রাহেল আহমেদ শানু : সম্ভাবনার সমূহ চিহ্ন পড়ছে পুঁজিবাজারে। আস্থা ফেরানোর জাতীয় কণ্ঠে ইতোমধ্যে বাজারে ফিরছেন লাখো তরুণ। যে কারণে বিনিয়োগ বেড়েছে, বিগত চার বছরের তুলনায় সর্বোচ্চ পরিমাণ। ব্যাংকে লগ্নীকৃত অর্থও ফিরছে পুঁজিবাজারে। অন্যদিকে কমছে সঞ্চয়পত্রের সুদ ও কেনার পরিমাণ। একই সঙ্গে সরকারের ব্যাংক ঋণ কমতে থাকায় স্মরণকালের সম্ভাবনা ফিরে আসছে।

বিভিন্ন সম্ভাবনার চিত্র তুলে ধরে অনেকে মন্তব্য করেন, পুঁজিবাজার আবারো তার চিত্র ফেরত পাবে। লেনদেন তিন হাজার কোটি টাকাও ছাড়াবে। স্মরণকালের সেই সম্ভাবনা আগামী মার্চ মাসের শেষে বা এপ্রিল মাস থেকে শুরু হবে। সরকারের বিভিন্ন আর্থিক চিত্র তুলে ধরে অনেক গবেষক এবং দেশের শীর্ষ কয়েকটি মার্চেন্ট ব্যাংক কর্মকর্তা স্টক বাংলাদেশকে এমন তথ্য জানিয়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি ২ হাজার ১শ কোটি ৮০ লাখ টাকার লেনদেন হয়। ৫ বছর পরে শেয়ার লেনদেনের এমন চমককে মাইলফলক ধরা হলেও এপ্রিল মাসের লেনদেন হবে স্মরণকালের সেরা। (ডিএসইর লেনদেনের চিত্র ওপরে প্রকাশ করা হলো)

অনেক সম্ভাবনার ভেতর দিয়ে বেড়েছে নতুন বিনিয়োগকারীর সংখ্যা। ১৪ মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে নতুন বিনিয়োগকারী বা প্রায় ২ লাখ তরুণ পুঁজিবাজারে এসেছে। নতুন বিনিয়োগকারী বেড়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ২৪৭ জন। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) সূত্র উল্লেখ করে ‘সম্ভাবনার চিহ্ন’ বলে তারা অভিহিত করেন।

সিডিবিএলের তথ্যানুসারে, ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পুঁজিবাজারে বিও হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫১। এরমধ্যে পুরুষ বিনিয়োগকারী ২১ লাখ ৪৭ হাজার ২৩, নারী বিনিয়োগকারী ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৫১১ ও কোম্পানির বিও হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ২১৭।

এদিকে ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর মোট বিও হিসাবের সংখ্যা ছিল ২৯ লাখ ৪১ হাজার ৮৬৮। সে হিসাবে দেড় মাসের ব্যবধানে পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বেড়েছে ১২ হাজার ৮৮৩ জন।

অন্যদিকে, ২০১৬ সালের চিত্র অন্ধকার। আশাহত হয়ে অনেক বিনিয়োগকারী ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৪ লাখ ১৫ হাজার ৮২২ জন তাদের বিও হিসাব বন্ধ করেন। তারা নবায়ন ফি না দেয়ায় গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসব বিও হিসাব বন্ধ হয়ে যায়।

সিডিবিএল জানায়, বর্তমানে চালু থাকা বিও হিসাবগুলোর মধ্যে একক বিওর সংখ্যা ১৮ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৯ ও যৌথ হিসাব ১০ লাখ ৯৭ হাজার ৮৯৫টি। এছাড়া মোট বিওর মধ্যে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের নামে রয়েছে ২৭ লাখ ৯৩ হাজার ৭৯টি ও অনিবাসী বাংলাদেশীদের নামে রয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৪৫৫টি।

অন্যদিকে, ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার পরিবর্তে প্রতি মাসেই আগের নেয়া ঋণ শোধ করছে সরকার। ফলে সরকারের নিট ব্যাংকঋণ ঋণাত্মক ধারায় রয়েছে। চলতি অর্থবছরের (জুলাই-জানুয়ারি) সাত মাসে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক (-) ২০ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা।

তবে গত ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এর পরিমাণ কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৮২৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারের ব্যাংকঋণের মোট স্থিতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা।

কমেছে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি, যা পুঁজিবাজারে জন্য শুভ। সঞ্চয়ের টাকায় যারা এতদিন সঞ্চয়পত্র কিনতেন, তারা এখন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করছেন। জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিসেম্বর মাসে ৩ হাজার ১৫৪ কোটি টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। তার আগের মাস নভেম্বরে নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৪০২ কোটি টাকা।

অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি কমেছে ১ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা বা ২৯ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সঞ্চয়পত্র খাত থেকে অস্বাভাবিক ঋণ পাওয়া, রাজস্ব আদায়ে ভালো গতি এবং সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ে ধীরগতি বিরাজ করায় খরচও কম হচ্ছে। অর্থনীতিক উন্নয়নে সরকার বিগত অনকে সময়ের তুলনায় বেশ ভালো সময় পার করছে। তবে পুঁজিবাজার দীর্ঘ সময় পরে গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধ পর্যন্ত বেশ চমক দেখায়। এরপরে কিছুটা কমে আশাহত করে আবারো পূর্বের অবস্থানে ফিরতে শুরু করেছে।

পুঁজিবাজারে উন্নতির কারণে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমেছে বলেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখত। তিনি স্টক বাংলাদেশকে বলেন, শেয়ার বাজারের দীর্ঘদিনের মন্দা এবং ব্যাংকে আমানতের সুদের হার কম হওয়ার কারণে এতদিন সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্র বেশি বিক্রি হচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজার ভালো হওয়ায় বেশি মুনাফার আশায় অনেকেই শেয়ার কিনছেন। সে কারণেই সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমেছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক ও অক্টোবর মাসে ৪ হাজার ২৬৬ কোটি ৬১ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে বিক্রির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৮৫৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অগাস্টে বিক্রি হয়েছিল ৪ হাজার ২৯৭ কোটি ২১ লাখ টাকার।

জুলাই ও জুন মাসে বিক্রির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৩ হাজার ৪৯৮ কোটি ৩৭ লাখ ও ৩ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা।

বাজারসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি মন্দাবস্থায় অনেক বিনিয়োগকারী বাজারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন। তাদের অনেকেই আবার শুধু প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) জন্য বিও হিসাবগুলো খুলেছিলেন। অবশ্য গত এক বছরে নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত হওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন তারা। একই সঙ্গে তারা নতুন বিওধারীদের জেনে বুঝে বিনিয়োগ করার ওপরও গুরুত্বারোপ করছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহমেদ স্টক বাংলাদেশকে বলেন, অনেকে শুধু আইপিওতে বিনিয়োগের জন্য বিও হিসাব খুলে থাকে, যাদের প্রায় কেউই সেকেন্ডারি মার্কেটে সক্রিয় নন। শেয়ারদর অনেক নেমে আসার কারণে গত বছরের বাজারে তাদের অনেকেই হয়তো বিও হিসাবটি আর চালিয়ে যেতে চাননি।

তবে হঠাৎ করে বাজার ধ্বসের কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেকে ভালো কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে দিয়ে খারাপ কোম্পানির বা জাঙ্ক ধরা কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করেছে। জাঙ্ক শেয়ারের দর ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। আমি মনে করি না, এটা সাসটেইনেবল বিনিয়োগ হবে। এসব শেয়ারের বিনিয়োগকারীরা আবারো মার খাবে।

নতুন বিনিয়োগকারীর আগমন এবং পুরাতনদের প্রত্যাবর্তন সম্পর্কে ডিএসইর পরিচালক মো. রকিবুর রহমান বলেন, পুঁজিবাজার থেকে কিছু সংখ্যক বিনিয়োগকারী চলে যাবেন আবার এর বিপরীতে নতুন বিনিয়োগকারীর আগমন ঘটবে, এটাই স্বাভাবিক। গত বছর অনেক বিও হিসাব বন্ধ হয়ে গেছে।

আমার মনে হয়, যেসব বিনিয়োগকারী দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগে আগ্রহী নন কিংবা যাদের কাছে পর্যাপ্ত অর্থ নেই, তারাই বিও হিসাবগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন। তবে একই সময়ে নতুন অনেক বিনিয়োগকারী বাজারে এসেছেন, যেটি ইতিবাচক। আমি বিশ্বাস করতে চাই, তারা জেনে বুঝেই বাজারে এসেছেন।

তিনি বলেন, ডিএসই থেকে আমরা বরাবরই বলে আসছি, যাদের কাছে উদ্বৃত্ত অর্থ রয়েছে, কেবল তাদেরই শেয়ারবাজারে আসা উচিত এবং জেনে বুঝে। অনেকেই আছেন, যারা স্বল্প সময়ে বড় মুনাফা করতে আগ্রহী। কিন্তু গত কয়েক বছরের সংস্কার ও বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে আমার মনে হয়, দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগই লাভজনক।

তবে আইপিও খরা কাটাতে এবং পুঁজিবাজারে সুস্থ্যতায় আরো আইপিও ছাড়ার তাগিদ প্রকাশ করেন এএফসি ক্যাপিটাল লিমিটেডের সিইও মাহবুব মজুমদার।

বাজার সম্পর্কে তিনি স্টক বাংলাদেশকে বলেন, বাজার আবারো ভালো হবে। এ নিয়ে আশঙ্কার কিছু নেই, সব ইন্ডিগেটর বলছে- পজেটিভ। যে কারণে আগামী দিনে বাজার আরো ভালো থাকবে। কারণ বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ অনেক বাড়াচ্ছেন। অর্থনীতির সব ইন্ডিগেটর বলছে- শুভ দিন আসছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here