পাইপলাইনে রাষ্ট্রায়ত্ত ২৪ কোম্পানি, গুঞ্জন

1
5959

শাহীনুর ইসলাম : রাষ্ট্রায়ত্ব কোম্পানিগুলোকে কিভাবে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত করা যায়, তা নিয়েই চলছে দফায়-দফায় আলোচনা। অবশেষে স্থির হয়েছে, আরো ২৬ কোম্পানির শেয়ার দ্রুত পুঁজিবাজারে তারিকাভুক্ত করা হবে। গত বছরের ডিসেম্বরে তালিকাভুক্তি নিয়ে বাজার গরম হলেও তা শান্ত হয়। আবার কোম্পানিগুলোর ফাইল নড়তে শুরু করেছে।

তবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্যের পরই পুঁজিবাজারে গুঞ্জন ছড়ায়। গত বুধবার এবং বৃহস্পতিবার পুঁজিবাজারে অনেকের মুখে ছড়িয়ে যায় ‘রিউমার’। বাজারে ছড়িয়ে পড়ে ‘রাষ্ট্রায়ত্ত আরো ২৪ কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে’।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, আইটি কোম্পানিগুলো ফরেন মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত করা হবে। বিদেশী কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হলে বিদেশী বিনিয়োগকারী ও বাংলাদেশ উভয় লাভবান হবে। একই সঙ্গে দেশের পুঁজিবাজার আরও চাঙ্গা হবে।

সজীব ওয়াজেদ জয়ের ঘোষণা পরই পুঁজিবাজারের পালে হাওয়া লাগে। বাড়তে থাকে লেনদেন ও শেয়ারপ্রতি দর। তার ঘোষণার পরই বাজারে ছড়িয়ে পড়ে রিউমার ‘রাষ্ট্রায়ত্ত আরো ২৪ কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে’। যদিও এসব রিউমারের কোন ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। যদিও সরকার গত ডিসেম্বরে এসব কোম্পানি তালিকাভুক্তির জন্য বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিল। অজ্ঞাত কারণে পরবর্তীতে তা থেমে যায়।

গুঞ্জন রয়েছে- পর্যায়ক্রমে কোম্পানিগুলোকে আনার চেষ্টা করছে সরকার। ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অর্থমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে সরকারের ৩৪টি কোম্পানির শেয়ার পুঁজিবাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। ইতোমধ্যে পর্যায়ক্রমে ৮টি কোম্পানির শেয়ার পুঁজিবাজারে এসেছে।

সরকারি আরো ২৬ কোম্পানির শেয়ার বাজারে আসার এখনো বাকি। এসব কোম্পানির বিষয়ে একাধিক উদ্যোগ নেয়া সত্ত্বেও তা কেন বাজারে শেয়ার ছাড়া হচ্ছে না, এনিয়ে  প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এরপরে ডিসেম্বর মাসেও আলোচনা হয়েছে। বাজারের ধারাবহিক একটু উন্নতি হওয়ায় সেগুলোর ফাইল নড়ছে। চলতি মাসের শেষে বা আগামী মাসে সুসংবাদ আসছে।

রিউমার বা গুঞ্জনের সত্যতা অনুসন্ধানে মাঠে নামেন স্টক বাংলাদেশ -এর সংবাদকর্মীরা। প্রাপ্ত তথ্যে-

তালিকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক কোম্পানি টেলিটক বেশ এগিয়ে রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী টেলিটকের পরিচালনা পর্ষদ কোম্পানিটিকে পুঁজিবাজারে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আইপিওর মাধ্যমে কোম্পানিটি ৬০০ কোটি টাকা উত্তোলন করবে। যা দিয়ে রেডিও এক্সেস নেটওয়ার্ক, কোর নেটওয়ার্ক, ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হবে।

গত বছরের এই তথ্য হলেও নতুন করে কোম্পানির কর্তৃপক্ষ ভাবতে শুরু করেছে। কেননা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সুস্থ পরিবেশ এসেছে। তবে সরকারি এসব কোম্পানির শেয়ার পুঁজিবাজার ছাড়ার আগে বাজার চাঙ্গা করার জন্য সরকারিভাবে নেয়া হবে আরও বেশ কিছু পদক্ষেপ।

