free hit counters
Home অথনীতি দু’বছরের ক্ষতি ন’মাসে বাজার পুষিয়ে দিতে পারে

দু’বছরের ক্ষতি ন’মাসে বাজার পুষিয়ে দিতে পারে

0
4873
অমিতাভ গুহ সরকার, কলতাকা থেকে : সাত দিন হল বাজেট পেশ হয়েছে। কিন্তু তার সৌরভ এখনও বাজার থেকে মিলিয়ে যায়নি। বাজেটের দিন মৃদু ধাক্কা খেলেও পরের চার দিন বাজার উঠেছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। অথচ বাজেটে এমন কিছু চোখে পড়েনি, যা থেকে বাজার হঠাৎই এতটা শক্তি পেতে পারে।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছিল প্রত্যক্ষ ভাবে বাজারের অনুকূলে হয়তো তেমন কিছু নেই বাজেটে। যে-কারণে তা পেশের সময়ে সেনসেক্স তলিয়ে যায় ৬০০ পয়েন্টেরও বেশি। পরে চুলচেরা বিশ্লেষণ হলে দেখা যায়, বাজারকে তাতানোর রসদ আছে জেটলির তৃতীয় বাজেটে। তা ছাড়া বাজেটের আগে বাজার একটু বেশিই পড়ে গিয়েছিল।

এর আগে বেশ কয়েক বার ২৪ হাজারে নেমে সেনসেক্স আবার উঠতে শুরু করেছিল। এ বার কিন্তু প্রাক্‌ বাজেট পর্বে সূচক নামে ২২ হাজারের ঘরে। ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সূচক তাই একটি কারণ (ট্রিগার) খুঁজছিল। প্রত্যক্ষ ভাবে না-হলেও পরোক্ষ ভাবে বাজেটে বাজার-বন্ধু কিছু শর্ত থাকায় সূচক সেই ট্রিগার মেলে এবং তরতরিয়ে ওঠে চার দিন ধরে একনাগাড়ে।

৭০০০-এর নীচে তলিয়ে যাওয়া নিফ্‌টি শুক্রবার পৌঁছে যায় ৭৪৮৫ অঙ্কে। সপ্তাহ শেষে সেনসেক্স থামে ২৪,৬৪৬ পয়েন্টে। এমন কী আছে এই বাজেটে, যা সেনসেক্সকে সোমবারের ২৩ হাজার পয়েন্ট থেকে মাত্র চার দিনে তুলে দিল ১৬৪৪ পয়েন্ট বা ৭.১৫%? দেখে নেব এক নজরে।

১) আশা ছিল, অনুৎপাদক সম্পদের বোঝায় নুয়ে-পড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে জেটলি সাহেব বড় মাপের মূলধন জোগাবেন। কিন্তু যখন অর্থমন্ত্রীর মুখ থেকে শোনা গেল মাত্র ২৫,০০০ কোটি বরাদ্দের কথা, তখনই হুড়মুড়িয়ে নামতে শুরু করল শেয়ার বাজার। বিশেষত ব্যাঙ্ক শেয়ারগুলি। পতন রোধ হয়, যখন অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেন সরকারি ব্যাঙ্কগুলির হাল ফেরাতে সরকার সচেষ্ট থাকবে।

ঘোষণা করা হয়, আইডিবিআই ব্যাঙ্কে সরকারি মালিকানা ৫০ শতাংশের নীচে নামিয়ে আনার কথা তারা বিবেচনা করতে পারে। আর যে-ঘোষণাটি বিশেষ অর্থবহ তা হল, মঙ্গলবার বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির মূলধন হিসেব সংক্রান্ত নিয়ম শিথিল করার ব্যাপারে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ঘোষণা।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী ব্যাঙ্কগুলি তাদের স্থাবর সম্পত্তি এবং বিদেশি মুদ্রা রিজার্ভের একাংশ মূলধন হিসেবে গণ্য করতে পারবে। প্রাথমিক হিসেব অনুযায়ী এটা করা হলে ব্যাঙ্কগুলির ৪০,০০০ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পত্তি ও বিদেশি মুদ্রার তহবিল মূলধন হিসেবে গণ্য হবে। আগামী চার বছরে ব্যাঙ্কগুলির ১.৮ কোটি টাকার মূলধন লাগবে। এ বার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে ব্যবস্থা হল ৬৫০০০ কোটির। খুব মন্দ নয়। এই ঘোষণার পর তেতে ওঠে ব্যাঙ্ক শেয়ার।

