পাস হতে পারে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং বিল

0
1653

স্টাফ রিপোর্টার : বহুল আলোচিত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট আজ(৭ জুলাই, মঙ্গলবার) সংসদে পাস হতে পারে। ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্টের কাজ হবে- জনস্বার্থ সংস্থাগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন প্রণয়ন ও নিরীক্ষা পেশার মানোন্নয়ন। বিলটি সংসদে উত্থাপনের জন্য দিনের কার্যসূচিতে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। এই বিল পাসের জন্য প্রস্তাব করবেন- অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

হিসাব ও নিরীক্ষা পেশার মানোন্নয়নে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং বিল এর আগে ২৬ জানুয়ারি সংসদে উত্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে বিলটি পরীক্ষা করে সংসদে রিপোর্ট প্রদানের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। স্টেকহোল্ডারদের মতামত সাপেক্ষে মন্ত্রিপরিষদ প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন অংশে কিছু পরিবর্তন এনে জুনে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং বিল, ২০১৫ চূড়ান্ত করে স্থায়ী কমিটি। -যা আজ সংসদে উত্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী।

‘ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন ২০১৫’ হিসেবে নতুন এ আইনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। এ আইনের অধীন ১২ সদস্যের ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) গঠন হবে। হিসাব এবং নিরীক্ষা সেবা খাতের উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণই হবে এফআরসির দায়িত্ব। আইন অনুযায়ী প্রত্যেক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এফআরসিতে নিবন্ধিত হতে হবে। অন্যথায় তারা সরকারি-বেসরকারি জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাবেন না। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের আবেদনের প্রেক্ষিতে নিরীক্ষা সনদ দেবে এফআরসি। নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এফআরসির সব শর্ত পরিপালন করতে হবে। সেইসঙ্গে নিরীক্ষকদের অপরাধের ক্ষেত্রে জেল-জরিমানার ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে এফআরসিকে।

সরকার কর্তৃক এ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। কাউন্সিলে সদস্য হিসেবে আরো থাকবেন— অর্থ মন্ত্রণালয় মনোনীত তাদের অধীন যেকোনো বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মনোনীত একজন অতিরিক্ত সচিব, বাংলাদেশ মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মনোনীত একজন ডেপুটি সি এন্ড এজি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মনোনীত একজন কমিশনার, ব্যাংকের গভর্ণর কর্তৃক মনোনীত একজন ডেপুটি গভর্ণর, ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সভাপতি, ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএমএবি) সভাপতি, সরকার মনোনীত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক ও ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সভাপতি। এর বাইরে এফআরসি চেয়ারম্যান কর্তৃক মনোনীত একজন নির্বাহী পরিচালক এ কাউন্সিলের সদস্য সচিব হিসেবে থাকবেন।

সংশোধিত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং বিলে পেশাদার অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে আইসিএমএবি ও আইসিএবি সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর আগে মন্ত্রিপরিষদ প্রস্তাবিত খসড়ায় শুধু আইসিএবি সদস্যদের বোঝানো হয়েছিল। একইভাবে পেশাদার অ্যাকাউন্টেন্সি প্রতিষ্ঠান হিসেবেও এ দুই সংগঠনকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। আগে শুধু আইসিএবিকেই এ মর্যাদা দেয়া হয়েছিল। স্থায়ী কমিটির সুপারিশে আইসিএবি সদস্যদের কর্মক্ষেত্র হবে ফিন্যান্সিয়াল অডিট এবং আইসিএমএবি সদস্যদের অধিক্ষেত্র হবে কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অডিট।

ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন ২০১৫-এর ৪৮ ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যক্তি এ আইনের বা তার অধীন প্রণীত বিধি-প্রবিধি, গাইডলাইন, স্ট্যান্ডার্ডস বা নির্দেশনায় উল্লিখিত কোনো শর্ত ভঙ্গ অথবা অসাধু পন্থা কিংবা মিথ্যা তথ্য প্রদানের মাধ্যমে নিরীক্ষক হিসেবে নিবন্ধন লাভ করেন; অথবা এ আইনের কোনো বিধান লঙ্ঘন করেন, তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। অপরাধ প্রমাণীত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনধিক ৫ বছরের জন্য করাদণ্ড বা অন্যূন ৫ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