অর্থমন্ত্রণালয় ও বিএসইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে সরকারের ৩৪টি কোম্পানির শেয়ার বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল ২০১০ সালে। সে বছর ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্ত সেই নির্দেশ অনুযায়ী কোনো কোম্পানিই বাজারে তাদের শেয়ার ছাড়তে পারেনি। পরে কয়েকটি কোম্পানির ক্ষেত্রে শেয়ার ছাড়ার সময় ২০১১ সালের ১৪ ও ৩০ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

বেঁধে দেয়া নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে- যমুনা ওয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন ও রূপালী ব্যাংক তাদের বর্ধিত শেয়ার বাজারে ছাড়ে। বাকি  থাকে ২৬টি আরও কোম্পানি। কোম্পানিগুলো এখন পর্যন্ত কোনো শেয়ারই বাজারে নতুন করে ছাড়তে পারেননি।

২০১০ সালের ডিসেম্বরে সে সব সরকারি কোম্পানির শেয়ার পুঁজিবাজার ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল বিদ্যুৎ বিভাগের রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড, ডেসকো ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের আওতায় লিক্যুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস লিমিটেড, গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, জালালাবাদ গ্যাস টিঅ্যান্ডডি সিস্টেম, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি।

তালিকার মধ্যে ছিল- সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, যুমনা ওয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম ও ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস কোম্পানি।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতায় প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ, ন্যাশনাল টিউবস, চিটাগাং ড্রাইডক, জিইএম কোম্পানি লিমিটেড ও বাংলাদেশ ব্লেড ফ্যাক্টরি লিমিটেড, কর্ণফুলী পেপার মিলস, বাংলাদেশ ইন্স্যুলেটর অ্যান্ড সেনিটারি ওয়্যার ফ্যাক্টরি লিমিটেড ও ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি।

এছাড়া তালিকায় রয়েছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের আওতায় বঙ্গবন্ধু সেতু।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের হোটেল ইন্টারন্যাশনাল সোনারগাঁও হোটেল, বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের রূপসী বাংলা, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লিমিটেড। ডাক, তার ও টেলিযোযোগ মন্ত্রণালয়ের টেলিটক বাংলাদেশ, বিটিসিএল, বাংলাদেশ ক্যাবল শিল্প, টেলিফোন শিল্প সংস্থা ও বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় অ্যাসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি।

বিএসইসি সূত্র জানায়, রুরাল পাওয়ার কোম্পানি ও তিতাস গ্যাস কোম্পানিকে শেয়ার ছাড়ার সময়সীমা বাড়িয়ে গত ২০১২ সালের ১৪ আগস্ট নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এই সময়সীমার মধ্যে কোম্পানি দুটি পুঁজিবাজারে তাদের শেয়ার ছাড়তে পারেনি।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ব কোম্পানি প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ, ন্যাশনাল টিউবস, হোটেল ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেড, বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল, অ্যাসেনসিয়াল ড্রাগসকে গত বছরের ৩০ আগস্টের মধ্যে বাজারে শেয়ার ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তবে এর মধ্যে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) ও রূপালী ব্যাংক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুঁজিবাজারে শেয়ার ছাড়ে। বাকি ৬টি কোম্পানি এখন পর্যন্ত তাদের কোনো শেয়ারই ছাড়তে পারেনি।

কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, সেসময়ে দেশের রাজনীতিক পরিস্থিতি অনুকূলে আনতে না পারায় ‘অঘোষিতভাবে’ কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। পরবর্তিতে সরকার চলতি বছরের শুরুতে জাতীয় নির্বাচন ও সরকার গঠন করে। এরপর দেশের রাজনীতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ায় এসব কোম্পানির শেয়ার নতুন করে বাজারে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যেকোনো সময় আসতে পারে সন্তোসজনক ঘোষণা।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here