নতুন গ্রাহক বাড়ছে জীবন বীমা খাতে

0
588

সিনিয়র রিপোর্টার : নানা অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, অব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ দুর্বলতার মধ্যেও বীমা খাতের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়ছে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জীবন বীমা খাতে মোট গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ২৯ লাখ। আগের বছরের ডিসেম্বরে খাতটিতে মোট গ্রাহক সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৮৫ লাখ। এ হিসাবে গত এক বছরে খাতটিতে ৪৪ লাখ নতুন গ্রাহক বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বীমা খাত ক্রমেই সম্প্রসারণ হচ্ছে। বাড়ছে নতুন গ্রাহকের সংখ্যা। অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০২১ সালের মধ্যে জিডিপিতে বীমা খাতের অবদান শূন্য দশমিক ৯ থেকে ৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। তবে এজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরো দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। বীমা আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে যেসব বিধি-বিধান এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তা সম্পন্ন করা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া খাতটির প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখা যাবে না।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব মো. সাঈদ কুতুব বলেন, সরকার বীমা শিল্পকে যুগোপযোগী ও  আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার জন্য বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কার সাধন করেছে। এসব সংস্কারের ফলে বীমা খাতে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়েছে এবং বীমা সেবায় পেশাদারি বেড়েছে। এতে নতুন গ্রাহকরাও আকৃষ্ট হচ্ছেন।

জানা যায়, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত বীমা খাতে গ্রাহক সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্স। এ সময়ে কোম্পানিটির মোট গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮ কোটিতে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মোট গ্রাহক সংখ্যা ৪২ কোটি। তৃতীয় অবস্থানে মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের গ্রাহক সংখ্যা ২৭ লাখ ১৯ হাজার।

চতুর্থ স্থানে থাকা ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের গ্রাহক ২৬ লাখ। আর গ্রাহক সংখ্যার দিক থেকে পঞ্চম স্থানে রয়েছে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্স। ২০১৬ সাল শেষে কোম্পানিটির মোট গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ।

এছাড়া অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মোট গ্রাহক সংখ্যা ১৭ লাখ, সন্ধানী লাইফের ৭ লাখ, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৫ লাখ ৮৭ হাজার, রূপালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৪ লাখ ৩২ হাজার, প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৪ লাখ ৭৭ হাজার, পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৫ লাখ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান জীবন বীমা করপোরেশনের মোট গ্রাহক সংখ্যা ৫ লাখ। এদিকে একমাত্র শতভাগ বিদেশী মালিকানাধীন মেটলাইফের মোট গ্রাহক সংখ্যা ২০১৬ সাল শেষে দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) চেয়ারম্যান শেখ কবীর হোসেন জানান, দেশে এখন বেশকিছু ভালোমানের জীবন বীমা কোম্পানি রয়েছে। এছাড়া নতুন বীমা কোম্পানিও দেয়া হয়েছে বেশকিছু। সবমিলে নতুন গ্রাহক বেড়েছে। এটি সুনামের সঙ্গে ধরে রাখাটাই এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। বীমা দাবি পরিশোধের দীর্ঘসূত্রতাও বন্ধ করা উচিত।

প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জালালুল আজীম বলেন, আমাদের দেশের বীমা খাত এখনো তুলনামূলকভাবে অপরিণত। অনেক মানুষ বীমার বাইরে রয়েছে। এক দশক ধরে এ খাতের পরিধি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, মানুষ এ ব্যাপারে সচেতন এবং বিভিন্ন বীমা পলিসির গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে শুরু করেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বছরজুড়ে বীমা খাত নিয়ে নানা নেতিবাচক শিরোনাম থাকলেও সংস্কার আনতে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইডিআরএ। বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে কোম্পানিভেদে জরিমানা করেছে ৩ লাখ থেকে ৪৭ লাখ টাকা পর্যন্ত। মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগে অনিয়মের কারণেও বেশকিছু কোম্পানিকে জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া বছরজুড়ে নিরীক্ষক নিয়োগ তো ছিলই। এতে কিছুটা হলেও শৃঙ্খলা ফিরেছে বীমা খাতে।

জানা যায়, বীমা কোম্পানির দুর্বল ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ সাংগঠনিক কাঠামো, বীমা পলিসির বিদ্যমান উচ্চ প্রিমিয়াম রেট এবং পেশাগত বীমা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ না থাকা, বীমা কোম্পানির করপোরেট গভর্ন্যান্সের অভাব, কোম্পানিগুলোর অ্যাকচুয়ারি না থাকা ইত্যাদি কারণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ভালো করতে পারছে না বীমা খাত।

বীমা কোম্পানিগুলোরও ব্যবসায় সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব রয়েছে। স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নেই নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আইডিআরএর। তবে আগামী বছরে এসব সমস্যা সমাধানে আইডিআরএ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইডিআরএর সদস্য কুদ্দুস খান বলেন, বীমা খাতকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দিতে সরকার বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, যার ফলে গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধির এ প্রবণতা। নতুন বছরে বীমা কোম্পানিগুলো অনেক সমস্যাই সমাধান হবে। কারণ বীমা খাতের উন্নয়নে বড় ধরনের প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার।

জানা যায়, বীমা খাতের উন্নয়নে ‘বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ নামের বড় অংকের একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ছয় বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু হচ্ছে এ বছরের ১ মার্চ। এ প্রকল্পের আওতায় দেশের বীমা খাত ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের সহায়তার পরিমাণ হবে ৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার, বাংলাদেশী মুদ্রায় (৭৯ টাকা বিনিময় হারে) যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। চলতি মাসেই এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র।

জানা গেছে, বীমা খাতের উন্নয়নে প্রকল্পটিতে অর্থায়নের বিষয়ে গত ৩ নভেম্বর ইআরডি সচিব মোহাম্মদ মেজবাহউদ্দিন বরাবর বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালের কান্ট্রি ডিরেক্টর চিমিয়াও ফান একটি চিঠি দিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. ইউনুসুর রহমান, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান এম শেফাক আহমেদ এবং বাংলাদেশ বীমা একাডেমির পরিচালক আহমেদুর রহিমকে ওই চিঠির অনুলিপি দেয়া হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here