তুলা আমদানীতে আফ্রিকা নির্ভরতা বাড়ছে

0
95

ডেস্ক রিপোর্ট : তুলা উৎপাদনে বরাবরই মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর প্রাধান্য বজায় রয়েছে। তবে কয়েক বছর ধরে মালি, বেনিন, বুরকিনা ফাসো, আইভরি কোস্টসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশে পণ্যটির উৎপাদনে বড় ধরনের সাফল্যের দেখা মিলেছে। অনুকূল আবহাওয়া ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার কল্যাণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আফ্রিকায় তুলার বাম্পার ফলন দেখা যাচ্ছে।

একই সঙ্গে এসব দেশ থেকে পণ্যটির রফতানিও ক্রমে বাড়ছে। বাড়তি উৎপাদনের জের ধরে এরই মধ্যে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আফ্রিকার দেশগুলো তুলার সম্ভাবনাময় রফতানি বাজার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। তুলনামূলক কম দামে ভালো মানের পণ্য প্রাপ্তির সুযোগ থাকায় বিশ্বব্যাপী ক্রেতা দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলো তুলা আমদানিতে আফ্রিকামুখী হতে শুরু করেছে। খবর এগ্রিমানি ও লুসাকা টাইমস।

আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে তুলা উৎপাদন ও রফতানিতে সবচেয়ে এগিয়ে বেনিন। পশ্চিম আফ্রিকার দেশটি ২০১৮ সালে তুলা রফতানিকারকদের বৈশ্বিক শীর্ষ তালিকায় পঞ্চম অবস্থানে জায়গা করে নিয়েছে। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফরেন এগ্রিকালচারাল সার্ভিসের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি শতকের শুরুতে দেশটি থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সাকল্যে ৬ লাখ ২৫ হাজার বেল (প্রতি বেলে ৪৮০ পাউন্ড) তুলা রফতানি হয়েছিল।

১৮ বছরের ব্যবধানে বিদায়ী বছরে দেশটি থেকে তুলা রফতানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ বেলে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। ২০১৭ সালে বেনিন থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে মোট ১০ লাখ বেল তুলা রফতানি হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে বেনিনের তুলা রফতানি খাতে তিন বছর ধরে প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে। দেশটির ইতিহাসে এটাই তুলা রফতানির সর্বোচ্চ রেকর্ড।

মালি আফ্রিকার দ্বিতীয় শীর্ষ তুলা রফতানিকারক দেশ। পণ্যটির রফতানিকারকদের বৈশ্বিক শীর্ষ তালিকায় দেশটি ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। ইউএসডিএর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালি থেকে সবচেয়ে বেশি তুলা রফতানি হয়েছে। তিন বছরের প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে দেশটি থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব মিলিয়ে ১৩ লাখ বেল তুলা রফতানি হয়েছিল। বিদায়ী বছরে দেশটি থেকে পণ্যটির রফতানি অপরিবর্তিত রয়েছে।

বিদায়ী বছরে পশ্চিম আফ্রিকার অন্য দেশ বুরকিনা ফাসো তুলা রফতানিকারকদের বৈশ্বিক শীর্ষ তালিকায় সপ্তম অবস্থানে উঠে এসেছে। এ সময় দেশটি থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে মোট ১২ লাখ ৫০ হাজার বেল তুলা রফতানি হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউএসডিএ, যা আগের বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। ২০১৭ সালে দেশটি থেকে ১১ লাখ ৫০ হাজার বেল তুলা রফতানি হয়েছিল। বুরকিনা ফাসোর ইতিহাসে ২০১৩ সালে সবচেয়ে বেশি ১৩ লাখ বেল তুলা রফতানি হয়েছিল।

তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে বেনিন, মালি, বুরকিনা ফাসো, আইভরি কোস্টসহ পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোয় বাড়তি তুলা উৎপাদন হচ্ছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। ফলে এ অঞ্চলের দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে তুলা রফতানি আগের তুলনায় বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে আইভরি কোস্টের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ৮ লাখ ৬০ হাজার বেল তুলা রফতানি হয়েছিল। এর পর থেকে তিন বছর দেশটির তুলা রফতানিতে টানা মন্দাভাব বজায় ছিল। মন্দাভাব কাটিয়ে ২০১৮ সালে মোট ৭ লাখ ৫০ হাজার বেল তুলা রফতানি করেছে আইভরি কোস্ট, যা আগের বছরের তুলনায় ২০ দশমিক ৯৭ শতাংশ বেশি। এর মধ্য দিয়ে তুলা রফতানিকারকদের  বৈশ্বিক শীর্ষ তালিকায় দশম অবস্থানে উঠে এসেছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশটি।

