নির্বাচনী বছরে ‘সংযত’ মুদ্রানীতি ঘোষণা

0
340

সিনিয়র রিপোর্টার : বছরের প্রথমার্ধে লক্ষ্যের চেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ হওয়ায় ‘সংযত’ মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্বাচনী বছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। আগের মুদ্রানীতিতেও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি একই ছিল।

মঙ্গলবার মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মেলন কক্ষে চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির।

এ সময় ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজি হাসান, এস এম মনিরুজ্জামান, আহমেদ জামাল, বাংলাদেশ ব্যাংকের চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট পরামর্শক আল্লামা মালিক কাজমী, ব্যাংকিং রিফর্ম অ্যাডভাইজার এস কে সুর চৌধুরী, প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. ফয়সল আহমেদ, অর্থনৈতিক উপদেষ্টা মো. আখতারুজ্জামানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মুদ্রানীতি ঘোষণা করে গভর্নর বলেন, আগের ধারাবাহিকতায় প্রবৃদ্ধিবান্ধব এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি পরিমিত রাখার লক্ষ্যে সংযত ধরনের মুদ্রানীতি ঘোষণা হয়েছে। এ সময় তিনি সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে সোনায় গরমিল ও কয়েক বছর আগের রিজার্ভ চুরির অর্থ উদ্ধারের সর্বশেষ অগ্রগতি তুলে ধরেন।

গভর্নর বলেন, জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের নতুন এই মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি জানুয়ারি-জুলাই মেয়াদের মুদ্রানীতির মতোই ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ ধরা হয়েছে। আর সামগ্রিকভাবে অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ, যা জানুয়ারি-জুলাই মেয়াদের মুদ্রানীতির প্রক্ষেপণের ১৫ দশমিক ৮ শতাংশের চেয়ে বেশি।

তিনি বলেন, নতুন মুদ্রনীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ, সরকারি খাতে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এক প্রশ্নের উত্তরে ফজলে কবির বলেন, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি যদিও গতবারের মুদ্রানীতির মতো ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ ধরা হয়েছে, কিন্তু সরকারি খাতে ব্যাংকঋণের চাহিদা কম থাকায় বেসরকারি খাতে ঋণের উচ্চতর প্রবৃদ্ধি হওয়ার সুযোগ থাকবে।

মুদ্রানীতিতে বিধিবদ্ধ জমার (কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নগদ জমা রাখার হার) অনুপাত বা সিআরআর এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে তহবিল আহরণের রেপো সুদের হারও অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বর্তমানে সিআরআর আছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। রেপো সুদের হার ৬ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর অর্থ সংকট কাটাতে গত এপ্রিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত সিআরআর ও রেপোর হার কমিয়ে আনে।

গভর্নর বলেন, আগের মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, তা অর্জিত হয়নি। এ বছরের জুনে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এ জন্যই মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সংযত মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে কিনা- এ প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান বলেন, সরকার বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির যে লক্ষ্য ধরেছে, তা বাস্তবায়নে সহায়তা করতেই নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে।

গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ। দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুলাই) মুদ্রানীতিতে তা বাড়িয়ে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ ধরা হয়।

অর্থবছর শেষে দেখা যায়, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ। গত অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। আর গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশে আটকে রাখার আশা করা করা হয়েছিল।

অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএস। আর পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি) জুন মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

সরকার চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ; আর গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশে আটকে রাখার আশা করছে।

পুঁজিবাজার নিয়ে গভর্নর ফজলে কবির বলেন, এখন ব্যাংকে পর্যাপ্ত তারল্য রয়েছে। পাশাপাশি আন্তঃব্যাংক সুদের হার এখন অনেক কম রয়েছে। তাই বর্তমানে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ বলা যায়।

তিনি বলেন, বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্য রাখার জন্য ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আন্তঃপ্রবাহ জোরদার করার পাশাপাশি সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ আকর্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ হবে। মূলধন বাজারে ইক্যুইটি এবং বন্ড ইস্যু কার্যক্রম বিকাশের গুরুত্বের দিকে আমরা এর আগের মুদ্রানীতিতে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় উঠে আসা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে সোনায় গরমিল নিয়ে কথা বলেন গভর্নর।

পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির অর্থ উদ্ধার প্রসঙ্গ তুলে ধরে গভর্নর ফজলে কবির বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি হওয়া পুরো টাকাই ফেরত আসবে। তিনি বলেন, আমরা ১৫ মিলিয়ন ডলার ফেরত পেয়েছি। বাকি প্রায় ৫১ মিলিয়ন ডলার ফেরত আনার বিষয়টি বিচারাধীন আছে। ফিলিপিন্সের আদালতে এর সুরাহা হলেই আমরা টাকাটা ফেরত পাব।

এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর বিএফআইইউ প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, ফিলিপাইনের উচ্চ আদালতে একটা রায় আপিল অবস্থায় আছে। ওই আপিলের সুরাহা হলেই প্রায় ৫১ মিলিয়ন ডলার ফেরত আসবে। আর যে টাকাটা এখনো শনাক্ত হয়নি, তাও শনাক্তের বিষয়ে আমাদের কার্যক্রম চলমান আছে।

আমরা আশাবাদী, সম্পূর্ণ অর্থই আমরা ফেরত পাব। সম্পূর্ণ অর্থই যে ফেরত আসবে সে ব্যাপারে আমাদের চিন্তা-ভাবনার কোনো ঘাটতি নেই। অর্থ পাচার প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে রাজী হাসান বলেন, আমরা চার হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য পেয়েছি। তাদের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছি। এ বিষয়টি নিয়ে আরো খোঁজখবর নেয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের ঘোষিত আর্থিক নীতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে প্রতি অর্থবছরে দুটি মুদ্রানীতি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বরাবরের মতো এবারো নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণার আগে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here