অফিস চালু করতে চায়। দেশের আপামর জনসাধারণকে পুঁজিবাজারে সম্পৃক্ত করতে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় শাখা অফিস চালু করা অত্যন্ত জরুরি। যা গত ২০১১ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে।

আইপিও প্রক্রিয়া সহজ ও ত্বরান্বিতকরণ : নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি পুঁজিবাজারে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে সমন্বয় ঘটায়। শিল্পোদ্যোক্তারা ২০১৮ সালে বাজার থেকে একটি মিউচুয়াল ফান্ডসহ মোট ১৪টি সিকিউরিটিজ প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে ৬০১ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করে। এর মধ্যে দুটি কোম্পানি প্রিমিয়াম বাবদ ২৩৩ কোটি ১২ লাখ টাকা মূলধন উত্তোলন করে।

এ অবস্থায় বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণে সরকারি কোম্পানি ছাড়াও বহুজাতিক ও দেশীয় ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানি তালিকাভুক্তির ব্যাপারে অর্থমন্ত্রীর বলিষ্ঠ ভূমিকা প্রত্যাশা করা হয় চিঠিতে।

এক্সপোজার গণনা সহজ ও পুঁজিবাজার বিকাশে সহায়ক করা : প্রস্তাবনায় বলা হয়, পুঁজিবাজারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের অংশগ্রহণ এবং তারল্য রক্ষার্থে নিম্নলিখিত বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা প্রয়োজন-

১. ব্যাংক কোম্পানি আইন- ১৯৯১ (সংশোধিত ২০১৩) এর বাধ্যবাধকতার বাইরেও নতুন করে ২০১৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সার্কুলারের মাধ্যমে পুঁজিবাজার বিনিয়োগসীমা হিসাবায়নের ক্ষেত্রে সমন্বিতভিত্তি গণনার বিষয়টি আরোপিত হয়েছে। যার কারণে পুঁজিবাজারে তারল্য প্রবাহের ক্ষেত্রটি অধিকতর সংকুচিত হয়েছে। এমতাবস্থায় ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৬ ধারা অনুসারে এককভিত্তিতে এক্সপোজার গণনার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

২. ব্যাংক কোম্পানি আইন- ১৯৯১ (সংশোধিত ২০১৩) এর ২৬ ধারায় প্রযোজ্য সব সিকিউরিটিজের বাজারমূল্য অন্তর্ভুক্ত করার বিধান আছে। এ কারণে যে সব সিকিউরিটিজের বাজারমূল্য নেই তাদের অন্তর্ভুক্ত না করা অর্থাৎ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, যেমন- বন্ড, ডিবেঞ্চার ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডকে এক্সপোজার হিসাবের বাইরে রাখা।

৩. কৌশলগত বিনিয়োগ, যা পুরো মেয়াদকাল পর্যন্ত ধারণকৃত এবং যেসব বিানিয়োগকৃত সিকিউরিটিজের কোনো লেনদেন হয় না, সেসব সিকিউরিটিজকে এক্সপোজার গণনা হতে বাদ দেয়া।

৪. পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের এক্সপোজার লিমিট গণনার ক্ষেত্রে বাজারমূল্যের ভিত্তিতে না ধরে ক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে গণনা

৫. ব্যাংক তার পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট সাবসিডিয়ারিকে প্রদত্ত ঋণের যে অংশ ব্যাংক খাতে বিনিয়োগ করে তা পুঁজিবাজার এক্সপোজার হিসাবে গণনা না করে শুধুমাত্র উক্ত ঋণের যে অংশ পুঁজিবাজারের বিভিন্ন সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা হয় তা-ই উক্ত ব্যাংকের প্রকৃত পুঁজিবাজার এক্সপোজার হিসেবে হিসবায়ন করা।

ডিএসইর কর প্রস্তাবনাসমূহ-

স্টক এক্সচেঞ্জের পূর্ণ কর অব্যাহতি : ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন পরবর্তীত ২০১৪ সালের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ২০১৩-২০১৪ প্রথম বছর কর অব্যাহতির হার ছিল ১০০ শতাংশ। ২০১৪-২০১৫ দ্বিতীয় বছর কর অব্যাহতির হার ছিল ৮০ শতাংশ। ২০১৫-২০১৬ তৃতীয় বছর কর অব্যাহতির হার ছিল ৬০ শতাংশ। ২০১৬-২০১৭ চতুর্থ বছর কর অব্যাহতির হার ছিল ৪০ শতাংশ এবং ২০১৭-২০১৮ পঞ্চম বছর কর অব্যাহতির হার ছিল ২০ শতাংশ।

পরবর্তীতে ডিএসইর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে প্রজ্ঞাপন জারি করে দ্বিতীয় বছরও (২০১৪-২০১৫) কর অব্যাহতির হার ১০০ শতাংশ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে পরবর্তী তথা ২০১৫-২০১৬, ২০১৬-২০১৭ এবং ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরের জন্যও ১০০ শতাংশ কর অব্যাহতি প্রয়োজন। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীকে পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।

