মধ্যম আয়ের দেশ গড়তে টেকসই উন্নয়নের বাজেট

0
1381

শাহীনুর ইসলাম : টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা ও মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা মাথায় রেখে বড় অঙ্কের বাজেট দিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এবারের বাজেটের দর্শন হচ্ছে প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন, সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের অগ্রযাত্রা।

অর্থমন্ত্রীর প্রস্তবনায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশ ও মানুষের জন্য ব্যয় করা হবে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। বর্তমান সরকারের এটি তৃতীয় বাজেট। উন্নয়নের পাশাপাশি ২০১৯ সালের নির্বাচনকে মাথায় রেখে এই বিশাল অঙ্কের বাজেট প্রণয়ন করেছেন অর্থমন্ত্রী। যে বাজেটে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা, মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার মানবৃদ্ধির পাশাপাশি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।

BUGGET..2016বাজেটে যোগাযোগ খাতে সর্বোচ্চ ২৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পরেই রয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত। মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৮ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ।

তবে আয়-ব্যয়ের যে ফিরিস্তি অর্থমন্ত্রী তুলে ধরেছেন, তাতে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে ৯৭ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা যার বেশির ভাগ তিনি অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ করবেন। এর পরিমাণ ৬১ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা। বাকিটা ৩৮  হাজার ৯৪৭ কোটি টাকা আসবে বৈদেশিক উৎস থেকে।

আর ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৩৯ হাজার কোটি টাকা ও সঞ্চয়পত্র থেকে ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার পরিকল্পনার কথা নতুন বাজেটে তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তবে অর্থমন্ত্রী বলছেন, ঘাটতির এই পরিমাণও মোট জিডিপির ৫ শতাংশের মধ্যেই থাকছে, যা অর্থনীতির বিবেচনায় সহনীয় বলে ধরা হয়।

প্রস্তাবিত বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ২৭ কোটি টাকা, যার এক লাখ ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা যাবে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি)। আর অনুন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটের চেয়ে ৩২ শতাংশ বেশি।

প্রস্তাবিত বাজেটের আকার বিদায়ী ২০১৫-১৬ অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে সাড়ে ১৫ শতাংশ এবং সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ২৯ শতাংশ বেশি। গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টায় স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। এর আগে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেয়া হয়।

ব্যক্তিগতভাবে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের ১০ বাজেট উপস্থাপন। আওয়ামী লীগ সরকারে অর্থমন্ত্রী হয়ে তিনি দিয়েছেন ৮টি বাজেট এবং এরশাদ সরকারে হয়ে দিয়েছেন ২টি বাজেট। এই প্রথমবার তিনি এই দুটি বাজেট উপস্থাপনের সুযোগ দেয়ায় সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের এ মেয়াদের তৃতীয় এই বাজেট উপস্থাপনা শুরু হয় দেশের অর্থনীতিতে গত সাত বছরের সাফল্যের একটি মাল্টিমিডিয়া প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তব্যে প্রস্তাবিত বাজেটের আকার বাংলাদেশের মোট জিডিপির (১৯ লাখ ৬১ হাজার ১৭ কোটি টাকা) ১৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ বলে উল্লেখ করেছেন।

অর্থাৎ টাকার অঙ্কে বাজেটের আকার বাড়লেও, জিডিপির অনুপাতে গতবারের প্রায় সমান তালেই অগ্রসর হওয়ার পরিকল্পনা করছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। গত বছর প্রস্তাবিত বাজেট ছিল জিডিপির ১৭ দশমিক ২ শতাংশ।

বাজেটের অনুন্নয়ন ব্যয়ের বড় একটি অংশ যাবে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং পেনশনে। এর সঙ্গে বিদেশি ঋণের পুঞ্জীভূত সুদ মেটানোর দায়ও রয়েছে। আর বাজেটে ব্যয় করা অর্থের ৭১ শতাংশের বেশি অর্থমন্ত্রী রাজস্ব খাত থেকে আদায়ের ল্য ঠিক করেছেন।

বাজেটে রাজস্ব আয়ের ল্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে কর হিসেবে ২ লাখ ৩ হাজার ১৫২ কোটি টাকা আদায় করা যাবে বলে আশা করছেন মুহিত।

