তিন ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়

0
4365

সিনিয়র রিপোর্টার : দেশের ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুটপাটের নিদর্শন হয়ে আছে বেসিক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক (আইসিবিআইবি) ও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক। অস্বাভাবিক খেলাপি ঋণ এবং মূলধন ও নিরাপত্তা সঞ্চিতির (প্রভিশন) ঘাটতি নিয়ে কোনো রকমে চলছে ব্যাংক তিনটির কার্যক্রম। বিপর্যয়ে পড়ার পর দীর্ঘ সময়েও দিশা পাচ্ছে না ব্যাংকগুলো।

নজিরবিহীন লুটপাটের শিকার হওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের ৫৪ শতাংশই এখন খেলাপি। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। পাশাপাশি ২ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে থাকা ব্যাংকটি এখন সরকারের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়া সরকারি-বেসরকারি মালিকানার বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের ৩৬ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৮৮ কোটি ও মূলধন ঘাটতি প্রায় সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা। একইভাবে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণেরও ৭২ শতাংশ এখন খেলাপি। ১ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি নিয়ে চলছে দেশী-বিদেশী মালিকানার ব্যাংকটির কার্যক্রম।

দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসব ব্যাংকের পুনর্গঠন অথবা একীভূতকরণের মধ্যেই সমস্যার সমাধান দেখছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেশে ৫৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংক থাকার কোনো দরকার নেই। ব্যাংকিং খাতে বেসিক ব্যাংক না থাকলে দেশের অর্থনীতির কোনো ক্ষতি হবে না। দুর্বল ব্যাংকগুলো ব্যাংকিং খাতের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

বেসিক ব্যাংক : ২০০৮ সালের পর্যন্তও ভালো ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃত ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক। এর পর থেকে নজিরবিহীন লুটপাটের শিকার হয় ব্যাংকটি। আবদুল হাই বাচ্চু ব্যাংকটির চেয়ারম্যান থাকাকালে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে।

নজিরবিহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের শিকার ব্যাংকটি ২ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে। যদিও আর্থিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে গত তিন বছরে বেসিক ব্যাংককে ২ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার মূলধন জোগান দিয়েছে সরকার। বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে সরকারের কাছে নতুন করে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বন্ড চেয়েছে ব্যাংকটি।

মূলধন ঘাটতির পাশাপাশি ব্যাংকটিতে বেড়েছে খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি ও লোকসানও। ২০০৯ সালেও প্রায় ৬৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি। ২০১২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ২ কোটি ৭৮ লাখ টাকায়। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো লোকসানে পড়ে ব্যাংকটি। সে বছর নিট লোকসান হয় ৫৩ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে লোকসানের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১১০ কোটি টাকা। আর ২০১৫ সালে তা ৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ২০১৬ সালে নিট লোকসানের পাল্লা আরো ভারী হয়েছে বেসিক ব্যাংকের।

জানতে চাইলে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ মজিদ বলেন, একটি ভালো ব্যাংককে নজিরবিহীন দুঃশাসনের মাধ্যমে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে। গত দুই বছরের প্রচেষ্টায় বেসিক ব্যাংক প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠেছে। তবে মূলধন ঘাটতির কারণে ব্যাংকটি স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে। বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারের কাছে ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বন্ড চাওয়া হয়েছে। আশা করছি, সরকারের সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে সমাধানের উদ্যোগ নেবেন।

বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক : ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয় বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে। ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বংশাল ও দিলকুশা শাখা থেকে লোপাট হয় ২০৫ কোটি টাকা। এছাড়া বেশকিছু কর্মকর্তা গ্রাহকদের আমানতের টাকা আত্মসাৎ করায় বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক। প্রতিষ্ঠার প্রায় দেড় যুগ পেরিয়েও মাত্র ৪৮টি শাখা নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে ব্যাংকটি।

২০১৬ সালে মাত্র আড়াই কোটি, ২০১৫ সালে ১৬ লাখ, ২০১৪ সালে ২ কোটি ৯০ লাখ ও ২০১৩ সালে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা নিট মুনাফা করে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক। যেখানে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত নতুন ব্যাংকগুলোও চলতি বছর শতকোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে।

তবে চলতি বছরই ১০টি শাখা চালুসহ নতুন আঙ্গিকে ঘুরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানান বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরকিউএম ফোরকান। তিনি বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ডের মতো আধুনিক সব ব্যাংকিং সেবা চালু করেছে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক। খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নিজের দীর্ঘ ৩২ বছরের ব্যাংকিং ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ব্যাংকটির সম্প্রসারণে কাজ করছেন বলে জানান তিনি।

একটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে অবলুপ্ত বাংলাদেশ কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ১৯৮৬ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয়। তারল্য সংকটে পড়ে কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হলে ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক এর কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করে। এতে আমানতকারী ও ব্যাংকের কর্মীরা বিপাকে পড়েন ও আন্দোলনে নামেন।

পরে সরকার বাংলাদেশ কমার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডকে (বিসিআইএল) বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। সাবেক বিসিআইএলের ২৪টি শাখাকে পুনর্গঠনপূর্বক বিসিবিএলের পূর্ণাঙ্গ শাখা হিসেবে চালু করা হয়। একটি তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক লিমিটেড ১৯৯৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর যাত্রা করে।

২০১৬ সালের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ব্যাংকটির ৩৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা সরকারের। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের শেয়ার ১১ দশমিক ৩১ শতাংশ। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে সরকারি খাতের শেয়ার ৫১ দশমিক ৪১ আর বেসরকারি খাতের ৪৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে সরকার মনোনীত চারজন সদস্য নিযুক্ত রয়েছেন।

আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক : ২০০৮ সালে ওরিয়েন্টাল ব্যাংকের সব সম্পত্তি ও দায় নিয়ে নতুন নামে যাত্রা করে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক। এর পরও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ব্যাংকটি।

ধারাবাহিক লোকসানের মুখে থাকা আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ২০১৬ সালেও ২৭ কোটি টাকার লোকসান দিয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালে ব্যাংকটির নিট লোকসান ছিল ১৪ কোটি, ২০১৪ সালে ২৮ কোটি, ২০১৩ সালে ৬৮ কোটি, ২০১২ সালে ১০৬ কোটি ও ২০১১ সালে ১৭৯ কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতিতে বছর দুই আগে ব্যাংকটি বিক্রির গুঞ্জন ওঠে।

পরিচালনায় অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সমস্যায় পড়া আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ১৯৮৭ সালের ২০ মে আল-বারাকা ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড নামে কার্যক্রম শুরু করে। ২০০২ সালে মালিকানা পরিবর্তন হওয়ার পর ওরিয়েন্টাল ব্যাংক লিমিটেড নামে কার্যক্রম চালায় ব্যাংকটি। মালিকানা হস্তান্তরের পর পরই ওরিয়েন্টাল ব্যাংকে শুরু হয় নজিরবিহীন লুটপাট।

বাংলাদেশ ব্যাংক পরে এতে প্রশাসক বসায়। কিন্তু তারল্য সংকটের কারণে ওই সময় ব্যাংকটি থেকে টাকা তুলতে পারছিলেন না আমানতকারীরা। সরকার এর পর আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে সাড়ে ছয় বছর সময় দিয়ে ২০০৭ সালে একটি স্কিম বা কর্মসূচি চালু করে। এর পর ব্যাংকটির বেশির ভাগ শেয়ার বিক্রির জন্য নিলাম ডাকা হলে তা কিনে নেয় সুইজারল্যান্ডভিত্তিক আইসিবি ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপ এজি।

২০১৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংকটির ৫২ দশমিক ৯৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের হাতে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের কাছে ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ, প্রতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ১৫ দশমিক ৮৪, প্রবাসী বাংলাদেশীদের দশমিক শূন্য ৬ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ২৪ দশমিক ৩২ শতাংশ শেয়ার।

ধারাবাহিক লোকসানের কারণে ব্যাংকটির শেয়ারধারণকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রায় তিন দশক ধরে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ব্যাংকটির শাখা মাত্র ২৯টি।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, আর্থিক বিপর্যয়ের শিকার হয়ে কোনো ব্যাংকের সুনাম নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে আনা কঠিন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হিসেবে বেসিক ব্যাংককে নিয়ে সরকার একটু নাড়াচাড়া করছে। বিপর্যয়ে থাকা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগ নেয়া দরকার।

তিনি বলেন, ব্যাংক একীভূত করে দেয়া বা ব্যাংকের এক্সিট পলিসি বিষয়ে আমাদের দেশে আইনি সমস্যা রয়েছে। অনেক সময় ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের কর্মকর্তারাই জালিয়াতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ফলে বিতরণকৃত ঋণ আর আদায় করা সম্ভব হয় না।

এছাড়া খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতে নানা ধরনের আইনি জটিলতা সৃষ্টি হয়। এগুলো নিরসন করা না গেলে আর্থিক খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব হবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here