তারল্য সঙ্কট কমাতে সরকারের দুই সিদ্ধান্ত, তবুও ঝুঁকির শঙ্কা 

0
1212

বিশেষ প্রতিনিধি : আগ্রাসী ঋণ বিতরণের কারণে ব্যাংকের তারল্য সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংক অর্থের অভাবে অতিপ্রয়োজনীয় খাতেও ঋণ দিতে পারছে না। শুধু তাই নয়, অনেক ব্যাংক নগদ টাকার অভাবে গ্রাহকের আমানতের অর্থ সময়মত ফেরত দিতে পারছে না।

আবার কোন কোন ব্যাংক নিত্যদিনের প্রয়োজন মেটাতেও হিমশিম খাচ্ছে। এই অবস্থায় ব্যাংকের তারল্য প্রবাহ বাড়াতে নতুন করে দুইটি উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সেগুলো হলো, এখন থেকে সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ অর্থ বেসরকারি ব্যাংককে রাখা যাবে।

অন্যদিকে, সিআরআর সাড়ে ৬ শতাংশ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশে কমানো হয়েছে। এই দুই সিদ্ধান্তের ফলে বেসরকারি ব্যাংকগুলো ৩০ হাজার কোটি টাকার যোগান পাচ্ছে। এটি এ যাবতকালের মধ্যে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর জন্য সরকারের সর্বোচ্চ সুবিধা।

সিদ্ধান্তের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী গণমাধ্যমের সামনে স্বীকার করেছেন, এই দুটি সিদ্ধান্তই সালমানের (সালমান এফ রহমান) আইডিয়া। এদিকে তারল্য প্রবাহ বাড়ানোর জন্য সরকারের এই দুই উদ্যোগকে অযৌক্তিক বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

তাদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের টাকা বাধ্যতামূলকভাবে বেসরকারি ব্যাংকে ৫০ শতাংশ রাখা হলে ঝুঁকির পরিমাণ বেড়ে যাবে।

জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সরকারের আর্থিক খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকে অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, এখন থেকে বেসরকারি ব্যাংকে ৫০ শতাংশ সরকারি আমানত রাখা যাবে। এতে বেসরকারি ব্যাংকগুলো প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি যোগান পাবে। বিদ্যমান নিয়মে সরকারি তহবিলের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা যায়।

অন্যদিকে, গত রোববার বেসরকারি ব্যাংক ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সভায় অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, এখন থেকে ব্যাংকগুলোর আমানতের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যে নগদ টাকা জমা রাখা (সিআরআর) হয়, সেখান থেকে ১ শতাংশ কম রাখতে পারবে। অর্থাৎ বর্তমানে ব্যাংকগুলো সাড়ে ৬ শতাংশ টাকা নগদ জমা রাখে। এ হিসাবে তা কমে আসবে সাড়ে ৫ শতাংশে।

এর ফলে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর জমা রাখা সাড়ে ৬ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ সমপরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা তুলে নেবে। বর্তমান সরকারের চলতি মেয়াদে ব্যাংক খাতের সংকট মেটাতে আর্থিক খাতের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠকের ঘটনা এটাই প্রথম। এর আগে শুক্রবার রাতে বিএবি কার্যালয়েও এক সভা হয়। তবে সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কেউ উপস্থিত ছিলেন না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডিপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, সিআরআর কমানোটা মনিটরিং পলিসির বিষয়। আগামী মনিটরিং পলিসি ঘোষণার আগেই সিআরআর কমানোর বিষয়টা ব্যাংক ব্যবসায়ীরা অর্থমন্ত্রীকে দিয়ে আদায় করে নিয়েছে। এটা খারাপ উদাহরণ। ব্যাংকের ৯০ শতাংশ টাকা জনগণের, আর বাকি ১০ শতাংশ টাকা ব্যাংক মালিকদের। সুতরাং জনগনের টাকা যেন নষ্ট করতে না পারে, সেজন্যই মূলত কেন্দ্রিয় ব্যাংকে টাকা জমা রাখার বিধান রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বেসরকারি ব্যাংকে ৫০ শতাংশ সরকারি আমানত রাখার বিষয়টিও যৌক্তিক নয়। কারণ সরকারি মানেই তা জনগনের আমানত। সরকারের কাছে টাকা রাখলে তা নিরাপদ থাকার কথা। অন্যদিকে বাধ্যতামূলকভাবে বেসরকারি ব্যাংকে ৫০ শতাংশ রাখা হলে ঝুঁকির পরিমাণ বেড়ে যাবে। জলবায়ু তহবিলের টাকা নিয়ে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে অন্তত এ বিষয়টি ভাবা উচিত।

আরেক অর্থনীতিবিদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকারের এই দুই সিদ্ধান্ত একেবারেই অযৌক্তিক। এর মাধ্যমে কোন সুফল আসবে বলে আমি মনে করি না। বরং খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো বেড়ে যাবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের টাকা বাধ্যতামূলকভাবে বেসরকারি ব্যাংকে ৫০ শতাংশ রাখা হলে ঝুঁকির পরিমাণ বেড়ে যাবে।

তিনি বলেন, সিআরআর কমানোর কোন প্রয়োজন ছিল না। এতে করে ব্যাংকের তারল্য বাড়িয়ে ঋণ প্রবাহ আরো বেড়ে যাবে। এমনিতেই বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ রয়েছে। এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরিং পলিসির চেয়ে ২ শতাংশ  বেশি। বেসরকারি খাতে যে ঋণটা যাচ্ছে সেটা কোথায় ব্যবহার হচ্ছে? অর্থ পাচারের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, নাকি জমি কেনার খাতে ব্যবহার হচ্ছে? নাকি উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। তা খতিয়ে দেখতে হবে। যদি উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার না করা হয় এই তারল্য প্রবাহ বাড়ানোর কোন প্রয়োজন ছিল না।

এক প্রশ্নের জবাবে মির্জ্জা আজিজ বলেন, ব্যাংকগুলো সিআরআরের টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আওতায় না রেখে নিজেদের আওতায় রাখলো। এতে করে ব্যাংকগুলোর তারল্য প্রবাহ বাড়বে। এই টাকা তারা নিজেরা, বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজনসহ অযোগ্য লোকদের আরো বেশি করে আগ্রাসী ঋণ দেয়ার কাজে ব্যবহার করবে। এতে করে ঋণ খেলাপীর মাত্রা আরো বেড়ে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের জুন থেকে বেসরকারি ব্যাংকগুলো আগ্রাসীভাবে ঋণ বিতরণ করেছে। এ সময় আমানত বৃদ্ধির হার ১০ শতাংশ হলেও ঋণ বিতরণ বেড়েছে ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ হারে। ফলে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দেয়। একদিকে ব্যাংকের আমানত সংগ্রহ কমে যায়।

অন্যদিকে ঋণ বিতরণ বেড়ে যায় এবং ঋণের টাকা আদায় না হওয়ায় ব্যাংকগুলোতে নগদ অর্থ সংকট দেখা দেয়।  গত এক বছরে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১২ হাজার কোটি টাকা বেড়ে বর্তমানে হয়েছে ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। এই ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোতে ৪৪ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়েছে।

এছাড়াও ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোকে অবলোপন করতে হয়েছে। আবার অবলোপনের বিপরীতে সমপরিমাণ অর্থ প্রভিশন করতে হয়েছে। ফলে খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর ২ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার মতো আটকে রয়েছে। এসব টাকা আদায় করতে না পারায় ব্যাংকগুলো ভয়াবহ তারল্য সংকটে পড়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here