পিপলস লিজিং: সম্পদের পরিমাণ কতো

0
478

বিশেষ প্রতিনিধি : বাংলাদেশ ব্যাংকের অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া এবং পুঁজিবাজারে লেনদেন বন্ধ হওয়া পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের (পিএলএফএসএল) সম্পদের পরিমাণ নিয়ে ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষে পিপলস লিজিংয়ের সম্পদের পরিমাণ তিন হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির আমানত আছে দুই হাজার ৩৬ কোটি টাকা। তাই আমানতকারীদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

তবে চলতি বছরের মার্চ শেষে কোম্পানিটির তৈরি করা আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পিপলস লিজিংয়ের মোট সম্পদ আছে এক হাজার ২৯৮ কোটি টাকা। এর বিপরীতে আমানত রয়েছে এক হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে আমানত থেকে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ কম রয়েছে ৬৯৮ কোটি টাকা।

অর্থাৎ তিন মাসে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এ আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ কমেছে এক হাজার ৯৪১ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে এ বিশাল অঙ্কের সম্পদ কীভাবে উধাও হয়ে গেল সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকও এমন তথ্যে বিস্ময় প্রকাশ করছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, পিপলস লিজিংয়ের প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে অনেক ক্ষেত্রে ঘাপলা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সম্পদের পরিমাণ এক এক জায়গায় এক এক রকম দিয়েছে। সম্পদ কোথাও বেশি দেখিয়েছে, আবার কোথাও কম দেখিয়েছে। বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থা আরও করুণ।

তিন মাসের ব্যবধানে মোটা অঙ্কের সম্পদ কমে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, সংবাদ সম্মেলনে আমরা যে তথ্য দিয়েছি সেটা ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের। এখন যদি তিন মাসে বড় অঙ্কের সম্পদ কমে যায়, সেজন্য প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদকে জবাবদিহি করতে হবে।

তিনি বলেন, সম্পদের যে চিত্রই থাকুক পিপলস লিজিংয়ের বিষয়ে এখন সিদ্ধান্ত দেবে আদালত। নিয়ম অনুযায়ী আদালতের নির্দেশনায় একটি বিশেষ নিরীক্ষা হবে। সেই নিরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত সম্পদের চিত্র উঠে আসবে। পরিচালকরা যদি অল্প সময়ের মধ্যে সম্পদ সরিয়ে থাকে তাহলে আদালত তাদের ছাড় দেবেন না।

পিপলস লিজিং অবসায়ন হচ্ছে- গণমাধ্যমে এমন সংবাদ প্রকাশ হলে প্রতিষ্ঠানটির আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করে। অনেক আমানতকারী টাকা ফেরত পেতে প্রতিষ্ঠানটির মতিঝিল ও গুলশান কার্যালয়ে ভিড় করেন। অপরদিকে পুঁজিবাজারে শেয়ারের ব্যাপক দরপতন হয়। দফায় দফায় দাম কমিয়েও শেয়ারের ক্রেতা খুঁজে পাননি বিনিয়োগকারীরা।

এ পরিস্থিতিতে গত ১০ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, পিপলস লিজিং অবসায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আমানতকারীদের শঙ্কার কিছু নেই। কারণ প্রতিষ্ঠানটির আমানতের তুলনায় সম্পদের পরিমাণ বেশি। তাদের আমানতের পরিমাণ দুই হাজার ৩৬ কোটি টাকা। বিপরীতে সম্পদ আছে তিন হাজার ২৩৯ কোটি টাকা।

এদিকে চলতি বছরের মার্চ শেষে কোম্পানিটির তৈরি করা আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শেয়ারহোল্ডারদের দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৯৩১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। এতে প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে দায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৭ টাকা ৬৬ পয়সা। অর্থাৎ অবসায়ন হলে পিপলস লিজিংয়ের শেয়ারহোল্ডাররা কোনো টাকাই পাবেন না।

আর্থিক অবস্থার এমন দুরবস্থার কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমানতকারীদের শঙ্কিত না হওয়ার জন্য সান্ত্বনা দিলেও পুঁজিবাজারে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দরপতন ও ক্রেতাশূন্য অব্যাহত থাকে। ফলে রোববার (১৪ জুলাই) থেকে কোম্পানিটির শেয়ার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।

এ বিষয়ে ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, শেয়ারের দাম কমে গেলে কোনো একটি চক্র শেয়ারটি কিনে নিতে পারে। আর যদি কোনো গ্রুপ বেশির ভাগ শেয়ার কিনে নেয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক শর্তসাপেক্ষে কোম্পানিটিকে আবার ব্যবসা করার সুযোগ দেয়, তাহলে শেয়াহোল্ডাররা মার খেয়ে যাবে। কাজেই কোনো সিদ্ধান্ত পার্মানেন্ট (স্থায়ী) না আসা পর্যন্ত লেনদেন বন্ধ থাকাই ভালো।

পিপলস লিজিং বন্ধ হয়ে গেলে শেয়ারহোল্ডাররা কী পাবেন? এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, আইন অনুযায়ী সমস্ত সম্পদ বিক্রির পর আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেয়ার পর কিছু থাকলে তা শেয়ারহোল্ডাররা সমানভাবে ভাগ করে নেবেন। তবে দায় থাকলে শেয়ারহোল্ডারদের তা পরিশোধ করতে হবে না। কারণ লিমিটেড কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারের দায় শেয়ার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ।

ডিএসইর এক সদস্য বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বলে দেয়া হলো আমানতের থেকে পিপলস লিজিংয়ের সম্পদ বেশি আছে, তাই আমানতকারীদের শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। ধরেই নিলাম প্রতিষ্ঠানটির আমানতের থেকে সম্পদ বেশি আছে। কিন্তু এ সম্পদ বিক্রি করতে গেলে কি ওই দাম পাওয়া যাবে? কোনো চক্র তো সিন্ডিকেট করে কম দামে সম্পদ কিনে নিতে পারে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কী করবে?

পিপলস লিজিং অবসায়নের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, ২০১৪ সালে তদন্ত করে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য আমরা জানতে পারি। যেখানে পরিচালনা বোর্ডের অনেক সদস্যের অনিয়ম পাওয়া যায়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক চিঠি দিয়ে পরিচালনা বোর্ড ভেঙে নতুন বোর্ড গঠন করে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়।

এত কিছুর পরও প্রতিষ্ঠানটির উন্নতি করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি অবসায়নের জন্য আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেই। গত ২৬ জুন মন্ত্রণালয় অবসায়ন করতে অনুমতি দেয়। পরে অবসায়নের জন্য আদালতে যাওয়ার উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here