দুই অঙ্কের খেলাপি ঋণ কমবে ১ অঙ্কের সুদে

0
240

বিশেষ প্রতিনিধি : ব্যাংকিং খাতে হু-হু করে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে সার্বিক ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। গত তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৪ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংক ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নেমে এলে দুই অঙ্কের খেলাপি ঋণ কমবে। বাড়বে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান।

একই সঙ্গে পুঁজিবাজারেও পড়বে প্রভাব। বাজার ব্যবস্থা ভালো হবে বলে প্রত্যাশা করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এক অঙ্কের সুদহারই শেষ কথা নয়। সহজে যাতে উদ্যোক্তারা ব্যবসা শুরু করতে পারেন তার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া অবকাঠামো, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও বন্দর সুবিধা বাড়াতে হবে।

আগামী ১ জুলাই থেকে ৯ শতাংশের বেশি সুদ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স (বিএবি)। পাশাপাশি ১ জুলাই থেকে সরকারি রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ বাণিজ্যিক ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজেটে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন সংগঠনটির সভাপতি নজরুল ইসলাম মজুমদার। তিনি বলেন, এর চেয়ে কোনো ব্যাংক বেশি সুদ নিতে পারবে না। যেসব ব্যাংক এ সিদ্ধান্ত মানবে না তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

একইদিন অর্থমন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানান, সুদহার কমানোর ফলে দেশে বিনিয়োগ বাড়বে। সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বেসরকারিখাত নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বেসরকারি ব্যাংকগুলো ১২ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদে ঋণ বিতরণ করছে। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই থেকে ঋণের সুদ হার হবে ৯ শতাংশ। এই নির্দেশনার মধ্য দিয়ে ব্যাংক ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নেমে এলে নতুন নতুন বিনিয়োগ বাড়বে।

এ বিষয়ে ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেন, ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার বিষয়ে বিএবি যে ঘোষণা দিয়েছে তা শিল্প ও বাণিজ্য খাতের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক খবর। সুদহার এক অঙ্কে নেমে এলে যেসব উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন, তারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন। কারণ ব্যবসার খরচ কমে প্রতিষ্ঠানের লাভ বাড়বে। বাড়বে প্রতিযোগিতা ও সক্ষমতা। এতে নতুন বিনিয়োগ হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকও লাভবান হবে। কেননা, ঋণগ্রহীতারা সহজে ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন। এ ব্যাপারে রিয়েল এস্টেট এন্ড হাউজিং সোসাইটি অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) সভাপতি আলমগীর শামসুল আল আমিন ভোরের কাগজকে বলেন, বিএবির এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। আমাদের অনেক দিনের দাবি ছিল ব্যাংক ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার। ব্যাংক ঋণের সুদ হার একক অঙ্কে নেমে এলে শুধুমাত্র আবাসন খাত নয়, পুরো আর্থিক খাতের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত তিন মাসে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে। এর পরিমাণ ৭ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা। এর পরেই রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ব্যাংকগুলো। এ খাতের ছয় ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার ৩৫৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। তবে গত তিন মাসে বিশেষায়িত দুই ব্যাংকে নতুন করে খেলাপি ঋণ বাড়েনি।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, খেলাপি ঋণের সার্বিক পরিস্থিতি মোটেও সন্তোষজনক নয়। দেখা যাচ্ছে, শুধু পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠিত ঋণই নয়, অন্য ঋণও খেলাপি হয়ে পড়ছে। সরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণও রয়েছে। এতে ব্যাংকিং খাতের সার্বিক খেলাপি ঋণ ফের দুই অঙ্কের ঘরে উঠেছে। ব্যাংক ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নেমে এলে দুই অঙ্কের খেলাপি ঋণ ফের এক অঙ্কে ফিরে যাবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের ১ লাখ ৪৬ হাজার ৪১৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকার বিতরণের বিপরীতে খেলাপি হয়ে পড়েছে ৪৩ হাজার ৬৮৫ কোটি ৪৪ লাখ টাকা; যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ২৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। ২০১৮ সালের মার্চ শেষে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ২৯০ কোটি ২৩ লাখ টাকা।

তিন মাস আগে ডিসেম্বর পর্যন্ত এ খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ২৯ হাজার ৩৯৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা। মার্চ শেষে বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ৩১ হাজার ২২৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকার ঋণের বিপরীতে খেলাপি হয়েছে ২ হাজার ১৮৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা; যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ৭ দশমিক ০১ শতাংশ।

অন্যদিকে, এ সময়ে সরকারি মালিকানার দুই বিশেষায়িত ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ১৯৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এর বিপরীতে খেলাপি হয়েছে ৫ হাজার ৪২৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here