সিনিয়র রিপোর্টার : বর্তমানে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের মোট বিলের ওপর ৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আদায় করা হয়। আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হলে এ পদ্ধতি বাতিল হবে। নতুন আইন অনুসারে ইউনিটপ্রতি মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত করে বিদ্যুতের খুচরা মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ও বিদ্যুৎ বিভাগ মনে করছে এর ফলে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে।

অবশ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বলছে, নতুন আইনের কারণে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না। কেননা, বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যায়ে যে ভ্যাট পরিশোধ করা হবে তা রেয়াত নেওয়ার বিধান রয়েছে। ফলে বর্তমানে ভ্যাটসহ এক ইউনিট বিদ্যুতের যে মূল্য দাঁড়ায়, নতুন আইনে তা সরবরাহ মূল্য হিসেবে ঘোষণা করলেই হবে। তবে এনবিআরের এ ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নয় বিদ্যুৎ বিভাগ।

তারা মনে করছে, নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করতে হলে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম বাড়াতেই হবে। এদিকে গ্যাসের ক্ষেত্রে এখনই ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য হওয়ায় নতুন আইনে এর কোনো প্রভাব পড়বে না।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি আইন ২০০৩ অনুসারে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর আইনি এখতিয়ার শুধু বিইআরসির। সংস্থাটি বলছে, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ১ জুলাইয়ের মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো সম্ভব নয়। ফলে নতুন ভ্যাট আইনে বিদ্যুতের দাম কীভাবে সমন্বয় করা যাবে তা নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির একটি প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান। এর মধ্যে নতুন ভ্যাট আইনের কারণে আবার দাম বাড়লে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। শিল্পকারখানাগুলোর সংকট বাড়বে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ নতুন ভ্যাট আইনের বিরূপ প্রভাবের কথা স্বীকার করে বলেন, তারা বিদ্যুতে অতিরিক্ত ভ্যাট আরোপ না করার জন্য সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে সুপারিশ করেছেন।

বিইআরসির সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া বিদ্যুতের দাম বাড়ানো সম্ভব নয়। এরই মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর একটি প্রক্রিয়া চলমান। এর মধ্যে ভ্যাটের ইস্যুটি এসে পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে।

তিনি আরও বলেন, ভ্যাট কত শতাংশ কার্যকর হবে তা বাজেট পাসের আগে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তাই ১ জুলাই নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হলেও বিদ্যুতের ক্ষেত্রে তা কার্যকর করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া ভ্যাট আইনটি সম্পর্কে বিতরণ কোম্পানিসহ সংশ্লিষ্টদের ধারণা পরিষ্কার নয়। নতুন আইন কার্যকরের বিষয়টি তিন থেকে ১২ মাস পিছিয়ে দেওয়ার জন্য তারা এনবিআরকে পরামর্শ দিয়েছেন। এর মধ্যে সবার সঙ্গে আলোচনা করে একটি উপায় বের করা সম্ভব হবে।

নতুন ভ্যাট আইনের জটিলতার বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) এক কর্মকর্তা বলেন, এখন কোনো গ্রাহকের মাসিক বিদ্যুৎ খরচ ৫০০ টাকা হলে ৫ শতাংশ হারে এর ওপর ভ্যাট ২৫ টাকা। ফলে মাসিক বিল দাঁড়ায় ৫২৫ টাকা। নতুন আইনে এভাবে ভ্যাট আদায় করা যাবে না। অর্থাৎ ৫০০ টাকার সঙ্গে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট ধরে ৭৫ টাকা নেওয়া যাবে না। ভ্যাটসহ বিদ্যুতের সর্বোচ্চ বিক্রয় মূল্য (এমআরপি) নির্ধারণ করতে হবে।

ধরা যাক, গ্রাহকের ব্যবহৃত এক ইউনিট বিদ্যুতের দর ৬ টাকা। এ ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত করে ইউনিটের খুচরা দাম নির্ধারণ করা হবে ৬ টাকা ৯০ পয়সা। কিন্তু ডিপিডিসি বা পিডিবি এমনকি বিদ্যুৎ বিভাগের এই দাম নির্ধারণের ক্ষমতা নেই।

এনবিআর গত ২৫ মে নতুন ভ্যাট আইনের ব্যাখ্যাসহ একটি চিঠি বিদ্যুৎ সচিবের কাছে পাঠায়। এতে বলা হয়, পুরনো আইনে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত সব উপকরণ যেমন গ্যাস, কয়লা, তেল প্রভৃতি কেনার সময় ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। আবার বিতরণ পর্যায়ে ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপিত হয়। ফলে ক্রেতারা প্রত্যক্ষভাবে ৫ শতাংশ এবং পরোক্ষভাবে ১৫ শতাংশ কর দিতে থাকে। নতুন আইনে এই বিচ্যুতি দূর করা হয়েছে।

ফলে ভোক্তা পর্যায়ে দাম না বাড়িয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ কাঙ্ক্ষিত মূসক পরিশোধ করতে পারবে। বিপরীতে কোম্পানিগুলো উৎপাদন পর্যায়ে যে ভ্যাট দেয় (উপকরণ কর) তা রেয়াত পাবে। আবার উৎপাদন পর্যায়ে পরিশোধিত ভ্যাটের অর্থ যদি খুচরা পর্যায়ে আদায় করা ভ্যাটের চেয়ে বেশি হয় তাহলে বাড়তি অর্থ ফেরতও পাবে। এতে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ কমবে।

বিদ্যুৎ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এনবিআরের ব্যাখ্যার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন, তাদের হিসাব বলছে, উৎপাদন ক্ষেত্রে রেয়াত নেওয়ার পরও প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম প্রায় ৮ শতাংশ বাড়াতে হবে। বিদ্যুতের দাম বাড়াতে পারে শুধু বিইআরসি। তাই এ ক্ষেত্রে করণীয় ঠিক করতে তারা এনবিআর ও বিইআরসির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।

সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের একমাত্র ক্রেতা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবি। তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কিনে গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহ করে বিতরণ কোম্পানিগুলো।

পিডিবি বলছে, নতুন আইনে ভ্যাট আদায়ের পরিমাণ দাঁড়াবে বছরে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। তেল, গ্যাস, কয়লা, মূলধনী যন্ত্রপাতি ব্যবহারে তারা ৭০০ কোটি টাকার মতো রেয়াত পাবে। ফলে প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকার ওপর ঘাটতি থাকবে। ভ্যাট যুক্ত করার পর প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম না বাড়ালে এই বাড়তি অর্থ জোগান দেওয়া যাবে না। বিষয়টি এরই মধ্যে পিডিবির পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ বিভাগসহ সরকারের ওপরের মহলে জানানো হয়েছে।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে সর্বশেষ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। কনজুমার অ্যাসোসিয়েশনের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, যেসব দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেশি, তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির মতো জরুরি পণ্যে ভ্যাট আদায় করা হয়। আমাদের এখানে এসব পণ্যের ওপর ভ্যাট ধার্য করা কতটা যৌক্তিক তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি জানান, ভারতের অনেক রাষ্ট্রে বিদ্যুতের ওপর শূন্য ভ্যাট রয়েছে। আমাদের দেশেও তাই হওয়া উচিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here