ঢাকা ব্যাংকের ৫ শতাংশ শেয়ার কিনছে ন্যাশনাল ব্যাংক

0
431

সিনিয়র রিপোর্টার : বেসরকারি ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের ৫ শতাংশ শেয়ার কিনে নিচ্ছে ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড (এনবিএল)। বাজারদরে এ শেয়ার কিনবে এনবিএল। দুই ব্যাংকের পর্ষদে পাস হওয়ার পর শেয়ার কেনাবেচার বিষয়টি অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানোও হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অনুমোদন পেলেই এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে ব্যাংক দুটির নীতিনির্ধারকরা নিশ্চিত করেছেন। তবে এ বিষয়ে দুটি ব্যাংকের কেউ নাম উদ্ধৃত করে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

দেশে বেসরকারি ব্যাংক খাতের ৪১টি ব্যাংকের মধ্যে দেশী-বিদেশী ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ আছে। দেশী-বিদেশী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগও রয়েছে কোনো কোনো বেসরকারি ব্যাংকে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে কোনো বেসরকারি ব্যাংকের আরেকটি বেসরকারি ব্যাংকের ৫ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয়ার ঘটনা দেশে এই প্রথম।

কয়েক বছর ধরেই সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ন্যাশনাল ব্যাংক। খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণও করতে পারছে না ব্যাংকটি। এজন্য অনেক বছর ধরেই বোনাস শেয়ার ইস্যু করতে হচ্ছে ব্যাংকটিকে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিটি শেয়ার বিক্রি হচ্ছে অভিহিত মূল্য ১০ টাকারও নিচে। এ ব্যাংকটিই এখন ঢাকা ব্যাংকের ৫ শতাংশ শেয়ার কেনার উদ্যোগ নিয়েছে।

মূলত শেয়ার কেনার মাধ্যমে ঢাকা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে আসতে চাচ্ছে ন্যাশনাল ব্যাংকসংশ্লিষ্টরা। ন্যাশনাল ব্যাংকের একক নিয়ন্ত্রণ রয়েছে জয়নুল হক সিকদার ও তার পরিবারের। ঢাকা ব্যাংকের শেয়ার কিনে ব্যাংকটিতে সিকদার পরিবারের আধিপত্য তৈরির প্রক্রিয়া চলছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে ১৯৯৫ সালের ৫ জুলাই যাত্রা করে ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড। ২০০০ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয় ব্যাংকটি।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট শেয়ার সংখ্যা ছিল ৮১ কোটি ২৫ লাখ ৮২ হাজার ৬৮৫টি। এর মধ্যে স্পন্সরদের হাতে ছিল ৪০ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার। ব্যাংকটির শেয়ারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ রয়েছে ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ। বাকি ৪৭ দশমিক ১৮ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে। তবে ঢাকা ব্যাংকের শেয়ারে সরকারি ও বিদেশী কোনো বিনিয়োগ নেই।

ঢাকা ব্যাংকের ৫ শতাংশ শেয়ারের সংখ্যা হলো ৪ কোটি ৬ লাখ ২৯ হাজার ১৩৪টি। গত বৃহস্পতিবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ব্যাংকটির প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ছিল ১৪ টাকা ৫০ পয়সা। বাজারদরে ৫ শতাংশ শেয়ার ন্যাশনাল ব্যাংক কিনলে প্রয়োজন হবে প্রায় ৫৯ কোটি টাকা। যদিও বৃহস্পতিবার ঢাকা ব্যাংকের শেয়ারদর ছিল ঊর্ধ্বমুখী।

ঢাকা ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণ ও বিনিয়োগ ছিল ১৯ হাজার ২৫ কোটি টাকা। অন্যান্য সম্পদ মিলিয়ে মোট ২৮ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকার ব্যাংক এটি। সম্পদের বিপরীতে ব্যাংকটির মোট দায় রয়েছে ২৬ হাজার ৮২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে গ্রাহকদের রয়েছে ২০ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ৪৩ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে ব্যাংকটি। ২০১৮ সালে ৬৬৬ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফার বিপরীতে ১৪০ কোটি টাকা নিট মুনাফা পায় ঢাকা ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে ঢাকা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৭২০ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট বিতরণকৃত ঋণের ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। একই সময়ে ঢাকা ব্যাংক ৩০৯ কোটি টাকা সঞ্চিতি ঘাটতিতে ছিল।