এবারের বাজেটে সবচেয়ে বেশি কর আদায়ের ল্য ঠিক করা হয়েছে মূল্যসংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে, ৭২ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। এই অঙ্ক বিদায়ী অর্থবছরের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেশি।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে মূল বাজেটে ভ্যাট থেকে রাজস্ব আদায়ের ল্য ধরা ছিল ৬৪ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। ল্য পূরণ না হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৫৩ হাজার ৯১৩ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। আয়কর ও মুনাফার ওপর কর থেকে ৭১ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়ার আশা করা হয়েছে এবারের বাজেটে। বিদায়ী বাজেটে এর পরিমাণ ছিল ৬৪ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা।

এ ছাড়া নতুন বাজেটে আমদানি শুল্ক থেকে ২২ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা, সম্পূরক শুল্ক থেকে ৩০ হাজার ৭৫ টাকা, রপ্তানি শুল্ক থেকে ৪৪ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক থেকে ৪ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর ও শুল্ক থেকে ১ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছেন অর্থমন্ত্রী।

২০১৫-১৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের ল্য ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। আদায় সন্তোষজনক না হওয়ায় তা সংশোধন করে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। মোট বাজেটের অর্ধেকের বেশি আসবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিয়ন্ত্রিত কর থেকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিয়ন্ত্রিত কর ৫৯ দশমিক ৭ শতাংশ অর্থাৎ ২ লাখ ৩ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে মূল্যসংযোজন কর বা (ভ্যাট) ৩৫ দশমিক ৮ শতাংশ, আমদানি শুল্ক ১১ দশমিক ১ শতাংশ, আয়কর ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ, সম্পূরক শুল্ক ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং অন্যান্য ২ দশমিক ৯ শতাংশ।

এ ছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বহির্ভূত কর থেকে আসবে ২ দশমিক ১ শতাংশ। কর ছাড়া প্রাপ্তি ৯ দশমিক ৫ শতাংশ ও অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন থেকে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ ধরা হয়েছে। বৈদেশিক ঋণ থেকে ৯ শতাংশ ও বৈদেশিক অনুদান ধরা হয়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ।

২০১৫-১৬ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। সংশোধন করে তা ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকায় নামানো হয়। নতুন বাজেটে ব্যাংক থেকে যে ঋণ হবে বলে ধরা হয়েছে, তা বিদায়ী ২০১৫-১৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ২৩ শতাংশ বেশি। আর মূল বাজেটের চেয়ে ১ শতাংশ বেশি।

নতুন বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণের যে হিসাব মুহিত দেখিয়েছেন, তার পরিমাণ বিদায়ী মূল বাজেটের চেয়ে ৩১ শতাংশ বেশি হলেও সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৩০ শতাংশ কম। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৫৬ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৬২ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা করা হয়।

যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ : নতুন ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এবারের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৮ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে (২০১৫-১৬) বাজেটের আকার ছিল দুই লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। গতবারের চেয়ে এবার বাজেটের আকার বাড়ছে ১৪ দশমিক ৪২ শতাংশ বা ৪৫ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা।

জিডিপি প্রবৃদ্ধির ল্য ৭ দশমিক ২ শতাংশ : আগামী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির ল্য ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এই ল্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭ শতাংশ। এ সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। সূত্র জানায়, ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রপেণ দিয়েছে চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ০৫ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৮ শতাংশে নামানোর আশা : বাজেটে গড় মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৮ শতাংশে নামিয়ে আনার ল্য ঠিক করে বর্তমান সরকারের তৃতীয় বাজেট ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

বিদায়ী ২০১৫-১৬ অর্থবছরে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান এই সূচক ৬ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছিলেন মুহিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, এপ্রিল শেষে এই হার দাঁড়িয়েছে তারও কম, ৬ দশমিক ০৪ শতাংশ।

আর মাসভিত্তিক, অর্থাৎ পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে এপ্রিলে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। নতুন বাজেটে এই মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশেরও নিচে ৫ দশমিক ৮ শতাংশে নামিয়ে আনার ল্য নির্ধারণ করেছেন অর্থমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ে অনেকটাই স্বস্তিতে আছেন বলে জানিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী।

শিক্ষায় বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা : আসন্ন বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট ৪৯ হাজার ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিগত সময়ের হিসাবে সামগ্রিক শিা খাতে এটাই সর্বোচ্চ বরাদ্দ।