তুলা রফতানিকারকদের বৈশ্বিক তালিকায় ১২তম অবস্থানে রয়েছে ক্যামেরুন। বিদায়ী বছরে দেশটি থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলা রফতানি ২৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ বেলে। আগের বছরে দেশটি থেকে মোট চার লাখ বেল তুলা রফতানি হয়েছিল। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে মধ্য আফ্রিকার দেশ ক্যামেরুন থেকে তুলা রফতানি বেড়েছে এক লাখ টন। এর আগে ২০১৫ সালে ক্যামেরুনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ৫ লাখ ৫০ হাজার বেল তুলা রফতানি হয়েছিল।

উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার দেশ সুদান। ২০১৮ সালে ৩ লাখ ৭৫ হাজার বেল তুলা রফতানির মধ্য দিয়ে দেশটি পণ্যটির রফতানিকারকদের বৈশ্বিক শীর্ষ তালিকায় ১৬তম অবস্থানে উঠে এসেছে। ২০১৭ সালে দেশটি থেকে মোট ৩ লাখ ৫০ হাজার বেল তুলা রফতানি হয়েছিল। সেই হিসাবে, বছরান্তে যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদান থেকে তুলা রফতানি ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়েছে।

একই চিত্র দেখা গেছে উত্তর আফ্রিকার দেশ মিসরে। ২০১৮ সালে দেশটি থেকে তিন লাখ বেল তুলা রফতানি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেশি। এর মধ্য দিয়ে পণ্যটির রফতানিকারকদের বৈশ্বিক শীর্ষ তালিকায় মিসরের অবস্থান দাঁড়িয়েছে ১৮তম। ২০১৭ সালে দেশটি থেকে মোট ২ লাখ ২০ হাজার বেল তুলা রফতানি হয়েছিল।

আফ্রিকার দক্ষিণাঞ্চলীয় ভূবেষ্টিত রাষ্ট্র জাম্বিয়া। তুলা রফতানিতে দেশটির অবস্থান বিশ্বে ২২তম। ২০১৭ সালে দেশটি থেকে আগের বছরের তুলনায় ৪৮ দশমিক ৭২ শতাংশ কমে সাকল্যে এক লাখ বেল তুলা রফতানি হয়েছিল। তবে গত বছর দেশটি থেকে পণ্যটির রফতানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার বেলে, যা আগের বছরের তুলনায় ১২৫ শতাংশ বেশি।

জাম্বিয়ার ইতিহাসে এটাই তুলা রফতানির সর্বোচ্চ রেকর্ড। বিদায়ী বছরে দুই লাখ বেল তুলা রফতানি করেছে পশ্চিম আফ্রিকার ছোট্ট দেশ টোগো। এর মধ্য দিয়ে দেশটি বৈশ্বিক তুলা রফতানিকারকদের শীর্ষ তালিকায় ২৪তম অবস্থানে জায়গা করে নিয়েছে। ২০১৭ সালেও টোগো থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে একই পরিমাণ তুলা রফতানি হয়েছিল।

তুলা রফতানিকারক দেশগুলোর বৈশ্বিক শীর্ষ তালিকায় ২৫তম অবস্থানে রয়েছে জিম্বাবুয়ে। দীর্ঘদিনের শাসক রবার্ট মুগাবের পতনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থা এড়িয়ে ২০১৮ সালে দেশটি ১ লাখ ৭৫ হাজার বেল তুলা রফতানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেশি। ২০১৭ সালে দেশটি থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে মোট ১ লাখ ৫০ হাজার বেল তুলা রফতানি হয়েছিল।

ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের কৃষি অর্থনীতিবিদ জেনি হারিগান বলেন, আফ্রিকার দেশগুলো কৃষি উৎপাদন বাড়াতে মনোযোগ দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশে দেশে খাদ্যশস্যের পাশাপাশি কোকো ও তুলার মতো রফতানিমুখী কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশেষত মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোয় আবহাওয়া অনুকূল থাকায় তুলা উৎপাদন আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে।

উৎপাদিত তুলার মানও বেশ ভালো। ফলে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তুলার রফতানি বাজারে অবস্থান পোক্ত করেছে আফ্রিকার দেশগুলো। কম দামে ভালো মানের পণ্য কেনার সুযোগ থাকায় বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, চীন, পাকিস্তান, ভারতসহ এশিয়ার প্রধান তুলা আমদানিকারক দেশগুলো আফ্রিকার দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here