পুঁজিবাজারে লেনদেনে কর হ্রাস : স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেকহোল্ডারদের কাছ থেকে ট্রেডের উপর অর্থ আইন- ২০০৫ অনুযায়ী শূন্য দশমিক শূন্য ১৫ শতাংশের পরিবর্তে শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর আদায় করা হয়। যা পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ যেমন- ভারতের চেয়ে ৩ দশমিক ৮৪ গুণ বেশি। ভারতে এক্ষেত্রে কর আদায় করা হয় শূন্য দশমিক শূন্য ১৩ শতাংশ। পকিস্তানে এ কর শূন্য দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। আর হংকংয়ে শূন্য দশমিক শূন্য ২৭ শতাংশ।

এমএমই মার্কেটে লেনদেনের ওপর উৎসে কর অব্যাহতি : ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলো দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে স্বীকৃত। স্বল্প মূলধনের কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজার থেকে মূলধন উত্তোলন করতে পারলে তাদের ঋণের বোঝা হ্রাস পাবে। কর্পোরেট প্রোফাইল বৃদ্ধি পাবে এবং ব্যবসার প্রসার ঘটবে।

কিন্তু বর্তমান আইন অনুযায়ী এসএমই মার্কেটে সিকিউরিটিজ লেনদেনের ক্ষেত্রে মূল মার্কেটের ন্যায় স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃক ডিএসই ট্রেকহোল্ডারদের কাছ থেকে ইনকাম ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স-১৯৮৪ এর আওতায় শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তন করা হয়। এসএমই মার্কেটের উত্তরণ ও সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত করতে স্টক এক্সচেঞ্জের এসএমই প্লাটফর্মে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ লেনদেনের ক্ষেত্রে কর অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়।

করমুক্ত লভ্যাংশের পরিমাণ বাড়ানো : ইনকাম ট্যাক্স অর্ডিন্যান্স- ১৯৮৪ অনুযায়ী বর্তমানে করমুক্ত লভ্যাংশের পরিমাণ ২৫ হাজার টাকা। কোম্পানিসমূহ তাদের কর পরবর্তী মুনাফা থেকে এ লভ্যাংশ প্রদান করে। লভ্যাংশপ্রাপকের ওপর কর আরোপের ক্ষেত্রে দ্বৈত করের উদ্ভব হয়। ফলে করমুক্ত লভ্যাংশের পরিমাণ ২৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ টাকা করা হয়েছে। এরূপ পদক্ষেপে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হওয়াসহ পুঁজিবাজারে তারল্য সংকট নিরসন হবে এবং বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি পাবে।

কর্পোরেট আয়কর হারের পার্থক্য ২০ শতাংশে উন্নীত করা : আয়কর অধ্যাদেশ-১৯৮৪ অনুযায়ী তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে কর্পোরেট আয়কর হারের পার্থক্য ১০ শতাংশের পরিবর্তে ২০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া যে সব কোম্পানি পরিশোধিত মূলধনের কমপক্ষে ২০ শতাংশ আইপিওর মাধ্যমে হস্তান্তর করে, উক্ত কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তরের পরবর্তী তিন বছর আয়করের ওপর ১০ শতাংশ হারে রেয়াতের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ডিমিউচ্যুয়ালাইজড স্টক এক্সচেঞ্জের শেয়ার হস্তান্তরে স্ট্যাম্প ডিউটি প্রত্যাহার : স্ট্যাম্প ডিউটি আইন- ১৮৯৯ অনুযায়ী কোনো কোম্পানি বা অন্য সংবিধিবদ্ধ সংস্থাকে শেয়ার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে প্রতিদান মূল্যের ১ দশমিক ৫০ শতাংশ স্ট্যাম্প ডিউটি প্রদান করতে হয়। তবে এ আইনে কোম্পানিজ আইন- ১৯৯৪ এ সংজ্ঞায়িত স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত পাবলিক লিমিডেট কোম্পানির শেয়ার ও ডিবেঞ্চার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে স্ট্যাম্প ডিউটি অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

যেহেতু ডিএসইর শেয়ারগুলো ডিমেট (অজড়করণ) অবস্থায় রয়েছে, স্ট্যাম্প ডিউটি আইন- ১৮৯৯ এর ৬২ ধারা অনুযায়ী এ ডিমেট শেয়ারে স্ট্যাম্প প্রদানের কোনো সুযোগ নাই। এক্সচেঞ্জ ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন আইন- ২০১৩ এর ১৫ ধারা অনুযায়ী স্টক এক্সচেঞ্জের সব ডিমেট সিকিউরিটিজের ক্ষেত্রে স্ট্যাম্প ডিউটি প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here