দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আচরণবিধি দরকার -ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম

0
366

এস বি ডেস্ক: শেয়ারবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়াতে আচরণবিধি তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এ বিধি করা হলে শেয়ারবাজার শক্তিশালী হবে। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে এ কথা বলেন তিনি।
শেয়ারবাজারের উন্নয়নের জন্য হিসাববিজ্ঞান বিষয়ক এক গবেষণা প্রকল্পের আওতায় গতকাল শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা গবেষণা অনুষদের একাডেমী মিলনায়তনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে ‘শেয়ারবাজারের অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা: প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ’ শীর্ষক গবেষণাপত্র উপস্থাপনকালে ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম দেশের শেয়ারবাজার নিয়ে তার মতামত তুলে ধরেন। সেমিনার সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান।
ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যর্থতার কারণেই শেয়ারবাজারে ২০১০ সালে বুদ বুদ তৈরি হয়েছিল। এছাড়া ২০১০ সালে ধসের আগে আইন ভঙ্গ করে ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগসীমা লঙ্ঘন করলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। তাছাড়া বিএসইসি ডিএসই ও সিএসই সম্মিলিতভাবে এ বুদ বুদ সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে সে সময়ে শেয়ারবাজারে ধস নামে।’
ড. মোয়াজ্জেম বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ ছাড়া বাজার স্থিতিশীল হবে না। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির উচিত হবে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়াতে কোড অব কন্ডাক্ট (আচরণ বিধি) তৈরি করা।’ পাশের দেশ ভারতের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘সেখানে বিদেশী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য এ ধরনের আচরণ বিধি তৈরি করা হয়েছে, যা ভারতীয় শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সব কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, সততা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করবে।’
গবেষণায় ড. মোয়াজ্জেম উল্লেখ করেন, ২০১০ সালের ডিসেম্বর শুরু হওয়া বিপর্যয় থেকে বাজার আজো বেরোতে পারেনি। সে সময় থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সব ধরনের নির্ণায়ক কমে গেছে। এ সময় ডিএসইর সাধারণ মূল্যসূচক কমেছে ৫৮ শতাংশ। বাজার মূলধন কমেছে ৪০ শতাংশ। আর্থিক লেনদেন কমেছে ৮০ শতাংশ। শেয়ার সংখ্যাভিত্তিক লেনদেন কমেছে ৫২ শতাংশ। ওই গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ২০১০ সালের ধসের আগে তালিকাভুক্ত ৩০ ব্যাংকের মধ্যে ১৯টি ব্যাংকই আইন লঙ্ঘন করে মোট দায়ের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছিল। ১০ শতাংশের বেশি বিনিয়োগ ছিল আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অথচ এসব ব্যাংকের বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ প্রসঙ্গে ড. মোয়াজ্জেম বলেন, ‘শেয়ারবাজারে বুদ্বুদ তৈরিতে যেসব বেআইনি কার্যক্রম শুরু হয়েছিল, তা এখনো বহাল রয়েছে— যা বাজার স্থিতিশীল হওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা। প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি মার্কেটে এসব অনিয়ম হয়েছে, এখনো হচ্ছে। প্রাইমারি মার্কেট থেকে সেকেন্ডারি মার্কেটে শেয়ার ছাড়ার আগে কোম্পানিগুলোকে তাদের মৌলভিত্তির তুলনায় এখনো অতিরিক্ত প্রিমিয়াম দেয়া হচ্ছে। ২০১০ সালে অনেক কোম্পানি ভুয়া নিরীক্ষা প্রতিবেদন দিয়ে শেয়ারবাজার থেকে টাকা তুলে নিয়েছে, এখনো নিচ্ছে। সে সময়ের মতো এখনো দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে। সে সময় অনেক বিও অ্যাকাউন্ট ছিল ভুয়া। এর আড়ালে অনেক জালিয়াতি হয়েছে। আর সেকেন্ডারি মার্কেটের সিরিয়াল ট্রেডিং, সার্কুলার ট্রেডিং আগের মতোই এখনো চলছে। বাজারে বাংলাদেশ ফান্ড বা স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড দিয়ে কৃত্রিমভাবে বাজার ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ফান্ড দিয়ে তা ঠেকানো যায়নি। কারণ আস্থাহীনতা বাজারের মূল সমস্যা, কোনোভাবেই তারল্য নয়।’
ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘মুদ্রানীতির প্রভাবে শেয়ারবাজার ওঠানামা করছে। মুদ্রানীতি শেয়ারবাজারবান্ধব না হলে বিএসইসি বা ডিএসই বাজার স্থিতিশীল করতে পারবে না। তাদের হাতে এমন কোনো উপাদান নেই, যা দিয়ে বাজার স্থিতিশীল করা সম্ভব।’
ঢাবির শিক্ষক ড. হেলাল উদ্দিন ওই গবেষণাপত্রের ওপর তার মতামত জানাতে গিয়ে বলেন, ‘দীর্ঘ বা স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ-সংক্রান্ত কোনো আইন নেই। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা মুনাফা করতেই শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে থাকে। ফলে তাদের নীতি নৈতিকতার কথা বলে লাভ নেই। আইন না থাকায় তারা যেকোনো ধরনের বিনিয়োগ করবে এটাই স্বাভাবিক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here