তবুও মেয়াদ বাড়ছে চার রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রর

0
1280

সিনিয়র রিপোর্টার : জরিমানা পরিশোধ না করেই চারটি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকরা চুক্তি নবায়নের সুযোগ পাচ্ছেন। মোট ৩০৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার এই কেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় কয়েকশ’ কোটি টাকা জরিমানা করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। বিলম্বে উৎপাদনে আসা, চাহিদার অতিরিক্ত জ্বালানি তেল নেওয়া এবং চাহিদা অনুসারে বিদ্যুৎ সরবরাহে ব্যর্থতার জন্য এই জরিমানা করা হয়।

এখনও এই চার রেন্টাল কেন্দ্রের কাছে পিডিবির পাওনা ৬০১ কোটি টাকা। কিন্তু মামলা করে জরিমানা প্রদান বন্ধ রেখেছে কোম্পানিগুলো। বেসরকারি খাতের এই কেন্দ্রগুলো থেকে পিডিবি বিদ্যুৎ ক্রয় করে। সেই ক্রয় চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। জরিমানা পরিশোধ না করলেও এই ক্রয় চুক্তি আবার নবায়ন হচ্ছে। চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের অনুমোদন মিলেছে। মেয়াদ বাড়ানো হবে ৫ বছর করে।

মেয়াদ বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় থাকা চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্র হলো- আমনুরা ৫০ মেগাওয়াট (চাঁপাইনবাবগঞ্জ), কাটাখালী ৫০ (রাজশাহী), নোয়াপাড়া ১০৫ ও কেরানীগঞ্জ ১০০ মেগাওয়াট রেন্টাল কেন্দ্র। প্রতিটি কেন্দ্র ফার্নেস অয়েলচালিত। নোয়াপাড়ার কেন্দ্রটি বাদে বাকিগুলো চালু রয়েছে।

বিভিন্ন অভিযোগ ও জরিমানা অনাদায়ী থাকা সত্ত্বেও চুক্তি নবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, মেয়াদ না বাড়ালে তো অন্ধকারে থাকতে হবে। চাহিদা অনুসারে বিদ্যুৎ দেওয়া যাবে না। বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো সময়মতো উৎপাদনে না আসায় চুক্তি নবায়ন করতে হচ্ছে। মেয়াদ বাড়লে সরকারের লাভ। কারণ এতে আগের চেয়ে কম মূল্যে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে।

দ্রুত বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটাতে ২০০৯-১০ সালের দিকে ৩-৫ বছর মেয়াদি রেন্টাল-কুইক রেন্টাল প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। কথা ছিল মধ্য মেয়াদের সরকারি মালিকানায় সাশ্রয়ী কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে এলে ব্যয়বহুল এসব ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় বন্ধ করে দেওয়া হবে। কিন্তু পিডিবিসহ সরকারি সংস্থাগুলোর বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

ফলে স্বল্পমেয়াদি রেন্টাল-কুইক রেন্টাল প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করতে সরকার বাধ্য হচ্ছে। ইতিমধ্যে বেসরকারি খাতের ১২টি প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। কয়েকটির চুক্তি একাধিকবার নবায়ন করা হয়েছে, যা নিয়ে বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা সমালোচনা করে আসছেন।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ সচিব বলেন, সামনে গরম মৌসুম আসছে, এ সময় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ লাগবে। এর মধ্যে এই কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বন্ধ হলে চাহিদা অনুসারে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।

এই কেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ কেনে পিডিবি। পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালিদ মাহমুদ বলেন, অনেক কেন্দ্রের জরিমানা মাসিক বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। চুক্তি শেষ হয়ে গেলে এই জরিমানা আদায় করা মুশকিল হবে। উদ্যোক্তাদের কাছে পাওনা আদায়ে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো প্রয়োজন বলে জানিয়েছে পিডিবি।

এ বিষয়ে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশনের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে রেন্টাল-কুইক রেন্টাল প্রকল্পগুলো উৎপাদনে আনা হয়। তারপরও এগুলো থেকে মানসম্মত বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। এতদিনে ব্যয়বহুল এসব প্রকল্প থেকে বেরিয়ে আসার কথা থাকলেও নানা অজুহাতে এসব কেন্দ্রের চুক্তি বারবার নবায়ন করা হচ্ছে। সরকার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের বাড়তি সুবিধা দিতেই মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নোয়াপাড়া ১০৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রের উদ্যোক্তা কোয়ান্টাম পাওয়ারের কাছে পিডিবির পাওনা ৩০৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। কোয়ান্টাম পাওয়ার আসবাবপত্র প্রস্তুতকারক অটবি গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। বিলম্বে উৎপাদনে আসা, চুক্তি অনুসারে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ দিতে না পারা এবং চাহিদার অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করায় কোয়ান্টামকে পাওয়ার জরিমানা করে পিডিবি। কেন্দ্রটির চুক্তির মেয়াদ গত বছরের ২৫ আগস্ট শেষ হয়েছে।

কাটাখালী ৫০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রের মালিক নর্দান পাওয়ার সলিউশনের কাছে পিডিবির পাওনা ১০০ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। নর্দান পাওয়ার সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হকের মালিকানাধীন এনা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। বিলম্বে উৎপাদনে আসায় নর্দান পাওয়ারকে জরিমানা করা হয়। বর্তমানে এ জরিমানার পরিমাণ ৭১ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

এ ছাড়া চাহিদার অতিরিক্ত জ্বালানি তেল নেওয়ায় জরিমানা হয়েছে ২৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। পাওনা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়টি বর্তমানে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে। ৫ বছর মেয়াদি এই কেন্দ্রের চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ২১ এপ্রিল শেষ হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here