ঢাকা ব্যাংক লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস। ব্যাংকটির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের মধ্যে ছিলেন মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাসও। যদিও তাদের দুজনই এখন ব্যাংকটির পর্ষদের বাইরে। এ দম্পতির সন্তান মির্জা ইয়াসির আব্বাস রয়েছেন ঢাকা ব্যাংকের পর্ষদে। বর্তমানে ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন ব্যবসায়ী রেশাদুর রহমান।

দেশের প্রথম প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে ১৯৮৩ সালে যাত্রা করে ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেড। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের আর্থিক খাতে ভালো অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিল ব্যাংকটি। যদিও এক যুগ ধরে ধারাবাহিক অবনমন হচ্ছে ব্যাংকটির ব্যালান্সশিট ও করপোরেট সুশাসনে। পরিচালন ব্যর্থতা ও অনিয়মের কারণে আর্থিকভাবেও দুর্বল হয়ে পড়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক।

২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ২ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। একই সঙ্গে স্বাভাবিক পন্থায় আদায় অযোগ্য হওয়ায় অবলোপন করা হয়েছে ১ হাজার ৭২৬ কোটি টাকার ঋণ। সব মিলিয়ে ব্যাংকটির ৬ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা আটকে গেছে মামলায়। বড় অংকের খেলাপি ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে পারছে না ন্যাশনাল ব্যাংক।

২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির সঞ্চিতি সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল ২ হাজার ৭০২ কোটি টাকার। এর বিপরীতে সংরক্ষণ করতে পেরেছে ১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। এ হিসাবে ন্যাশনাল ব্যাংকের সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণ ১ হাজার ২৭৮ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ঘাটতি সঞ্চিতি সংরক্ষণের অনুমোদন নিয়েছে ব্যাংকটি। যদিও এর আগে একাধিকবার সঞ্চিতি সংরক্ষণের জন্য সময় নিয়েও সে প্রতিশ্রুতি পালন করতে পারেনি ন্যাশনাল ব্যাংক। ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদনেই এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রভিশন সংরক্ষণ না করে প্রতি বছরই কৃত্রিম মুনাফা দেখাচ্ছে ন্যাশনাল ব্যাংক। ২০১৮ সালেও ৩৮৫ কোটি টাকা নিট মুনাফা দেখিয়েছে ব্যাংকটি। যদিও এক যুগের বেশি সময় ধরে ব্যাংকটি শেয়ারহোল্ডারদের নগদ কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। ধারাবাহিকভাবে বোনাস শেয়ার ইস্যু করছে ব্যাংকটি। গত বৃহস্পতিবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ছিল ৯ টাকা ৬০ পয়সা। ব্যাংকটির শেয়ারের অভিহিত মূল্য ১০ টাকা।

চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ন্যাশনাল ব্যাংকের মোট শেয়ার ছিল ২৬৫ কোটি ৪৯ লাখ ৭ হাজার ৯১৩টি। এর মধ্যে স্পন্সরদের হাতে শেয়ার ছিল ৩২ দশমিক ৪১ শতাংশ। ব্যাংকটিতে সরকারি কোনো বিনিয়োগ না থাকলেও ২ দশমিক ৫০ শতাংশ বিদেশী বিনিয়োগ রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ রয়েছে ১৭ দশমিক ৭০ শতাংশ। বাকি ৪৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে।

ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন সিকদার গ্রুপের কর্ণধার জয়নুল হক সিকদার। ব্যাংকটির নীতিনির্ধারণী প্রায় সব পদই এ পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। বর্তমানে ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালক পদে রয়েছেন জয়নুল হক সিকদারের স্ত্রী মনোয়ারা সিকদার।

নির্বাহী কমিটি (ইসি) ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন জয়নুল হক সিকদারের কন্যা পারভীন হক সিকদার। এছাড়া চেয়ারম্যানের দুই পুত্র রিক হক সিকদার ও রন হক সিকদারও রয়েছেন পর্ষদে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here