ডুবছে লিবরা ইনফিউশনস

0
687
সিনিয়র রিপোর্টার : ব্যাংকঋণের সদ্ব্যবহার করতে না পারায় বড় ধরনের সংকটে পড়েছে ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লিবরা ইনফিউশনস লিমিটেড। এর ওপর ঋণের সুদ গুনতে গিয়ে লোকসানে পড়েছে কোম্পানিটি। ওষুধ বিক্রিও কমেছে।
কোম্পানিটি সব মিলিয়ে আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। লিবরা ইনফিউশনসের প্রথম প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এ চিত্র উঠে আসে।

জানা গেছে, ২০০৯ সালে লিবরা ইনফিউশনস তাদের প্রথম ইউনিটের চলতি মূলধন জোগানো ও দ্বিতীয় ইউনিট সম্প্রসারণের জন্য ব্যাংকঋণ নেয়ার ঘোষণা দেয়। এজন্য পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ থাকলেও সেটি গ্রহণ না করে ব্যাংকের সাহায্য নেয় কোম্পানি। এরই অংশ হিসেবে লিবরা ইনফিউশনস ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক থেকে ৬০ কোটি ২৮ লাখ টাকা ঋণ নেয়। তবে ঋণ নেয়া হলেও সম্প্রসারণ কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি তারা। এতেই বিপাকে পড়ে কোম্পানিটি।

চলতি হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে পণ্য বিক্রি থেকে লিবরা ইনফিউশনসের আয়ের ২৮ শতাংশই ব্যয় হয়েছে ঋণের সুদ পরিশোধে। ঋণের সুদসহ অন্যান্য চার্জ পরিশোধ করতে গিয়ে লোকসানে পড়ে কোম্পানি। ঋণ সংকটের মধ্যেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কোম্পানি মুনাফায় ছিল। সর্বশেষ হিসাব বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেয়ারও সুপারিশ করেছে পরিচালনা পর্ষদ। তবে বড় অঙ্কের সুদ পরিশোধের পাশাপাশি বিক্রি কমে যাওয়ায় এবার লোকসানে পড়েছে কোম্পানিটি।

প্রথম প্রান্তিকে লিবরা ইনফিউশনসের শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৭ টাকা ৬৬ পয়সা; যেখানে আগের বছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) ছিল ১ টাকা ৩৮ পয়সা।

জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেয়া যায়, এ সময়ে কোম্পানির ওষুধ বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ২৮ শতাংশ কমে গেছে। চলতি প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানির ওষুধ বিক্রি হয়েছে ৫ কোটি ৬১ লাখ টাকার। এ সময়ে মোট মুনাফা হয়েছে ২ কোটি ১০ লাখ টাকা।

এদিকে বিক্রি কমলেও প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানির বিক্রয়, বিপণন ও বিতরণ খরচ আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে। ২০১৪-১৫ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানির বিক্রয়, বিপণন ও বিতরণ খরচ ছিল মোট বিক্রির প্রায় ১৫ শতাংশ; চলতি প্রথম প্রান্তিকে যা ২০ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। প্রশাসনিক খরচও সামান্য বেড়েছে। পণ্য বিক্রি কমলেও কোম্পানির পরিচালন ব্যয়ে তেমন পরিবর্তন হয়নি।

চলতি প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানির পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৬৮ লাখ টাকা; যা আগের বছর একই সময়ে ছিল ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংকঋণের সুদবাবদ খরচ হয়েছে ১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। ফলে চলতি প্রথম প্রান্তিকে কোম্পানির কর-পূর্ববর্তী লোকসান দাঁড়িয়েছে ৯০ লাখ ৭২ হাজার টাকা। আর কর-পরবর্তী এ লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ লাখ ৮৩ হাজার টাকা।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত লিবরা ইনফিউশনসের কাছে কম্পোজিট বিনিয়োগ সুবিধার আওতায় আসল, মুনাফা ও অন্যান্য চার্জসহ আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ৮৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। যথাসময়ে সে ঋণের নির্ধারিত কিস্তি পরিশোধেও ব্যর্থ হয় কোম্পানিটি।

ঋণ পরিশোধের ব্যর্থতায় গত ১ অক্টোবর লিবরা ইনফিউশনসের জমি, ভবন ও মেশিনারিজসহ বন্ধকি সম্পদ বিক্রি করে অর্থ আদায়ের জন্য নিলামের উদ্যোগ নেয় ব্যাংক। পরবর্তীতে ব্যাংক উচ্চ আদালতের আদেশে নিলাম প্রক্রিয়া স্থগিত করে।

উল্লেখ্য, রূপনগর শিল্প এলাকায় কোম্পানির ১৬৯ শতাংশ জমি ও জমির ওপর তিনটি বহুতল ভবন ও কারখানা রয়েছে।

আল-আরাফাহ্ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালে লিবরা ইনফিউশনস কারখানা সম্প্রসারণের ঘোষণা দেয়। ব্যাংকঋণের মাধ্যমে দ্বিতীয় ইউনিট চালুর উদ্যোগ নেয় কোম্পানিটি। এরই অংশ হিসেবে সে সময় অগ্রণী ব্যাংকে কোম্পানির ২০ কোটি ৭৫ লাখ টাকার ঋণ টেকওভার করে আল-আরাফাহ্ ব্যাংক। পরবর্তীতে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কোম্পানিকে ফান্ডেড ও নন ফান্ডেড মিলিয়ে মোট ৬০ কোটি ২৮ লাখ টাকার ঋণ দেয়া হয়। তবে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের ব্যর্থতায় কোম্পানিটি পরবর্তীতে খেলাপি হয়ে পড়ে।

ঋণ সংকটের মধ্যেও সর্বশেষ হিসাব বছরের জন্য কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের ২০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। ৩০ জুন ২০১৫ সমাপ্ত হিসাব বছরে লিবরা ইনফিউশনসের ইপিএস ছিল ৩ টাকা ৪৪ পয়সা ও শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) ১ হাজার ৫৭৩ টাকা। চলতি প্রথম প্রান্তিকে এনএভিপিএস কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৬৫ টাকা।

১৯৮৫ সালে বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসা লিবরা ইনফিউশনস ১৯৯৪ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। কোম্পানির মোট শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা-পরিচালকের হাতে ৪৮ দশমিক ২৮ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে বাকি ৩৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গতকাল সর্বশেষ ২৮৮ টাকায় এ কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়। গত এক বছরে এর দর ২৮৩ থেকে ৪৪৮ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here