২) প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রাজকোষ ঘাটতি ৩.৯ শতাংশে বেঁধে রাখা সম্ভব হয়েছে। বলা হয়েছে আগামী বছরে ঘাটতি নামবে ৩.৫ শতাংশে। খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকলে সরকারকে বাজার থেকে কম ঋণ করতে হবে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সামনে সুদ কমানোর পথও প্রশস্ত হবে। বাজার ২৫ বেসিস পয়েন্ট সুদ কমার আশা করছে। এখন না-হলেও ৫ এপ্রিল ঋণনীতি ফিরে দেখতে বসে যে রঘুরাম রাজন সুদ কমাবেন, সে ব্যাপারে অনেকেই আশাবাদী। এই আশায় তেতে ওঠে সূচক। তবে সুদ কমা অবশ্যই সুখবর নয় সুদ-নির্ভর জনতার কাছে।

৩) বেজায় খুশি আবাসন শিল্প। এই শিল্পের জন্য অনেক কিছু আছে বাজেটে। গৃহঋণে সুদের উপর বাড়তি ৫০,০০০ টাকা কর ছাড়, সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে তৈরি কম দামের ফ্ল্যাটে পরিষেবা কর মকুব, নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের জন্য তৈরি আবাসনের মুনাফায় আয়কর ছাড়, রেডিমিক্স কংক্রিটে উৎপাদন শুল্ক ছাড়ের মতো একগুচ্ছ সুবিধা পেয়েছে আবাসন শিল্প। এতে ফ্ল্যাটের দাম কমবে, বাড়বে চাহিদা। উপকৃত হবে ইস্পাত, সিমেন্ট-সহ বেশ কিছু শিল্প।

৪) আশঙ্কা ছিল, শেয়ারে চাপতে পারে মূলধনী লাভকর, কর বসানো হতে পারে ডিভিডেন্ডেও। প্রথমটি হয়নি। ডিভিডেন্ডে কর চাপলেও দিতে হবে শুধু তাঁদেরই, যাঁদের ডিভিডেন্ড বাবদ আয় ১০ লক্ষ টাকার বেশি। অর্থাৎ মূলত কোম্পানি মালিকদের। এই প্রস্তাবে বাজারের আশঙ্কা দূর হয়।

৫) বাজারকে খুশি করেছে বিমা, পেনশন, সম্পদ পুনর্গঠন সংস্থায় প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নির নিয়ম শিথিলের প্রস্তাব। দেশি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে ১০০% বিদেশি লগ্নিতে সায়।

৬) আরবিআই আইনে বদল এনে সুদ নির্ধারণে নয়া কমিটি স্থাপনের প্রস্তাব মনে ধরেছে বাজারের।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, প্রত্যক্ষ ভাবে তেমন না হলেও ঘুরপথে বাজারের প্রাপ্তি কম হয়নি। যে কারণে বাজার এত গরম। তবে তেজী অবস্থায় বিক্রির চাপ এলে সূচক কিছুটা নামতে পারে। মাঝারি মেয়াদে বাজারকে হয়তো আবার উঠতে দেখা যাবে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক যদি অদূর ভবিষ্যতে সুদ কমায়।

বাজেট থেকে যে-সব শিল্প লাভবান হয়েছে তার মধ্যে আছে আবাসন, ইস্পাত, সিমেন্ট, ব্যাঙ্কিং, পরিকাঠামো (রাস্তা তৈরি), ইলেকট্রনিক্স (ডিজিটাল ইন্ডিয়া) ইত্যাদি শিল্প। অন্য দিকে চাপে থাকা শিল্পের মধ্যে আছে গাড়ি, অলঙ্কার এবং কয়লা শিল্প। কয়লার উপর টন প্রতি ২০০ টাকা নতুন সেস বসায় চাপ বাড়বে কয়লা ব্যবহারকারী সংস্থার, বিশেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের উপর। এর ফলে বিদ্যুতের দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকবে।

