দেশে বিনিয়োগ ঘাটতি বাড়ার আশঙ্কা

0
539

ডেস্ক রিপোর্ট: দেশে অনেকগুলো বড় প্রকল্প এখন চলমান। পদ্মা সেতুর পাশাপাশি চলছে রূপপুর, রামপালসহ বিদ্যুৎ খাতের কিছু বড় প্রকল্পের বাস্তবায়ন। বড় প্রকল্প নিয়ে এগোচ্ছে রেলওয়েও। দেশে বর্তমারে ২৫ শতাংশ বিনিয়োগ ঘটতি রয়েছে, তা ৩১ শতাংশে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তার পরও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, অবকাঠামো উন্নয়নে যে বিনিয়োগ প্রয়োজন, তার চেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা সংস্থা অক্সফোর্ড ইকোনমিকস বলছে, অবকাঠামো উন্নয়নে ২৫ শতাংশ বিনিয়োগ ঘাটতিতে আছে বাংলাদেশ। আগামীতে এ ঘাটতি আরো বাড়বে। অবকাঠামো উন্নয়নে বর্তমানে যে গতিতে বিনিয়োগ হচ্ছে, তাতে ২০৪০ সাল পর্যন্ত ৩১ শতাংশ ঘাটতিতে পড়বে বাংলাদেশ।

অবকাঠামোগুলোর মধ্যে রয়েছে সড়ক, রেলপথ, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ, পানি ও টেলিযোগাযোগ। এসব অবকাঠামোয় ২০১৬-৪০ সাল পর্যন্ত বিনিয়োগের বর্তমান ও সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরেছে অক্সফোর্ড ইকোনমিকস। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪০ সাল পর্যন্ত সাতটি খাতের অবকাঠামোয় বাংলাদেশের বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে মোট ৬০৮ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে যে হারে এসব খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে, তাতে ওই সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াবে ৪১৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এ সময়ে প্রয়োজনের তুলনায় বিনিয়োগের ঘাটতি দাঁড়াবে ১৯২ বিলিয়ন ডলার।

অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ বৃদ্ধি চ্যালেঞ্জিং হলেও সরকারের এ বিষয়ে প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানান পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিশেষ করে বন্দর, সড়ক-মহাসড়ক উন্নয়নের কাজ চলছে। বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিরাপত্তার মতো অবকাঠামো ও গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়নেও মেগা প্রকল্প নেয়া হয়েছে।

আশা করছি, ২০৩০ সালে ৩৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা হচ্ছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে কাজ করছি আমরা। উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনে বিদেশী বিনিয়োগও বাড়বে। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ এখন তুলনামূলক কম হলেও আমরা তাদের যেসব সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছি, এতে অদূরভবিষ্যতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিনিয়োগ আসবে।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে সামগ্রিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১২ বিলিয়ন ডলার। যদিও ওই সময় এ খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজন ছিল ১৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি। আর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) ধরা হলে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াত ১৮ বিলিয়ন ডলারে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত অবকাঠামো খাতে এসডিজিসহ বার্ষিক বিনিয়োগ প্রয়োজন ২৯ বিলিয়ন ডলার। বর্তমান বিনিয়োগ ধারায় ২০৪০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের বার্ষিক বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াবে ২২ বিলিয়ন ডলার। যদিও সে পর্যন্ত বার্ষিক বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

সড়ক অবকাঠামোগুলোর মধ্যে রয়েছে সড়ক ও সেতু। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের তথ্যমতে, বর্তমানে প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বিনিয়োগ হচ্ছে শুধু সড়ক অবকাঠামোয়। এ খাতে ২০১৬-৪০ সাল পর্যন্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে ১৩৯ বিলিয়ন ডলার। খাতটিতে বার্ষিক বিনিয়োগ হচ্ছে ৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের জিডিপির ১ দশমিক ১ শতাংশ। এ খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের যে পূর্বাভাস দিয়েছে অক্সফোর্ড ইকোনমিকস, তাও একই। তবে ২০০৭-১৫ সময়ে খাতটিতে বিনিয়োগ হয়েছে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। ওই সময়ে এ খাতে বার্ষিক বিনিয়োগ ছিল ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।

রেলের অবকাঠামোর মধ্যে আছে রেলপথসংশ্লিষ্ট সব ধরনের স্থায়ী অবকাঠামো। ২০৪০ সাল পর্যন্ত এ অবকাঠামোয় বিনিয়োগ ঘাটতি দাঁড়াবে ১০ বিলিয়ন ডলার। এ খাতে ২৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হলেও বর্তমান হারে চলতে থাকলে তা সর্বোচ্চ ১৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে। খাতটিতে বার্ষিক বিনিয়োগের পরিমাণ বর্তমানে মাত্র শূন্য দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। যদিও এ খাতে বার্ষিক বিনিয়োগ প্রয়োজন ১ বিলিয়ন ডলার। ২০০৭-১৫ সাল পর্যন্ত রেলপথ অবকাঠামোয় বার্ষিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল শূন্য দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার।

