ডলার ছেড়েও দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি বাংলাদেশ ব্যাংক

0
392

বিশেষ প্রতিনিধি : বাজারে ডলার ছেড়েও দাম নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। চলতি অর্থবছরের প্রথম থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দেড়শ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমদানি ব্যয় বাড়ার বিপরীতে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ কম হওয়ায় ডলার বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে কোনো কোনো ব্যাংক ডলার ধরে রেখে ব্যবসা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

যদিও এই মুহূর্তে ব্যাংকগুলোর আয়ের একটি বিশেষ অংশই ডলার কেনাবেচা থেকে হচ্ছে। গত বছরের নভেম্বর মাসে ডলার নিয়ে কারসাজির অভিযোগে তিনটি বিদেশি ও ১৭টি দেশীয় ব্যাঙ্ককে সতর্ক করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারপরও ডলারের দাম নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

সূত্র মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম থেকে এ পর্যন্ত প্রায় দেড়শ কোটি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অথচ গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বিক্রি করেছিল মাত্র ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার। বিপরীতে কিনেছিল ১৯৩ কোটি ১০ লাখ ডলার। গত কয়েক মাসে বাজারে প্রচুর ডলার ছেড়ে দাম ঠিক রাখার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য গত দুই-তিন মাসে দাম ব্যাপকহারে না বাড়লেও ডলারের দাম ক্রমাগত বাড়ছে। এক বছর আগের চেয়ে এখন বেড়েছে প্রায় চার টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, আন্তঃব্যাংক দরের সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ডলারপ্রতি আরো প্রায় দেড় টাকা বেশি রাখছে। ঈদের আগে সর্বশেষ কার্যদিবসে বৃহস্পতিবার ডলারের আন্তঃব্যাংক দর ছিল ৮২.৯২ টাকা। অন্যদিকে আমদানি পর্যায়ে ব্যাংকগুলোর ডলারের দর ছিল সর্বোচ্চ ৮৩.৪০ টাকা। ওই দিন বেশিরভাগ ব্যাংকেরই নগদ ডলারের দর ছিল ৮৪ থেকে ৮৫ টাকার মধ্যে। সর্বনি¤œ দর ছিল ইস্টার্ন ব্যাংকে, ৮৩ টাকা।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং দেশের বৈদেশিক লেনদেনে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় ডলারের চাহিদা বাড়ছে। চাহিদা পূরণ করতে পর্যাপ্ত ডলারের জোগান দিতে গিয়ে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে ব্যাংকগুলোকে।

এই অবস্থায় সম্প্রতি বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে নিয়োজিত অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক বাণিজ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সম্প্রতি ডলারের দর বাড়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

সংস্থাটি ডলারের দর যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে বলে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত ডলার কিনে রাখতে নিষেধ করে। প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক এতে হস্তক্ষেপ করবে বলে ব্যাংকগুলোকে জানানো হয়। তবে মুক্তবাজার অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে ডলারের দরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হস্তক্ষেপ করুক তা চায় না বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের মতে, ডলারের চাহিদা বাড়লে দাম বাড়বে, আর চাহিদা কমলে দাম কমবে। এটাই স্বাভাবিক। তাই ডলারের দর বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়াই ভালো। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ করা ঠিক নয় বলে তারা মনে করেন।

বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস এসোসিয়েশনের (বাফেদা) চেয়ারম্যান সোনালী ব্যাংকের সিইও ও এমডি মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, আমদানি বাড়লে ডলারের দাম বেড়ে যায়। ব্যাংকগুলোতে ঋণপত্র খোলার তুলনায় নিষ্পত্তি কম। চাহিদার তুলনায় জোগানের স্বল্পতার কারণে দর বাড়ছে।

সূত্রমতে, চলতি অর্থবছরের ছয় মাসেই এলসি খোলার পরিমাণ ৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বছর শেষে এই অঙ্ক ৬০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। আমদানি বাড়ার কিছু ক্ষেত্র যেমন বড় উন্নয়ন প্রকল্পের যন্ত্রাংশ উপকরণ আমদানি বেড়েছে। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ২৬ শতাংশ।

যেখানে রপ্তানি আয় বেড়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এই সময়ে খাদ্য (চাল ও গম) আমদানি বেড়েছে ২১২ শতাংশ। শিল্প স্থাপনের প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। জ্বালানি তেলের আমদানি বেড়েছে ২৮ শতাংশ এবং শিল্পের কাঁচামালের আমদানি বেড়েছে ১৫ শতাংশের বেশি।

জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৭৬ কোটি ৭০ লাখ ডলারে। তবে রেমিট্যান্স প্রবাহে বর্তমানে বেশ কিছুটা বৃদ্ধির ধারা বিরাজ করছে। জুলাই-জানুয়ারি সময়ে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে প্রায় ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে তিন হাজার ২৭৬ কোটি ডলারের বেশি বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে।

ডলারের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর কাছে ১৫০ কোটির বেশি ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে ব্যাংকের মতো মানি এক্সচেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ডলারের দর বেড়েছে।

জানা গেছে, গত সপ্তাহে বিভিন্ন মানিচেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোতে এক ডলার বিক্রি হয়েছে ৮৫ টাকায়। এ বিষয়ে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখত বলেন, পদ্মা সেতু, মেট্রো রেলসহ বেশ কিছু বড় প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব প্রকল্পের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানিতে অনেক খরচ হচ্ছে। গত বছর বন্যায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় খাদ্যশস্য আমদানি অনেক গুণ বেড়েছে। তা ছাড়া দেশের শিল্প খাতে বিনিয়োগেও কিছুটা গতি এসেছে; কিন্তু সে তুলনায় রপ্তানি আয় না বাড়ায় ডলারের চাহিদা বেড়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here