তুং হাই নিটিংসহ ৫১৮টি শিল্প-কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা

0
904

সিনিয়র রিপোর্টার : তুং হাই ডায়িং অ্যান্ড নিটিং লিমিটেডে এক সপ্তাহ ধরে বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ নিয়ে অস্থিরতা চলছে। প্রায় ১ হাজার ৪০০ শ্রমিকের কারখানায় এখনো বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হয়নি। ঈদের আগে বেতন-ভাতা পরিশোধ করা না হলে তুং হাই নিটিংসহ ৫১৮টি শিল্প-কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা করছে শিল্প পুলিশ।

গাজীপুরের জিরানি বাজারে তুং হাই এবং সাভারের এইচএমএ গার্মেন্টস লিমিটেডেও বেতন-ভাতা নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা করছে শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। একইভাবে ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে বেতন-ভাতা পরিশোধকে কেন্দ্র করে দেশের শিল্প অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর ৫১৮টি শিল্প-কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দেশের শিল্প অধ্যুষিত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, আশুলিয়া ও চট্টগ্রাম। শিল্প পুলিশের হিসাবমতে, এসব অঞ্চলে সব খাত মিলিয়ে মোট ৬ হাজার ৬৬১টি শিল্প-কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ২৭৮টি পোশাক কারখানা। বাকি ৩ হাজার ৩৮৩টি অন্যান্য খাতের।

এসব কারখানার মধ্যে বিভিন্ন সমস্যায় শ্রম অসন্তোষপ্রবণ হিসেবে ৫১৮টি কারখানাকে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সদস্য কারখানা রয়েছে ২৪৭টি। আর বিকেএমইএর সদস্য কারখানার সংখ্যা ৮৯। বাকি ১৬৮টি কারখানা অন্যান্য খাতের।

সরকারপক্ষ থেকে অসন্তোষ হতে পারে এমন কারখানার তালিকা তৈরির কাজ চলমান বলে জানা গেছে। এদিকে শিল্প অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোয় মোট ৪ হাজার ৩২৮টি পোশাক কারখানা রয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ কারখানা সংগঠনটির বিশেষ পর্যবেক্ষণে রয়েছে।

এছাড়া বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে গোয়েন্দা সংস্থার তরফ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার একটি তালিকা এরই মধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে। এতে শুধু ঢাকা জেলায়ই শ্রম অসন্তোষপ্রবণ পোশাক কারখানার সংখ্যা ৯৫ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর সারা দেশের হিসাব করলে এ সংখ্যা সাড়ে ৩০০ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএর সহসভাপতি মাহমুদ হাসান খান স্টক বাংলাদেশকে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায়নি। নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে সংগঠনের পক্ষ থেকে আমরা মনিটরিং শুরু করেছি। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে এমন কোনো কিছু আমাদের নজরে আসেনি। তবে এবার নগদ সহায়তার জন্য অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যাবে না। বিষয়টি নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ রয়ে গেছে।

চলতি মাসে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনায় ২০ রোজার মধ্যে শ্রমিকদের উত্সব ভাতা পরিশোধের বিষয়ে সম্মত হয় সব পক্ষ। গার্মেন্টস শিল্প-বিষয়ক ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কোর কমিটির সভায় ত্রিপক্ষীয় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ওই সভায় ২০ রোজার মধ্যে উত্সব ভাতা ও ঈদুল ফিতরের আগে জুনের অন্তত ২০ দিনের বেতন প্রদানের দাবি জানান শ্রমিক নেতারা। এ পরিপ্রেক্ষিতে মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরা উত্সব ভাতার সঙ্গে জুনের ১০-১৫ দিনের বেতন প্রদানের বিষয়ে সম্মত হন। কিন্তু তার পরও বেশকিছু কারখানায় বেতন-ভাতা পরিশোধ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মাহবুবুর রহমান ইসমাইল বলেন, বেতন-ভাতা নিয়ে বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। তার পরও অনেক কারখানা রয়েছে, যেগুলোর শ্রমিকরা যথাযথভাবে বেতন-ভাতা পাবেন কিনা সংশয় রয়েছে।

ঈদের আগে বেতন-ভাতা পরিশোধের বিষয়ে কমপ্লায়েন্ট কারখানাগুলো নিয়ে খুব একটা উদ্বেগ নেই বলে জানান বাংলাদেশ জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি। তিনি বলেন, নন-কমপ্লায়েন্ট কারখানা মালিকরা সুযোগসন্ধানী। তারা অনেকেই শ্রমিকের সঙ্গে বোঝাপড়ার ভিত্তিতে উত্সব ভাতা দিয়ে থাকে। আবার অনেক মালিক রয়েছেন, যারা পূর্ণাঙ্গ বেতনও দিতে চান না। সেক্ষেত্রে ওইসব কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে এমন কারখানার মধ্যে রয়েছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ফ্যাশন, জননী নিট, ফপটেক, অন্তিম গ্রুপ, বি ব্রাদার্স ও মিনটেক্স ফ্যাশন, আশুলিয়ার লিন্ডা ফ্যাশন, ক্যাথে অ্যাপারেলস ও মবিভো অ্যাপারেলস এবং গাজীপুরের সাফি ফ্যাশন ও ইস্ট ওয়েস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক।

এদিকে কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী শুধু ঢাকা জেলায়ই বেশকিছু কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে যাত্রাবাড়ীর আফতাবুন নেছা টেক্সটাইল, বাড্ডার তোবা ফ্যাশন, শান্তিনগরের দ্য বে সুপার টেক্সটাইল মিলস, এলিফ্যান্ট রোডের অনন্ত গার্মেন্টস, সাভারের সার্ক নিটওয়্যার, প্রতীক অ্যাপারেলস, ঝুমকা টেক্সটাইল, এনএসআর ও অরকপ ডেনিম, মিরপুরের জানা জিন্স গার্মেন্টস ও তুং হাই সোয়েটার, আশুলিয়ার প্রজ্ঞা ফ্যাশন, ইউনিয়ন নিটিং অ্যান্ড ডায়িং ও ডংলিয়ন ফ্যাশন (বিডি), মগবাজারের জেসিস অ্যাপারেলস এবং তেজগাঁওয়ের ইকো জিন্স লিমিটেড উল্লেখযোগ্য।

এ বিষয়ে অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিদর্শক ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহ বলেন, দেশের শিল্প-কারখানাগুলোর ওপর অন্যবারের মতো এবারো কঠোর নজরদারি রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে শিল্প পুলিশ ও খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন কাজ করছে। নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপনের মাধ্যমে আমরা সমন্বয়ের কাজ করছি।

তিনি বলেন, সতর্কতা অবলম্বনের অংশ হিসেবেই অসন্তোষের আশঙ্কা রয়েছে এমন কারখানার তালিকা করা হয়। এমনও দেখা গেছে, তালিকায় না থেকেও কোনো একটি কারখানায় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। আশা করছি, বড় ধরনের কোনো সমস্যা হবে না। আর সমস্যা হলেও তা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here