তবুও নদী ভরাট করে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে ডরিন পাওয়ার

0
567
বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। অনুমোদন না থাকলেও ধলেশ্বরী নদীর কিছু অংশ ভরাট করেছে ডরিন পাওয়ার।

ডেস্ক রিপোর্ট : মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার মধ্যদিয়ে প্রবাহিত ধলেশ্বরী নদীর একটি অংশ এরই মধ্যে ভরাট করেছে ডরিন পাওয়ার। উপজেলার ধল্লা ইউনিয়নের ফোর্ডনগর গ্রামে ধলেশ্বরীর ওই অংশ দখল করেই চলছে প্রতিষ্ঠানটির ১৬২ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। কেন্দ্রটি নির্মাণে  পরিবেশ ছাড়পত্রও নেয়নি ডরিন পাওয়ার।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ফোর্ডনগর গ্রামের ৬৭২ মৌজায় প্রায় সাড়ে ১১ একর জমি বালি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে, যা নদীর সীমানা নির্ধারণী ভাষাশহীদ রফিক সেতু থেকে প্রায় ২০০ মিটার নদীগর্ভে। শুধু নদী দখল নয়, ফোর্ডনগর গ্রামের পানি নিষ্কাশনের জন্য যে কালভার্ট, তাও ভরাট করা হয়েছে বালি ফেলে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যাচ্ছে নদীরক্ষা বাঁধের ভেতরের ঘরবাড়ি।

নদী দখল বন্ধে ও সরকারি জমি রক্ষায় গত ৪ জুন জাতীয় নদীরক্ষা কমিশন বরাবর লিখিত অভিযোগ করে ওই গ্রামের তিন শতাধিক পরিবার। স্থানীয়দের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৬ জুন সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করে নদী কমিশন। সরেজমিন নদী দখলের দৃশ্য দেখে প্রকল্প বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশও দেয় নদীরক্ষা কমিশন। তথ্য সূত্র : বণিক বার্তা

ডরিন পাওয়ারের নদী দখলে বাধা দিয়েছেন বলে জানান জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার। তিনি বলেন, এ বিষয়ে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক ও সিংগাইর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়েছি। অবৈধ প্রকল্পটি বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

নদী ও খাসজমি দখলের অভিযোগে ডরিন পাওয়ারের সাবসিডিয়ারি নর্দান পাওয়ারের পরিচালক মো. মোস্তফা মঈনকে প্রধান আসামি করে পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে ভূমি অফিস। ধল্লা ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মো. নুর ইসলাম মিয়া বাদী হয়ে গত ৩০ জুন মামলাটি করেন।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি বাধা উপেক্ষা করে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নামে ধলেশ্বরী নদীসহ ১১ একর ৩০ শতক জমিতে বালি ভরাট ও ফোরশোরভুক্ত জমিতে অবৈধভাবে জোরপূর্বক অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করে ঢাকা নর্দান পাওয়ার জেনারেশনস লিমিটেড।

এ বিষয়ে স্থানীয় ভূমি অফিসের পক্ষ থেকে একাধিকবার বাধা দেয়া হয়। সেই সঙ্গে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে জায়গা পরিমাপ করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে লাল নিশান টানিয়ে দেয়া হয়। নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয় নদী কমিশনের পক্ষ থেকেও। এ নির্দেশ অমান্যের কারণে মামলাটি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক নাজমুছ সাদাত সেলিম বলেন, আমরা এলাকা পরিদর্শন করেছি। নির্মাণকাজ বন্ধ করে নদী দখল বন্ধ করার দাবি জানিয়ে সিংগাইর থানায় মামলা করা হয়েছে। নদী ও সরকারি জমি রক্ষায় সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মামলার পরও বালি ভরাট-পরবর্তী নির্মাণকাজ চালু রয়েছে বলে সরেজমিন পরিদর্শন ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে। যদিও নদী দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেছে ডরিন পাওয়ার কর্তৃপক্ষ।

জানতে চাইলে কোম্পানির পরিচালক (উন্নয়ন) মোস্তফা মঈন বলেন, নদী দখলের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কারণ আমরা সরকারের দেয়া প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণ শেষে সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছেই বিদ্যুৎ বিক্রি করতে হবে। যদি নদী দখল হতো, তাহলে সরকার আমাদের এ প্রকল্প অনুমোদন দিত না। আর বর্ষার কারণে এখন হয়তো এটা নদী মনে হচ্ছে। তিন মাস আগেও এটি মরুভূমির মতো ছিল।

দ্য পোর্টস অ্যাক্ট-১৯০৮ অনুযায়ী, নদীর তীর থেকে তলদেশ পর্যন্ত পানিতে নিমজ্জিত ভূমি নদী বলে বিবেচিত। সিএস পর্চাতেও নদীর সীমা নির্ধারণ করা আছে। সে অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে যে পর্যন্ত পানি থাকে এবং বর্ষাকালে নদীর তীরের যে পর্যন্ত পানি পৌঁছায় তার সবটুকুই নদী এলাকা বলে বিবেচিত। এ আইন লঙ্ঘন করেই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করছে ডরিন পাওয়ার।

প্রকল্পটির জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কোনো ছাড়পত্রও নেয়নি ডরিন পাওয়ার। ছাড়পত্রের জন্য কোনো আবেদন তারা পাননি বলে নিশ্চিত করেছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিবেশগত ছাড়পত্র) সৈয়দ নাজমুল আহসান।

পরিবেশ ছাড়পত্রের বিষয়ে মোস্তফা মঈন বলেন, ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের আওতায় আমরা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করছি। নয় মাসের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করতে হবে। কিন্তু পরিবেশ ছাড়পত্র পেতে তিন থেকে চার মাস লেগে যায়। তবে সাইট ক্লিয়ারেন্সের আবেদন করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায় ১৬২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগে প্রস্তাব দেয় ডরিন পাওয়ার। পরে গত বছরের নভেম্বরে কোনো দরপত্র আহ্বান ছাড়াই ‘দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বিশেষ আইনে’ প্রতিষ্ঠানটিকে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক এ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ।

মানিকগঞ্জ পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেড নামে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ডরিন পাওয়ার নির্মাণ করলেও এ প্রকল্পের অংশীদার হিসেবে স্থানীয় সংসদ সদস্য নাঈমুর রহমান দুর্জয় রয়েছে বলে জানা গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here