গ্রামোন্নয়নে মোটা টাকা বরাদ্দ হওয়ায় যে-সব সংস্থা গ্রামে বেশি ব্যবসা করে, তারা সুদিনের আশা করছে। গ্রামের অর্থনীতিতে টাকা এলে মোটরবাইক, ছোট গাড়ি, এফএমসিজি ইত্যাদি সংস্থার ভাল হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বাজেটের পরে চার দিনে বাজার প্রায় ১৬৫০ পয়েন্ট উঠলেও সব ভাল শেয়ার কিন্তু একই মাত্রায় ওঠেনি। বাজেট প্রস্তাব ভাল করে বুঝে এখন ভাল শেয়ার বাছার সময়। অনেকেরই আশা, এ বছরে সুদ ৫০ বেসিস পয়েন্ট নামতে পারে। তা যদি হয়, তবে মাঝেমধ্যে সংশোধন সাপেক্ষে বাজার কিন্তু উপর দিকে চাইতে পারে। এই পরিস্থিতিতে মিউচুয়াল ফান্ডেও এসআইপি চালিয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। গত দু’বছরের লোকসান পুষিয়ে যেতে পারে আগামী ৯ মাসে।

সরকারি কোষাগার ভরতে সরকারি সংস্থাগুলি সাধারণত ফেব্রুয়ারি-মার্চে অন্তর্বর্তী ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে। চলতি বছরেও শুরু হয়েছে ডিভিডেন্ড বণ্টন। শনিবার কোল ইন্ডিয়া প্রতিটি ১০ টাকার শেয়ারে ২৭.৪০ টাকা অন্তর্বর্তী ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। টাকার অঙ্কে ১৭,৩০৭ কোটি। এ ছাড়া সরকার ডিভিডেন্ড বণ্টন কর বাবদ পাবে ৩৫২৩ কোটি টাকা।

সব মিলিয়ে এ বার সরকারের ডিভিডেন্ড সংগ্রহের লক্ষ্য ৪৪,৩৬৬ কোটি টাকা। তবে শুধু রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাই নয়, ধনীদের ডিভিডেন্ডের উপর কর বসায় বহু বেসরকারি সংস্থাও মার্চের মধ্যেই এই বাবদ মোটা টাকা বণ্টনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে এ বারের মতো যেন মালিকদের ডিভিডেন্ডে ১০% কর না-দিতে হয়। বাজেট পেশের মাত্র ৪ দিনের মধ্যে ৭০টি কোম্পানি বোর্ড মিটিং ডেকেছে ইন্টেরিম ডিভিডেন্ড জানাতে। এ পথে যেতে পারে আরও বহু সংস্থা।

অর্থবর্ষ শেষ হতে ৩ সপ্তাহ বাকি। এই মাসেই শেষ হবে ২০১৫-’১৬ সালের করমুক্ত বন্ড ইস্যু। অর্থাৎ সুযোগ এখনও আছে। ৯ মার্চ ৩৫০০ কোটি টাকার করমুক্ত বন্ড নিয়ে আসছে সরকারি সংস্থা নাবার্ড। এএএ রেটিংযুক্ত এই ইস্যুতে ১০ এবং ১৫ বছর মেয়াদে সুদ পাওয়া যাবে যথাক্রমে ৭.২৯% এবং ৭.৬৪%। ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষে কর সাশ্রয়ের জন্য যাঁদের এখনও ৮০সি ধারায় লগ্নি করা হয়নি, তাঁদের হাতেও আছে আর মাত্র ২৪টি দিন। চলতি বছরের কর আগে বাঁচাতে হবে। এর পর করা যেতে পারে পরের বছরের চিন্তা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here