১৯ বছরেও তালিকাচ্যুত ৩৭ কোম্পানি অর্থ ফেরত দেয়নি

0
312

সিকিউরিটিজ সংক্রান্ত আইন পালনে ব্যর্থতার কারণে গত ১৯ বছরে পুঁজিবাজার থেকে তালিকাচ্যুত হয়েছে মোট ৩৭ কোম্পানি। এসব কোম্পানি বাজার থেকে প্রায় ১৫০ কোটি তুলে নিয়েছে। তালিকাচ্যুতির পূর্বে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা না করায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন লাখ লাখ বিনিয়োগকারী। তারপরও তালিকাভুক্ত কোম্পানি থেকে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেয়ার বিষয়ে কোন নীতিমালা করেনি বিএসইসি।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা যায়, মূলত নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) না করা, লভ্যাংশ না দেয়া, দীর্ঘদিন কোম্পানির কার্যক্রম বন্ধসহ বিভিন্ন অসঙ্গতির কারণে এ ৩৭ কোম্পানিকে পুঁজিবাজার থেকে তালিকাচ্যুত করা হয়। কিন্তু তালিকাচ্যুতির পূর্বে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেয়ার বিষয়ে কোন দায়িত্ব নেয়নি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।

পুঁজিবাজার থেকে তালিকাচ্যুত কোম্পানিগুলো হলো : চান্দ টেক্সটাইল, চান্দ স্পিনিং, প্যানথার স্টিল, আনোয়ার জুট, স্পেশালাইজড জুট, পেপার কনভারটিং এ্যান্ড প্যাকেজিং, ডেলটা জুট, গাউসিয়া জুট, হাওলাদার পিভিসি, এ্যারোমো টি, ফ্রগলেস এক্সপোর্ট, সোয়ান টেক্সটাইল, প্রগেসিভ প্লাস্টিক, মিলন ট্যানারি, নিউ ঢাকা রিফ্যাক্টরিজ, শামসের জুট, আহাদ জুট, ইসলাম জুট, হাইস্পিড শিপিং, মিউচুয়াল জুট স্পিনারস, করিম পাইপস, এবি বিস্কুট, ঢাকা ভেজিটেবল, রূপন অয়েল, মেঘনা ভেজিটেবল অয়েল, ন্যাশনাল অক্সিজেন, এসটিএম (ওআরডি), জেম নিটিং, জেএইচ কেমিক্যাল, মার্ক বিডি শিপিং, প্যারাগন লেদার, টেক্সপিক ইন্ডাস্ট্রিজ, ঈগল বক্স এ্যান্ড ক্যাকটন, রাবেয়া ফ্লাওয়ার, ইস্টল্যান্ড ক্যামেলিয়া লিমিটেড ও জিএমজি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। এর মধ্যে মার্ক বাংলাদেশ একাই ৪০ কোটি টাকা আত্মসাত করে। বাকি কোম্পানিগুলো ১১০ কোটি টাকা নিয়ে তালিকাচ্যুত হয়।

জানা যায়, এসব কোম্পানির মধ্যে কোন কোন কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছিল শুধু টাকা উত্তোলনের জন্যই। তালিকাভুক্তির আগের ৩-৪ বছর অধিক ব্যবসায়িক সাফল্য দেখানো হয়। যাতে সহজে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া যায়। তালিকাভুক্তির পর প্রথম ২-৩ বছর কোনরকম ডিভিডেন্ড দিয়ে সিকিউরিটিজ সংক্রান্ত নিয়মকানুন মেনে চলে এসব কোম্পানি। তারপর থেকে শুরু হয় অনিয়ম।
প্রচলিত আইনের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তালিকাচ্যুত হয় এসব কোম্পানি। লিস্টিং ফি ফাঁকি, নিয়মিত লোকসান দেখানো, উৎপাদন বন্ধ রাখা, কোন প্রকার ডিভিডেন্ড না দিয়ে নামমাত্র অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে এসব কোম্পানি।

যাতে পুঁজিবাজার থেকে তালিকাচ্যুত হওয়া যায় বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত না দিয়েই। অবশেষে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের অসৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়। লিস্টিং ফি না দেয়া, শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড থেকে বঞ্চিত করা, নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা না করাসহ নানা ইস্যুতে একে একে স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে এসব কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করা হয়। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যাপারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ কিংবা কোম্পানির পক্ষ থেকেও কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এখনও অনেক কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের সঞ্চিত মূলধন নিয়ে একই পাঁয়তারা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অন্য খাত থেকে টাকা সংগ্রহের চেয়ে পুঁজিবাজার থেকে টাকা সংগ্রহ করা সহজ। এছাড়া পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে কর অবকাশ সুবিধাও পাওয়া যায়। তাই নিজেদের সুবিধার কথা ভেবেই অনেকেই বাজার থেকে টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করে থাকে।

ডিএসইর এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উল্টোপথে রয়েছে আমাদের দেশের পুঁজিবাজারে কোম্পানির তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া। ফলে ইচ্ছেমতো মূলধন সংগ্রহ করে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ সটকে পড়লেও বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেয়ার ব্যাপারে জোরালো পদক্ষেপ নেয়ার মতো কেউ থাকে না। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হন বিনিয়োগকারীরা। তিনি আরও বলেন, আমাদের পুঁজিবাজারে কোম্পানির তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কায় স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানির অনাপত্তিপত্র বা নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) দেয়ার পর নিয়ন্ত্রক সংস্থা তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেয়। বিনিয়োগকারী এবং পুঁজিবাজারের স্বার্থে স্টক এক্সচেঞ্জ তালিকাভুক্তির পূর্বে কোম্পানির কর্মকা- খতিয়ে দেখে ওসব দেশে। আমাদের দেশেও একই পদ্ধতি চালু করা হলে অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হতে পারত না বলে বাজার ডিএসইর এ পরিচালক মনে করেন।

বর্তমান পরিস্থিতি : গত বছরের শেষের দিকে ওষুধ ও রসায়ন খাতের একটি কোম্পানির আইপিওয়ের মাধ্যমে টাকা অনুমোদনের আগেই ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ আপত্তি তুলেছিল। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের সঙ্গে কোম্পানিটি প্রিমিয়াম নিয়েছিল ৫০ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি শেয়ারের ইস্যু মূল্য ছিল ৬০ টাকা। সোমবারে কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম দাঁড়ায় ৫৪ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি শেয়ারের আইপিও বিজয়ীরা এক বছরের ব্যবধানে ৬ টাকা করে লোকসানে রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি প্রকৌশল খাতের এমন আরও একটি কোম্পানিটির আইপিও আবেদন গ্রহণ শেষ হয়েছে।

কোম্পানিটির আর্থিক ভিত্তি খুব বেশি শক্তিশালী নয়। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের প্রিমিয়ার ধরা হয়েছে ১২ টাকা করে। নানা আলোচনা সমালোচনার পরে কোম্পানিটির আইপিওয়ের চাঁদা গ্রহণ এক দফা স্থগিতও করেছিল বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। পরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পরে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এ দুটি কোম্পানিটির আইপিওয়ের ইস্যু ম্যানেজারের দায়িত্বে রয়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট। আর্থিক ভিত্তির দুর্বল হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল নীতির কারণেই কোম্পানিটি দুটি বাজার থেকে টাকা উত্তোলন করেছে। সূত্র : জনকণ্ঠ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here