নানামুখী চ্যালেঞ্জ নিয়ে ব্যাংকিং খাতের নতুন বছর শুরু

0
467

রাহেল আহমেদ শানু : ২০১৮ সালের বিদায়, নতুন বছর ২০১৯ শুরু। বিদায়ী বছরে দেশের আর্থিক খাতে বিশৃঙ্খলা বিরাজমান ছিল। বিনিয়োগ মন্দায় আক্রান্ত আর্থিক খাতের অন্যতম ব্যাংকিং খাতে ২০১৮ সালে রক্তক্ষরণ চলছিল। তা যেন থামছেই না।

খেলাপি ঋণের চাপে জর্জরিত হয়েছে ব্যাংকিং খাত। খেলাপি ঋণের পাশাপাশি জাল-জালিয়াতি, পারিবারিক আধিপত্য বৃদ্ধি এবং একটি একক গ্রুপের কাছে জিম্মি হয়ে যায় ব্যাংকিং খাত। সামগ্রিকভাবে যা এ খাতে সুশাসন ব্যাহত করছে।

ফলে নতুন বছরে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন বছরে এই মন্দা কাটবে কিনা সে ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা নেই। তারপরও আশার আলো দেখছেন ব্যাংকাররা। নতুন বছরে বিনিয়োগের দুয়ার খুলবে। কমবে ব্যাংকিং খাতে অলস তারল্যের বোঝা।

শুরু হওয়া নতুন বছরে সরকারকে অর্থনীতির নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এই চ্যালেঞ্জের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ব্যাংকিং খাতে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ আদায়। এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক বৈষম্যও কমিয়ে আনতে হবে। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই ঋণ এখন পাহাড় ছুঁয়েছে।

বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে দেশের ব্যাংকিং খাতে অবলোপনসহ খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ৫শ শতাংশ। আর অবলোপন বাদে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ৩শ শতাংশ। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় আসে। তখন ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। আর ঋণ অবলোপন ছিল প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা।

সবমিলে সামগ্রিক খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় সাড়ে ২৪ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে অবলোপনসহ খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে অবলোপন বাদে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও অনাদায়ি ঋণ আদায় করা ২০১৯ সালে ব্যাংকিং খাতের বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, নতুন বছর ও নতুন সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা হবে, গত ১০ বছরে ব্যাংকিং খাতে যে খারাপ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তা ঠিক করা। বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ অনেক বেড়ে গেছে। এটি কমানোর উদ্যোগ নেয়া।

বাংলাদেশ ব্যাংকের শাসন ব্যবস্থা নড়বড়ে হয়ে গেছে উল্লেখ করে সাবেক এ ডেপুটি গভর্নর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এখন স্বায়ত্তশাসনের স্বাধীনতা দরকার। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, এ ক্ষেত্রে সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করবে না, বিশেষ করে অর্থ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সংযত আচরণ করবে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যাংকগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা হবে। ২০১৮ সালে ব্যাংকিং খাতে যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা যায়নি সেই চ্যালেঞ্জগুলোই এ বছর বড় আকারে দেখা দেবে।

নতুন বছর ব্যাংকিং খাতে পুরনো বছরের চ্যালেঞ্জগুলোই মোকাবেলা করতে হবে বলে জানান বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, গত বছর ব্যাংকিং খাতে যেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব হয়নি, নতুন বছর তার মোকাবেলা করা হবে কিনা সেটি এখন দেখার বিষয়। বিশেষ করে সেন্ট্রাল ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের স্বাধীনতা।

এ অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, যারা ঋণখেলাপি আছে তাদের বারবার সুবিধা না দিয়ে আইনি ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর হতে হবে।

এ ছাড়া, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বোর্ড পুনর্গঠন করে সেখানে পেশাগত লোক নিয়োগ দিতে হবে। পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। পারিবারিক আধিপত্য না খাটিয়ে আগের নিয়মে ব্যাংকিং ব্যবস্থা নিয়ে আসা। সর্বোপরি, ব্যাংকিং খাতের সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিলে তা দ্রুত নিরসন সম্ভব।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ৮ লাখ ৬৮ হাজার ৭ কোটি টাকার ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আর এ সময়ে অবলোপন হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এ হিসেবে প্রকৃত খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের অর্ধেকটা সরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের।

বিশাল পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণে ১২টি ব্যাংকে প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে। সরকার এই খেলাপি ঋণ নতুন বছরে কতখানি আদায় করতে পারবে তার ওপর অর্থনীতি তথা ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, এই খাতে সাফল্য পাওয়া বেশ কষ্টকর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here