তিন কারণে পতনমূখী বাজার

0
2533

শাহীনুর ইসলাম : ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গত ৩দিনে কমেছে ২০০ পয়েন্টের বেশি। ৩৫ সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমেছে সূচক। পতনমূখী বাজারের কারণে অনেক বিনিয়োগকারী বিক্ষোভও করছেন। তবে নানামূখী কারণে কমছে সূচক, পতনের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে পুঁজিবাজার। তবে প্রধানত তিনটি কারণে পতনমূখী হচ্ছে বলে মনে করেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

প্রথমত. ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল সংকটেরই প্রতিফলন পড়ছে পুঁজিবাজারে। এডি রেশিও সমন্বয়সহ বিভিন্ন কারণে কয়েক মাসের ব্যবধানে মানি মার্কেটে তারল্য সংকট অনেক বেড়েছে। বর্তমানে সুদের হার দুই অংকে উঠেছে। সুদের হার বাড়লে অনেকে তার পুঁজি সরিয়ে নেন। অনেক প্রতিষ্ঠানের আমানতের সুদও ১২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। যে কারণে বাজারে তার ব্যাপক প্রভাব পড়ছে।

দ্বিতীয়ত. বাজারের নিম্নমুখিতায় হাল ধরে বা কিছু মিউচ্যুয়াল ফান্ড শেয়ার কিনে সমন্বয় রাখার চেষ্টা করে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) তহবিলের সংকটের কারণে নতুন করে বিনিয়োগ করতে পারছে না। পতন রোধ করার তাদেরও যথেষ্ট সক্ষমতা নেই।

প্রতিষ্ঠানগুলো এডি রেশিওজনিত কারণে কিছুটা চাপে আছে। আবার যেসব প্রতিষ্ঠানের হাতে বিনিয়োগযোগ্য তহবিল আছে, তারা এক্সপোজার ঠিক রাখতে গিয়ে বিনিয়োগ করতে পারছে না।

তৃতীয়ত. পুঁজিবাজারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবসিডিয়ারিগুলোর বিনিয়োগকে এক্সপোজারের আওতায় না এনে শুধু ওই ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগকেই হিসাবে নেয়া হয়। অর্থবাজারের নীতিনির্ধারকরা এ বিষয়গুলোকে বাস্তবতার নিরিখে পুনর্বিবেচনা করাও বড় কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

চলমান দরপতনের কারণ হিসেবে মঙ্গলবার বিষয়গুলো উঠে এসেছে। বিদ্যমান তহবিল সংকটেরই প্রতিফলন এটি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এমন তথ্য মেলে। একইসঙ্গে তহবিল সংকট কাটাতে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

বিএমবিএ সভাপতি মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন চৌধুরী

ডিএসই বোর্ডরুমে মঙ্গলবার জরুরি বৈঠক করেন ডিএসই ব্রোকারস অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ), বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ) ও স্টক এক্সচেঞ্জের কর্মকর্তারা। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ডিবিএ সভাপতি মোস্তাক আহমেদ সাদেক ও বিএমবিএ সভাপতি মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন চৌধুরী।

পুঁজিবাজারে তারল্য ও তহবিল সংকট নিরসন প্রসঙ্গে বিএমবিএ সভাপতি মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, প্রতিকূল সময়গুলোয় ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) সাধারণত একটা সাপোর্ট দিত। কিন্তু এ বছর বিভিন্ন ব্যাংক তহবিল তুলে নেয়ার কারণে আইসিবিও সে সাপোর্টটুকু দিতে পারছে না। আইসিবি একটি শক্তিশালী অবস্থানে থাকলে বাজারের জন্য খুবই ইতিবাচক হবে।

বাজারের স্বার্থে আইসিবিকে সিঙ্গেল পার্টি এক্সপোজার লিমিট থেকে অব্যাহতি দেয়ার সুপারিশ পুনর্ব্যক্ত করেন ডিবিএ ও বিএমবিএর প্রতিনিধিরা। তারা আরো বলেন, এডি রেশিও সমন্বয় করতে গিয়ে অনেক ব্যাংকই তহবিল সংকটে আছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিআরআর (ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও) ৬ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনলে অর্থবাজারে তারল্য কিছুটা বাড়বে। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এডি রেশিও অনেক কম। তারা চাইলে সাবসিডিয়ারি মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে পারে।

ডিবিএ সভাপতির বক্তব্যের সূত্র ধরে মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এডি রেশিওর বাইরেও পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আমরা বাজারসংশ্লিষ্টরা কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছিলাম। সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে বাধাগুলো অপসারণের কিছু সুপারিশ রয়েছে। এগুলোর বাস্তবায়ন হলে বাজারে এর প্রতিফলন দেখা যাবে বলে আশা করি।

তাদের সুপারিশগুলোর মধ্যে শেয়ারবাজারে ব্যাংকের এক্সপোজার গণনার পদ্ধতিতে পরিবর্তন অন্যতম। তারা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেকোনো কোম্পানির শেয়ার, এমনকি বন্ডে বিনিয়োগকেও পুঁজিবাজারে একেকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এক্সপোজার হিসেবে বিবেচনা করছে। এর পরিবর্তে শুধু স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেনযোগ্য শেয়ারে বিনিয়োগকেই এক্সপোজার গণ্য করার সুপারিশ তাদের। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানে কৌশলগত বিনিয়োগ আর স্টক এক্সচেঞ্জে হাতবদল হওয়া শেয়ারে বিনিয়োগ এক নয়।

বাজারমূল্যে এক্সপোজার গণনার সমস্যা সম্পর্কে মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের একটি প্রাইমারি শেয়ারে বিনিয়োগ করলে সেটিই তার এক্সপোজার হওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। কারণ সেকেন্ডারি বাজারে সেই শেয়ারটি ৫০ টাকায় লেনদেন হলে ওই প্রতিষ্ঠানের এক্সপোজারও ৫০ টাকা দেখায়, যেখানে তার প্রকৃত ঝুঁকি এর এক-পঞ্চমাংশ। নিছক এক্সপোজার গণনা পদ্ধতির কারণেই ওই ব্যাংককে ৪০ টাকার শেয়ার বিক্রি করতে হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here