শিথিল হচ্ছে কোম্পানির পরিচালকদের শেয়ার ধারণের শর্ত

0
1707

সিনিয়র রিপোর্টার : তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের ন্যূনতম শেয়ার ধারণের শর্ত শিথিল হচ্ছে। বর্তমান বিধি অনুযায়ী, উদ্যোক্তা পরিচালকদের এককভাবে কোম্পানির ন্যূনতম ২ শতাংশ এবং সম্মিলিতভাবে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হয়।

জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে মূলত বড় মূলধনি কোম্পানির জন্য বিধিটি শিথিল করতে যাচ্ছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

সূত্র জানায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আকারের ভিত্তিতে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ন্যূনতম শেয়ার ধারণের শর্ত আরোপের কথা বলা হয়েছে। সুপারিশ অনুসারে, ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানিগুলোর উদ্যোক্তা পরিচালকদের ন্যূনতম শেয়ার ধারণে আগের নির্দেশনা বহাল থাকবে।

অর্থাৎ এসব কোম্পানির প্রত্যেক পরিচালককে সর্বনিম্ন ২ শতাংশ এবং উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে।  আর ২০০ কোটি থেকে ৪৯৯ কোটি টাকা পর্যন্ত পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানির পরিচালকদের জন্য এককভাবে ন্যূনতম ১ দশমিক ৫ শতাংশ ও সম্মিলিতভাবে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ২০ শতাংশ শেয়ার ধারণের বাধ্যবাধকতা প্রস্তাব করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ অনুযায়ী, ৫০০ কোটি থেকে ৯৯৯ কোটি টাকা পর্যন্ত পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানির পরিচালকদের এককভাবে ন্যূনতম ১ শতাংশ ও উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে অন্তত ১৫ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে। আর হাজার কোটি অথবা এর বেশি পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানির পরিচালকদের ন্যূনতম দশমিক ৫ শতাংশ ও উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ন্যূনতম ১০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হবে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বিএসইসি এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করছে। এরই মধ্যে খসড়া চূড়ান্ত হয়েছে। সেখানেও স্বতন্ত্র (ইনডিপেনডেন্ট) ও পদাধিকারবলে নিযুক্ত (এক্স অফিসিও) পরিচালকদের ক্ষেত্রে এ বাধ্যবাধকতা থাকছে না।

তবে মনোনীত পরিচালকদের ক্ষেত্রে তিনি যে প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করছেন, এর হাতের কোম্পানির ন্যূনতম শেয়ার থাকতে হবে। কোনো মালিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যদি দুজন পরিচালক মনোনয়ন দেয়া হয়, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের হাতে কোম্পানির আবশ্যক শেয়ারের দ্বিগুণ শেয়ার ধারণ করতে হবে।

কমিশন সূত্র আরো জানায়, শেয়ার ধারণের শর্তে পরিবর্তন আনতে এরই মধ্যে অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামত চেয়েছে বিএসইসি। অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের মতামত পেলেই তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ন্যূনতম শেয়ার ধারণের শর্তে পরিবর্তন এনে নতুন নির্দেশনা জারি করবে বিএসইসি।

প্রসঙ্গত, ২০০৯ ও ২০১০ সালে চাঙ্গা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির অনেক উদ্যোক্তা-পরিচালক হাজার হাজার কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করে দেন। ধস-পরবর্তী সময়ে দরপতন দীর্ঘায়িত হয়। এ সময়ও স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে প্রায় প্রতিদিনই উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার বিক্রির ঘোষণা আসতে থাকে। এ অবস্থায় বিক্রয়চাপ কমাতে কমিশন তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার বিক্রি রোধে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বিএসইসি।

সে সময় অর্থ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির বৈঠকেও পরিচালকদের শেয়ার বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপের সুপারিশ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১১ সালের ২২ নভেম্বর উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ন্যূনতম শেয়ার ধারণের শর্ত বেঁধে দিয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনে নির্দেশনা জারি করে বিএসইসি। পরিচালকদের ন্যূনতম শেয়ার ধারণের জন্য ছয় মাস সময় বেঁধে দেয়া হয়।

২০১১ সালে নির্দেশনাটি জারির পর থেকেই বিভিন্ন কোম্পানি, বিশেষ করে ব্যাংকের পরিচালকরা ন্যূনতম শেয়ার ধারণের শর্ত থেকে ব্যাংকগুলোকে অব্যাহতি দেয়ার দাবি জানান। পরিশোধিত মূলধন তুলনামূলক বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলোকে অব্যাহতি দেয়ার দাবি ছিল তাদের। এমনকি সে সময় কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালকরা বিএসইসির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মামলাও করেন। এর মধ্যে কয়েকটি মামলায় হেরে গিয়ে পর্ষদের সদস্যপদ ছাড়তে হয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক পরিচালকদের।

বাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ন্যূনতম শেয়ার ধারণ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সম্প্রতি যে সুপারিশ করা হয়েছে, তাতে ব্যাংক পরিচালকরা বেশি লাভবান হবেন। বর্তমানে তালিকাভুক্ত অধিকাংশ বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৮০০ কোটি টাকার বেশি। এটি কার্যকর হলে দশমিক ৫ থেকে ১ শতাংশ শেয়ার থাকলেই কোনো ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালক পদের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন।

এ প্রসঙ্গে বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ন্যূনতম শেয়ার ধারণে আন্তর্জাতিক কোনো মানদণ্ড নেই। যদিও আমাদের দেশে এটি করা হয়েছিল। এখন যদি শেয়ার ধারণের শর্তে পরিবর্তন আনা হয়, তাহলে যারা আগে এ শর্তের কারণে পরিচালক পদ হারিয়েছিলেন তারা বিএসইসির বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন।

তিনি বলেন, এতে বিএসইসি নতুন করে জটিলতায় পড়তে পারে। আমি মনে করি, উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার ধারণে ন্যূনতম সীমা বেঁধে দেয়ার চেয়ে কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও স্বচ্ছতা আনতে বিএসইসির বেশি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। কারণ বিশ্বে এমন অনেক খ্যাতনামা কোম্পানি রয়েছে, যেগুলোয় উদ্যোক্তা পরিচালকদের নামমাত্র শেয়ার রয়েছে। তবে স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে সেসব কোম্পানি ভালো মুনাফা করছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here