‘টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে’এগিয়ে চলছে এনসিসি ব্যাংক

0
883

এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ। গত বছরের আগস্ট থেকে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। সম্প্রতি এনসিসি ব্যাংকসহ দেশের সার্বিক ব্যাংকিং খাত নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন -হাছান আদনান

  • এনসিসি ব্যাংক কেমন চলছে?

প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পূর্ণ করে কাল ২৬ বছরে পদার্পণ করছে এনসিসি ব্যাংক। আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চলার সময়টুকু ধরলে ৩২ বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ধারণ করে এনসিসি ব্যাংক এগিয়ে চলছে। কয়েক বছর ধরে আমরা সবক’টি প্যারামিটারে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি করেছি। ২০১৭ সাল শেষে এনসিসি সাড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা সম্পদের একটি ব্যাংক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ১০৯টি শাখা, ৭৪টি এটিএম ও ২ হাজার ১৪৬ জন ব্যাংকার নিয়ে আমরা গ্রাহকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। এনসিসি ব্যাংক পর্ষদের প্রত্যাশা হলো, কমপ্লায়েন্স রক্ষা করে এগিয়ে যাওয়া। আমরা সে পথে এগোচ্ছি।

  • সমসাময়িক অন্য ব্যাংকের তুলনায় ব্যাংকিং মডেলে এনসিসি ব্যাংক পিছিয়ে রয়েছে। আর্থিকপ্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাংকে রূপান্তরিত হওয়াই কি এর কারণ?

৩২ বছর আগের পৃথিবী আর বর্তমান পৃথিবী এক নয়।  প্রযুক্তির উন্নয়নসহ সব ক্ষেত্রেই যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই ব্যাংকিং মডেলে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। লিজিং কোম্পানি হিসেবে চলাকালে নিয়োগ দেয়া কর্মী নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে এনসিসি ব্যাংক।

এনসিসি ব্যাংকে অনেক ক্ষেত্রেই আধুনিকায়ন হয়েছে। প্রধান কার্যালয়ের জন্য সর্বাধুনিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। যুগোপযোগী প্রযুক্তির সমন্বয়ে ব্যাংককে ঢেলে সাজানো হয়েছে। প্রশিক্ষণ দিয়ে পুরনো কর্মকর্তাদের অনেককেই দক্ষ করে গড়ে তোলা হয়েছে। তার পরও কিছু কর্মী এখনো তেমন দক্ষ হয়ে উঠতে পারেনি। সমসাময়িক অন্য ব্যাংকগুলো অনেক কর্মী ছাঁটাই করলেও এনসিসি ব্যাংক সে পথে হাঁটেনি।

  • অনেক বেসরকারি ব্যাংকের অভ্যন্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছেপরিচালনা পর্ষদ। এক্ষেত্রে এনসিসি ব্যাংক কেমন?

এনসিসি ব্যাংক থেকে পরিচালকদের কোনো ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নেই। ব্যাংকের সব পরিচালকই নিজ নিজ স্থানে সুপ্রতিষ্ঠিত। এ কারণে ব্যাংক থেকে তাদের কোনো কিছু পাওয়ার চেষ্টা বা তদবিরও নেই। সাম্প্রতিক সময়ে পত্রিকা খুললেই দেশের কোনো কোনো ব্যাংক সম্পর্কে নেতিবাচক সংবাদ দেখা যায়। কিন্তু আমি গর্ব করে বলতে পারি, গত এক বছরের পত্রিকায় এনসিসি ব্যাংক সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশিত হয়নি।

এনসিসি ব্যাংকের ব্যালান্সশিটের বাইরে কোনো গোপন ঋণ পাওয়া যাবে না। কলেবরের তুলনায় পর্ষদ সদস্যরা এখন ব্যাংকের মানের দিকেই বেশি নজর দিচ্ছেন। তবে আমরা রাতারাতি পরিবর্তন চাই না। টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনা নিয়ে আমরা সর্বাধুনিক হতে চাই। প্রতিষ্ঠান হিসেবে এনসিসি ব্যাংক ৩২ বছর পার করে এসেছে। এনসিসি ব্যাংক যাতে আগামী ১০০ বছরেও সমস্যায় না পড়ে, সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।

এনসিসি ব্যাংক এখন সুশাসনের দিকে সবচেয়ে বেশি নজর দিচ্ছে। অতীতের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে। ব্যাংকের বিভাগীয় সব প্রধানের পদে যোগ্যদের পদায়ন করা হয়েছে। এনসিসি ব্যাংক বর্তমানে সারা দেশের সব মানুষের ব্যাংক। এনসিসি ব্যাংকের সমসাময়িক অন্য ব্যাংকগুলো ভালো অবস্থানে রয়েছে। তারা যদি পারে তাহলে আমরা পারব না কেন? এটিই এখন পর্ষদের উপলব্ধি।

  • ২৫ বছরে দেশের অর্থনীতির জন্য এনসিসি ব্যাংকের উল্লেখ করার মতো অবদানগুলো কী?