শিক্ষায় এ বরাদ্দ চলতি বছরের তুলনায় ১১ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরে শিা খাতে মোট বরাদ্দ ৩৭ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। যদিও ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩১ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় মিলে শিক্ষা খাতকে বিবেচনা করা হয়। তবে গত বছরের মতো এবারো প্রস্তাবিত বাজেটে শিা খাতের মধ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কেও একীভূত করে ‘শিক্ষা ও প্রযুক্তি’ খাত করা হয়েছে।

শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতেই বাজেটের সর্বোচ্চ বরাদ্দ। এ খাতে ৫২ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। যা মোট বাজেটের ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে তা ছিল প্রস্তাবিত বাজেটে ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনকূলে অনুন্নয়ন ও উন্নয়ন ব্যয় মিলিয়ে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২২ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে অনুন্নয়ন ও উন্নয়নের ব্যয় মিলিয়ে বরাদ্দ দেয়া হয়ছে ২৬ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা।

কর্পোরেট করহার অপরিবর্তিত : ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে কর্পোরেট করহার অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেটে তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর্পোরেট করহার আগের মতো ২৫ শতাংশ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে আগের মতোই তালিকাভুক্ত ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর হার ৪০ শতাংশ ও মোবাইল ফোন কোম্পানির জন্য ৪০ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া অপরিবর্তিত রয়েছে নন তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হার ৩৫ শতাংশ, মোবাইল কোম্পানির জন্য ৪৫ শতাংশ ও ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৪২.৫ শতাংশ।

এদিকে মার্চেন্ট ব্যাংকের করহার আগের মতো ৩৭.৫ শতাংশ, সিগারেট প্রস্তুতকারী কোম্পানির ৪৫ শতাংশ ও লভ্যাংশ আয়ের ওপর ২০ শতাংশ কর প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যে আড়াই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বৃদ্ধি : নতুন অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ১৭ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় ৬ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা এবং অনুন্নয়ন ব্যয় ১১ হাজার ২৫২ টাকা। যা আগের বছরের চেয়ে আড়াই হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ হয়েছিল ১৪ হাজার ৮১১ কোটি টাকা।

এর মধ্যে অনুন্নয়ন ব্যয় ছিল ৯ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় ছিল ৫ হাজার ১২১ কোটি টাকা। ১৩ হাজার ১২৬টি কমিউনিটি কিনিক চালু করা হয়েছে। দরিদ্র গ্রামীণ ও প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এর অতিরিক্ত আরো ২৩৫টি কমিউনিটি কিনিক পর্যায়ক্রমে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের টেলিমেডিসিন সেবাকেন্দ্র এবং ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের চলমান কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী স্বাস্থ্য সুরা কর্মসূচির উল্লেখ করে বলেন, পাইলট ভিত্তিতে ইতোমধ্যে সামাজিক স্বাস্থ্য সুরা কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে।

এর আওতায় প্রাথমিকভাবে দরিদ্র জনসাধারণ স্বাস্থ্য কার্ডের মাধ্যমে বিনা মূল্যে উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবা পাবেন। এ কর্মসূচি সফল হলে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে চালু হবে। এর পাশাপাশি গরিব, দুস্থ ও গর্ভবতী মহিলাদের জন্য মাতৃস্বাস্থ্য ভাউচার কর্মসূচি চালু থাকবে বলে জানান মুহিত।

যুদ্ধাহত ও খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ছে : যুদ্ধাহত ও খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

অর্থমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে জেলা ও উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পোষ্যদের অনুকূলে বিভিন্ন আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রশিণ প্রদানের পাশাপাশি ঘূর্ণায়মান তহবিল থেকে ক্ষুদ্রঋণ প্রদান করা হচ্ছে। এ ছাড়া সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।

খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বীরশ্রেষ্ঠ ১২ হাজার টাকা, বীরউত্তম ১০ হাজার, বীরবিক্রম ৮ হাজার ও বীরপ্রতীক ৬ হাজার টাকা মাসিক ভাতা পান। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’ ক্যাটাগরিতে আলাদা ভাতা পাচ্ছেন; সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা থেকে সর্বনিম্ন ৯ হাজার ৭০০ টাকা পাচ্ছেন। আর শহীদ ও মৃত মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ১৫ হাজার টাকা করে মাসিক সম্মানী ভাতা পাচ্ছে।

