পুঁজিবাজারে ওভার এক্সপোজার আতিউর করেনি’

2
4198

মোহাম্মদ তারেকুজ্জামান : পুঁজিবাজারে ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাড়তি বিনিয়োগ (ওভার এক্সপোজার) সমন্বয়ের সময় সীমা বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহ থাকলেও সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান সে ব্যাপারে সাড়া দেননি।

সম্প্রতি দেশের প্রথম সারির একটি দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এমন অভিযোগ করেন অর্থমন্ত্রী আবুল  মাল আবদুল মুহিত।

সাক্ষাৎকার গ্রহীতাদের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, যত দূর জানি, আতিউর আর্থিকভাবে সৎ ব্যক্তি। তবে প্রায়ই অভিযোগ করতেন, তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন না। খামোখা! এত বছরে বাংলাদেশ ব্যাংককে মাত্র তিন-চারটা নির্দেশনা দিয়েছি। একবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, পুঁজিবাজারে ওভার এক্সপোজার আরও কয়েক বছরের জন্য থাকবে। কিন্তু আতিউর ব্যাংক কোম্পানি আইনে সময়সীমা বেঁধে দিলেন এক বছর। আশ্চর্য কাণ্ড!

তিনি বলেন, তিনি (আতিউর) জনসংযোগেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন, ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিচতলায় যে লেনদেন হয়, তার মুনাফার কোনো হিসাব থাকে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের লোকেরা ভাগ করে নিয়ে যান। আতিউর কোনো দিন এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেননি।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ৮শ’ কোটি টাকা লুটের ঘটনায় গত মঙ্গলবার দুপুরে গভর্নরের পদ থেকে সরে দাঁড়ান ড. আতিউর রহমান। এ ঘটনার পরই বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশ কয়েকটি পদে রদবদলের ঘটনা ঘটছে।

২০১০ সালে ব্যাপক দরপতনের পর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি দেশের পুঁজিবাজার। এরপর ধারাবাহিক দরপতনের কারণ খুঁজতে থাকে সরকার। সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৈঠকে জানানো হয়, পুঁজিবাজারে ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাড়তি বিনিয়োগ সমন্বয়কে কেন্দ্র করে দরপতন হচ্ছে। পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ব্যাংকের বাড়তি বিনিয়োগ (Over Exposure) সমন্বয়ের সময়সীমা দুই বছর বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। গত বছরের ১ নভেম্বর এ পরামর্শ দেন তিনি।

এরপর গত ৮ নভেম্বর ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা বাড়তি বিনিয়োগ সমন্বয়ে ২০২০ সাল পর্যন্ত সময় চান। তখন তারা এই প্রস্তাব নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) জমা দেন। ৯ নভেম্বর বিএসইসি প্রস্তাবটি অর্থমন্ত্রণালয়ে পাঠায়। অর্থমন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছিল, ১০ নভেম্বর প্রস্তাবটি বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হবে।

১১ নভেম্বর অর্থমন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত ফিসক্যাল কো-অর্ডিনেশন কমিটির বৈঠকে সময় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সংশ্লিষ্টরা একমত পোষণ করেন। এরপর ১৫ নভেম্বর শেরেবাংলা নগরের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক আইনের কারণে ক্যাপিটাল মার্কেট একটু অ্যাফেক্ট হচ্ছে। এই আইন ক্যাপিটাল মার্কেটে একটা প্যানিক সৃষ্টি করেছে। আমরা আইনটা সংশোধন করে বাড়তি বিনিয়োগ সমন্বয়ের সময় সীমা দুই বছর বাড়িয়ে দেব।

তিনি জানান, সংশোধনীর জন্য আইনটি দ্রুত মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য তোলা হবে। ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর দেশে না থাকায় তখন চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সে সময় জানানো হয় গভর্নর দেশে ফিরলেই এ বিষয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হবে।

ওই সময়ে তৎকালীন গভর্নর আতিউর রহমান দেশে ফিরে বৈঠক না করে বিকল্প পথে বাড়তি বিনিয়োগ সমন্বয়ের কথা বলেন।

গত ৫ ডিসেম্বর সেন্টার ফর নন-রেসিডেন্ট বাংলাদেশি (এনআরবি) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় আতিউর রহমান বলেন, পুঁজিবাজারে ব্যাংকের অতিরিক্ত বিনিয়োগসীমা সমন্বয়ের বিকল্প পথ আছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক মালিকদের প্রয়োজনে আগ্রাসী (অ্যাগ্রেসিভ) হওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি।

তার মতে, ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন (পেইড আপ ক্যাপিটাল) বাড়িয়ে বিনিয়োগ সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে।

ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী আকরাম উদ্দিন আহমেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সাবেক গভর্নর বলেন, এই ডিসেম্বর মাসে যদি ব্যাংকগুলোর পরিশোধিত মূলধন একটু বাড়িয়ে দেন, তাহলে বিনিয়োগসীমা যদি নাও কমে, তারপরও অনুপাত (রেশিও) কমে যাবে। প্রয়োজনে এ ক্ষেত্রে এ বছর আপনারা একটু আগ্রাসী হন।

এর পর ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট এক্সপো ২০১৫ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বাড়তি বিনিয়োগ বা ওভার এক্সপোজার সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকলে তা আগেই এড়ানো যেত। এক্ষেত্রে আমি বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও নমনীয় এবং পুঁজিবাজারবান্ধব হতে পরামর্শ দেব।

ওই অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, পুরো আর্থিক খাতের অভিভাবক। মুদ্রাবাজারের মতো পুঁজিবাজারও আর্থিক খাতের অংশ। তাই মুদ্রাবাজার ও পুঁজিবাজার নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। একটির ভালো-মন্দের প্রভাব অন্যটির উপরে পড়তে বাধ্য।

ব্যাংক কোম্পানি আইনের সর্বশেষ সংশোধনীতে আরোপিত শর্তের কারণে পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে গেছে। আগে প্রতিটি ব্যাংক তার আমানতের ১০ শতাংশ পর্যন্ত পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারতো। ২০১৩ সালের সংশোধনী অনুসারে এখন ব্যাংকগুলো নিজ নিজ রেগুলেটরি মূলধনের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারে। আইনের এই সংশোধনীর ফলে আগের আইনে বিনিয়োগ করা কয়েকটি ব্যাংকের বিনিয়োগের পরিমাণ সীমার বাইরে পড়ে গেছে। এ ব্যাংকগুলোর উপর ২০১৬ সালের জুনের মধ্যে বাড়তি বিনিয়োগ সমন্বয়ের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এটি করতে হলে ব্যাংকগুলোকে বিপুল পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করতে হবে। কিন্তু মন্দা বাজারে সেটি সম্ভব হচ্ছে না। এরা শেয়ার বিক্রি করলে তার চাপে বাজারে শেয়ারের দাম অনেক কমে যেতে পারে এমন আশংকা অন্যান্য অনেক বিনিয়োগকারী হাত গুটিয়ে বসে আছে। এতে বাজার মন্দার বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here