সবচেয়ে কম বিনিয়োগ হওয়া অবকাঠামো খাতের অন্যতম বিমানবন্দর। টার্মিনাল, রানওয়ে, অ্যাপ্রনসহ বিমানবন্দরের স্থায়ী অবকাঠামোয় বার্ষিক শূন্য দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়লেও বিনিয়োগ হচ্ছে বার্ষিক শূন্য দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। ২০১৬-৪০ সময়ে বিমানবন্দরের অবকাঠামোয় বিনিয়োগের ঘাটতি দাঁড়াবে ১ বিলিয়ন ডলার। ওই সময়ে খাতটিতে মোট বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে ৮ বিলিয়ন ডলার।

অবকাঠামো উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেন, প্রচুর বিনিয়োগ হচ্ছে। তবে এসব বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কৌশলগত সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। ফলে এক খাতের উন্নয়ন আরেক খাতের জন্য বাধা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। আর এজন্য বিনিয়োগ ও উন্নয়ন হলেও সেভাবে তার প্রভাব পড়ছে না। সড়ক, রেল, বিমানবন্দরসহ সব ধরনের অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেই বিনিয়োগের সার্বিক সুফল পেতে সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন। ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় নিয়েই বিনিয়োগ করতে হবে।

অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রাক্কলন অনুযায়ী, সমুদ্রবন্দরের ক্ষেত্রে ২০১৬-৪০ সাল পর্যন্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন ৩ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে যে হারে বিনিয়োগ হচ্ছে, তাতে এ লক্ষ্য অর্জিত হবে না বলে মনে করছে গবেষণা সংস্থাটি।

চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (পরিকল্পনা ও প্রশাসন) মো. জাফর আলম বলেন, বিশ্বের অনেক দেশই বন্দরের উন্নয়ন কার্যক্রমে ওভার ইনভেস্টমেন্টে গেছে, যেটা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সামগ্রিকভাবে আমরা দু-এক বছর হয়তো পিছিয়ে আছি। কিন্তু পরিচালন দক্ষতা দিয়ে তা সমাধানও করে নিচ্ছি। বন্দরের উন্নয়নে বড় বিনিয়োগের বেশকিছু প্রকল্পের বাস্তবায়ন এরই মধ্যে শুরু হয়েছে।

টেলিযোগাযোগ খাতে ২০৪০ সাল পর্যন্ত বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে ১০১ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে বার্ষিক বিনিয়োগ হচ্ছে ৪ বিলিয়ন ডলার। এ হারে বিনিয়োগ হলে খাতটিতে বিনিয়োগের ঘাটতি দাঁড়াবে ৪১ বিলিয়ন ডলার।

প্রয়োজনের তুলনায় ৪০ বিলিয়ন ডলার ঘাটতিতে থাকবে পানি ও পয়োনিষ্কাশন অবকাঠামো খাত। ২০৪০ সাল পর্যন্ত এ খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে ৮২ বিলিয়ন ডলার। খাতটিতে বার্ষিক বিনিয়োগ হচ্ছে ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। এ হারে ২০৪০ সাল নাগাদ বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াবে ৪২ বিলিয়ন ডলার।

অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি হবে বিদ্যুৎ খাতে। ২০১৬-৪০ সাল পর্যন্ত এ খাতে মোট বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে ২৫০ বিলিয়ন ডলার। অথচ বিদ্যমান গতিতে বিনিয়োগ হতে থাকলেও খাতটিতে বিনিয়োগের পরিমাণ গিয়ে ঠেকবে ১৫০ ডলারে। অর্থাৎ ২০৪০ সাল নাগাদ এ খাতে বিনিয়োগ ঘাটতি দাঁড়াবে ১০০ বিলিয়ন ডলার।

নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়, উচ্চতর মধ্যম আয় ও উচ্চ আয়ের দেশ— এ তিন শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত মোট ৫০টি দেশে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের চিত্র তুলে ধরেছে অক্সফোর্ড ইকোনমিকস। বিশ্বের মোট জিডিপির ৮৫ শতাংশের বেশি আসে এসব দেশ থেকে। নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত বাংলাদেশ ছাড়াও এ শ্রেণীতে এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে— ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন।

উল্লেখ্য, ১৯৮১ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বাণিজ্যিক সংস্থা হিসেবে অক্সফোর্ড ইকোনমিকস প্রতিষ্ঠা করা হয়। মূলত যুক্তরাজ্যভিত্তিক ব্যবসায় ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ও ধারণা দিতে এটি যাত্রা করে। চার দশক ধরে বিভিন্ন গবেষণা ও পূর্বাভাস প্রদানের মধ্য দিয়ে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে অক্সফোর্ড ইকোনমিকস।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here