আইনের ৩৭ নম্বর ধারায় বলা হয়, একজন তালিকাভুক্ত নিরীক্ষক সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তার দায়িত্ব পালন করবেন এবং তিনি কাউন্সিল কর্তৃক প্রণীত নিরীক্ষাচর্চা কোডের পরিপন্থী কোনো কাজ করবেন না; অথবা তালিকাভুক্ত নিরীক্ষক হিসেবে স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করে এমন কোনো কাজে জড়িত হবেন না।

আইনের ৫০ নম্বর ধারা অনুযায়ী, এফআরসি কর্তৃক তালিকাভুক্ত নিরীক্ষকের উপর ধার্য জরিমানা পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্ট ১৯১৩-এর অধীন সরকারি দাবি বলে গণ্য হবে। আইনের ৫১ নম্বর ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ৫০ নম্বর ধারার বাইরে এ আইনের অন্য কোনো বিধানের অপরাধের তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর ১৮৯৮ অ্যাক্ট প্রযোজ্য হবে।

এছাড়া নিরীক্ষা সেবা অর্থ কোম্পানি আইনের ১৯৯৪ সালের ১৮ নম্বর আইনের ২১০ থেকে ২২০ ধারা অনুসারে প্রদত্ত সেবা ও অন্যান্য আইনের অধীন পরিচালিত অনুরূপ সেবা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গত জানুয়ারিতে সংসদে উত্থাপিত বিলের প্রস্তাবে নিরীক্ষা সেবার সংজ্ঞায় কর ও ব্যবস্থাপনা পরামর্শের মতো বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

নতুন এ প্রস্তাবিত আইনে এফআরসির চেয়ারম্যান পদের যোগ্যতা ও নিয়োগের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সংশোধিত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সরকার কোনো স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাবরক্ষণ, ব্যবসায় প্রশাসন, অর্থনীতি, আইন, ফিন্যান্স অথবা ব্যাংকিং বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিসহ অন্যূন ১৫ বছরের নির্বাহী কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে চার বছরের মেয়াদের জন্য নিয়োগ দেবে। বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বাছাই কমিটির মাধ্যমে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হবে। আর নির্বাহী পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে ওই বাছাই কমিটিতে চেয়ারম্যানকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। আইনে নির্বাহী পরিচালক পদের এবং আপিল কর্তৃপক্ষের যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেয়া আছে।

এফআরসির ১২ সদস্যের কাউন্সিল মূলত হিসাবরক্ষণ এবং নিরীক্ষা পেশার নীতি ও নৈতিকতা সম্পর্কিত মান ইত্যাদি নির্ধারণ করবে। এছাড়া হিসাব নিরীক্ষা সেবার গুণগত মানোন্নয়ন, কাউন্সিলের তালিকাভুক্ত নিরীক্ষকদের হিসাবরক্ষণ ও নিরীক্ষা কাজের সর্বোচ্চ মান নিশ্চিতকরণ, আর্থিক প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি, হিসাবরক্ষণ ও নিরীক্ষার পেশাগত কার্যক্রমের সততা, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি, ও জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আর্থিক ও অন্যান্য তথ্যের উচ্চমানসম্পন্ন প্রতিবেদন প্রস্তুতে উদ্বুদ্ধ করবে।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন হিসাব ও নিরীক্ষা মান অনুসরণ করে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্ট্যান্ডার্ড প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে এফআরসি। একইসঙ্গে এফআরসি হিসাব ও নিরীক্ষা সেবার ক্ষেত্রে বিভিন্ন চার্জ ও ফি নির্ধারণ করবে।

চারটি কর্ম বিভাগ থাকবে এফআরসিতে। তা হলো- মানদণ্ড নির্ধারণী বিভাগ, আর্থিক প্রতিবেদন পরিবীক্ষণ বিভাগ, নিরীক্ষাচর্চা পুনর্নিরীক্ষণ বিভাগ ও প্রয়োগকারী বিভাগ। বিভিন্ন স্ট্যান্ডার্ড প্রণয়ন, তালিকাভুক্ত নিরীক্ষকদের কার্যক্রম তদারকি ও স্ট্যান্ডার্ডের প্রয়োগ নিশ্চিতে কাজ করবে এ ৪ বিভাগ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here