কৃষিতে বরাদ্দ কমেছে : নতুন অর্থবছর ২০১৬-১৭-তে সংশোধিত বাজেটে কৃষির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১১ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১২ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা বাজেটে রাখা হয়।

তিন বছরের ব্যবধানে কৃষিতে জাতীয় বাজেটে তিন হাজার ৯১ কোটি টাকা কমেছে। তিন বছর আগে ২০১২-১৩ অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ ছিল ১৪ হাজার ৮২২ কোটি টাকা। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ছিল ১০ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মোট বাজেটের মধ্যে কৃষিতে ছিল ১২ হাজার ২৩০ কোটি টাকা।

পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের প থেকে নতুন অর্থবছরের জন্য জাতীয় বাজেটে ১৩ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকার প্রস্তাব দেয়া হয়। তা সংশোধন করে করা হয় ১১ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। এদিকে সার ও সেচ কাজে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণে প্রণোদনা বাবদ ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী।

করমুক্ত আয়সীমা আড়াই লাখ টাকা অপরিবর্তিত : ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে করদাতা ব্যক্তির মোট আয়ের ওপর কর ধার্য করা হয়েছে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত। প্রথম আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত আয়ের ওপর কর দিতে হবে না। তবে এর পরের ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর কর নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ শতাংশ। এর পরবর্তী ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর করের হার ১৫ শতাংশ। পরবর্তী ৬ লাখ টাকায় এ হার ২০ শতাংশ।

৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত মোট আয়ের ওপর করের হার ২৫ শতাংশ। আর তারও ওপরে মোট আয়ের ওপর করের হার ৩০ শতাংশ থাকবে। তবে নারী করদাতা ও ৬৫ বছর বয়সী করদাতার করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির েেত্র এ করের আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা করদাতার করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা। কোনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অভিভাবকদের জন্য করমুক্ত সীমা ২৫ হাজার টাকা বেশি হবে।

ন্যূনতম কর ৩ হাজার টাকা : ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ন্যূনতম করহার ৫ হাজার, ৪ হাজার ও ৩ হাজার টাকা বহাল রাখার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অর্থমন্ত্রী বলেন, ঢাকার দুটি সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে ৫ হাজার, অন্যান্য সিটি কর্পোরেশনে ৪ হাজার ছাড়া জেলা, পৌরসভা ও অন্যান্য এলাকার কোম্পানি করদাতা ব্যতীত করদাতাদের ন্যূনতম ৪ হাজার টাকা কর দিতে হয়।

সিগারেট-বিড়িসহ সব তামাকের দাম বৃদ্ধি : বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন ট্যোবাকো কন্ট্রোলে বাংলাদেশ প্রথম স্বারকারী দেশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট প্রতিবেদনে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সিগারেটের ওপর কর আদায়ের েেত্র সরকার সিগারেটের মূল্যসীমা নির্ধারণ করে দেয়ার রীতি প্রচলিত ছিল। যা বাজার অর্থনীতিতে কাম্য নয়।

প্রতিরক্ষা খাতে ৩ হাজার ৭৪৭ কোটি বরাদ্দ বৃদ্ধি : প্রতিরক্ষা খাতে এ বছর মোট বরাদ্দ ২২ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে এ বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের চেয়ে এবার বরাদ্দ বেড়েছে ৩ হাজার ৭৪৭ কোটি টাকা।

প্রতিরক্ষা খাতে প্রতিবছরই বরাদ্দ বাড়ছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ১২ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রতিরা খাতে বরাদ্দ ছিল ১৪ হাজার ৫৬৪ কোটি টাকা।

বাজেট মন্ত্রিসভায় অনুমোদন : এর আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার বাজেট সংসদে পেশের জন্য অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। এবারের বাজেটের দর্শন প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন, সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের অগ্রযাত্রা।

জাতীয় সংসদ ভবনে বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠক শেষে বাজেট অনুমোদন দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন একাধিক মন্ত্রিপরিষদ সদস্য। বিশেষ করে বাজেটের দিনেই সংসদে বাজেট উত্থাপনের অনুমোদন দেয়ার জন্য এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here