প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এনসিসি ব্যাংক দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমরা ১৪ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছি। বিশ্বের এমন কোনো রেমিট্যান্স হাউজ নেই, যার সঙ্গে এনসিসি ব্যাংক যুক্ত হয়নি। গত বছর আমাদের মাধ্যমে ৮ হাজার ৩৭২ কোটি টাকার আমদানি, ২ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকার রফতানি এবং ২ হাজার ৭০১ কোটি টাকার রেমিট্যান্স দেশে এসেছে।

এমডি ও সিইও মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ

দেশের অনেক ব্যাংকের ঋণ নির্দিষ্ট কোনো খাতে কেন্দ্রীভূত। কিন্তু এনসিসি ব্যাংকের ঋণ দেশের সব খাতে সম্প্রসারিত। ভারী শিল্প, গার্মেন্ট, জাহাজ নির্মাণ ও ভাঙা শিল্পে আমরা ঋণ দিয়েছি। একইভাবে আমাদের ঋণের ৩০ শতাংশ এসএমই খাতে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এনসিসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের কম। এসএমই খাতের বিনিয়োগকৃত ঋণে খেলাপির হার তার চেয়েও কম। এসএমই খাতে বিনিয়োগ করলেই যে খেলাপি ঋণ বাড়বে, এটি ভুল ধারণা। এনসিসি ব্যাংক এ ভুল ভাঙতে পেরেছে। এছাড়া রিটেইল ব্যাংকিংয়েও আমরা উল্লেখ করার মতো বিনিয়োগ করেছি।

কৃষি খাতে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে এনসিসি ব্যাংকের বড় সাফল্য রয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকদের আমরা সরাসরি ঋণ দিচ্ছি। লালমনিরহাটের পাটগ্রামের মতো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এনসিসি ব্যাংক শাখা খুলেছে।

দেশের স্বনামধন্য ও প্রতিষ্ঠিত অনেক ব্যবসায়ী এনসিসি ব্যাংকের বিনিয়োগে উঠে এসেছেন। তারা এখনো আমাদের ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত আছেন। সতর্কতার সঙ্গে ঋণ বিতরণ করায় জাহাজ নির্মাণ কিংবা ভাঙা শিল্পের কোনো ঋণ এনসিসি ব্যাংকের খেলাপি হয়নি। এছাড়া এনসিসি ব্যাংক সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গাগুলোতেও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে।

  • গত বছর এনসিসি ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা কমেছে। এর কারণ কী?

২০১৭ সালে এনসিসি ব্যাংক ৪৯২ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত এটি রেকর্ড। কিন্তু এবারই প্রথম বাংলাদেশ ব্যাংক রিটভুক্ত ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে বলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক্ষেত্রে কোনোভাবেই ছাড় দেয়নি। গত বছর এনসিসি ব্যাংকের প্রভিশন ছিল ৮১ কোটি টাকা। এ বছর তা বেড়ে ১৮৬ কোটি টাকা হয়েছে। তার মানে এক বছরে ১০৫ কোটি টাকার অতিরিক্ত প্রভিশন রাখতে হয়েছে। ফলে একদিকে ব্যাংকের ব্যালান্সশিট শক্তিশালী হয়েছে।

অন্যদিকে আগামী বছর চাইলে আমরা মন্দমানের খেলাপি ঋণগুলো অবলোপন করতে পারব। এর মাধ্যমে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার অনেক কমে আসবে। এ মুহূর্তে এনসিসি ব্যাংকের প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার মতো খেলাপি ঋণ আছে। এসব ঋণের বড় অংশই ২০ বছর আগের। গত তিন বছরের কোনো ঋণ খেলাপি হয়নি। এনসিসি ব্যাংকের প্রকৃত খেলাপি ঋণের হার ৩ শতাংশেরও কম।

  • আপনাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

এনসিসি ব্যাংক পরিবর্তনের ধারায় চলছে। পরিচালকরাও ব্যাংকটিকে নতুন অবয়বে দাঁড় করাতে চান। এ দিকটি সামনে রেখেই আমরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজিয়েছি। এনসিসি ব্যাংক পর্ষদ রাতারাতি চমক সৃষ্টিতে বিশ্বাসী নয়। আগামী এক শতাব্দীতেও যাতে আমাদের কোনো সমস্যায় পড়তে না হয়, সেভাবে ব্যাংককে দাঁড় করাতে চাই।

আমরা গ্রাহকদের জন্য ব্যতিক্রমধর্মী বেশকিছু প্রডাক্ট চালু করার উদ্যোগ নিয়েছি। এর মধ্যে উৎসব ঋণ, ভ্রমণ ঋণের মতো প্রডাক্ট রয়েছে। আগামীকাল এ প্রডাক্টগুলোর উদ্বোধন করা হবে।

  •  মুহূর্তে দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ কোনগুলো?

বেশ কিছুদিন ধরে আমাদের ডলারের বাজার অস্থিতিশীল। রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের বিপরীতে অনেক বেশি পরিমাণে আমদানি হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার এ বাজার আগামীতে আরো বেশি অস্থিতিশীল হতে পারে। সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এছাড়া খেলাপি ঋণ উদ্ধারে ব্যাংকগুলোকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে ফেরত দিতে হয়— এমন সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হবে।

  • আগামীর ব্যাংকিং নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

ভবিষ্যতের ব্যাংকিং হলো কাগজবিহীন ব্যাংকিং। পৃথিবীর অনেক দেশেই কাগজের মুদ্রা উঠে যাচ্ছে। আমাদেরও সে পথে হাঁটতে হবে। মানুষ এখন পকেটে করে টাকা নিয়ে বাজারে যেতে চায় না। আগামীর সবকিছুই হবে ই-কমার্সের মাধ্যমে। এজন্য ব্যাংকগুলোকে সেভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে।

ব্যাংকের সামগ্রিক কার্যক্রমে নিরাপদ প্রযুক্তির সংযোগ ঘটাতে হবে। অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের সব জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

  • সৌজন্যে- বণিক বার্তা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here