‘এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’, টার্গেট রূপকল্প ২০৪১

0
592

রাহেল আহমেদ শানু : সুশাসন, গণতন্ত্র ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণকে অগ্রাধিকার দিয়ে ‘এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ’ নামে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা হয়েছিল ২০১৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর।

ঘোষিত ইশতেহারকে শান্তি, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জাতীয় সনদ আখ্যায়িত করে সেটিতে স্বপ্ন দেখানো হয়েছে দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের, সংসদ সদস্যদের জবাবদিহি নিশ্চিতের, ফোরজি চালু, দুর্নীতি দমন কমিশনের মতা-দতা বাড়িয়ে এর কার্যকারিতা বাড়ানো, প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গঠনের এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন কমিশনকে সংহত করার। সে সঙ্গে রয়েছে আগের বারের ইশতেহার ‘দিনবদলের সনদে’র অসমাপ্ত কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতি।

সদ্যঘোষিত বাজেটে আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো দৃশ্যমানরূপে বাস্তবায়নের প্রয়াস খুবই স্পষ্ট। জাতীয় সংসদে গতকাল বৃহস্পতিবার ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বর্তমান সরকারের তৃতীয় বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

এবারের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের এবারের বাজেটে স্বাভাবিক কারণেই সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের বিষয়টি অগ্রাধিকার পেয়েছে।

pm.. 3
সংসদে অর্থম্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী

আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও সরকারের সামনে বিদ্যমান নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার ল্যকে সামনে রেখে প্রণীত হয়েছে এ বাজেট। বিদ্যমান নানাবিধ সমস্যা ও সম্ভাবনার প্রেক্ষাপটে দেশবাসী গভীর আগ্রহ ও প্রত্যাশা নিয়ে অপো করছিল এ বাজেটের জন্য। এই বিপুল জনপ্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেছে বাজেটে। বিশেষত যোগাযোগ অবকাঠামো, কৃষি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, শিা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরার মতো বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পেয়েছে বাজেটে।

নির্বাচনী ইশতেহারে, আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত ল্য হচ্ছে জনগণের আর্থ-সামাজিক মুক্তি এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ গড়া। এ ল্েয ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত যে উন্নয়ন ও অগ্রগতি সাধিত হয়েছে তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা হবে। দলটির প্রাথমিক ল্য রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়িত করা। এ জন্য প্রণীত হয়েছে পরিপ্রেতি পরিকল্পনা ২০১০-২১।

ইশতেহারে দাবি করা হয়, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রতি হলে ২০২১ সাল নাগাদ মাথাপিছু আয় এক হাজার ৪৪ ডলার থেকে এক হাজার ৫০০ ডলার হবে, প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ শতাংশ, বিদ্যুৎ উৎপাদন ১০ হাজার মেগাওয়াট থেকে ২৪ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হবে।

দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হচ্ছে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত দেশের সমপর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। এ লক্ষ্যে আগামী বছরের মধ্যে জাতিকে নতুন পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা রূপকল্প-২০৪১ উপহার দেয়ার কথাও বলা হয়েছে। আর গতকালের বাজেট বক্তৃতায়ও ২০৪১ সালকেই সামনে নিয়ে এসেছেন অর্থমন্ত্রী।

দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে ইশতেহারে বলা হয়েছে, ইতোমধ্যে বার্ষিক দারিদ্র্য হ্রাস ২ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। শিক্ষা ও মানব উন্নয়ন বিষয়ে বলা হয়েছে, শিক্ষানীতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তাবয়ন এবং শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ বাড়ানো হবে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা হবে।

নারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে উপবৃত্তি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের পৃথক বেতন স্কেল ও স্থায়ী বেতন কমিশন গঠন করা হবে। উচ্চশিক্ষার প্রসার ও ভর্তি সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে প্রতিটি জেলায় একটি করে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় করা হবে।

PM.. Muhit.. 2সরকারের চলতি মেয়াদে জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা, অতি দরিদ্র ও দুস্থদের জন্য বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ, কাজের বিনিময়ে খাদ্য ও টেস্ট রিলিফ ছাড়াও একটি বাড়ি একটি খামার, আশ্রায়ণ, গৃহায়ণ, আদর্শ গ্রাম, গুচ্ছগ্রাম, ঘরে ফেরা প্রভৃতি কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন শেখ হাসিনা। এ ছাড়া বয়স্ক ভাতা, দুস্থ মহিলা ভাতা, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তদের ভাতা অব্যাহত থাকবে বলে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে বলা হয়।

জনগণের কাছে দেয়া বিপুল প্রতিশ্রুতি পূরণ করাই সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ। এবারের বাজেটেও এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রয়াস রয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ ল্য অর্জনে নতুন অর্থবছরের জন্য বড় ব্যয়ের বাজেট দিল সরকার, যাতে গুরুত্ব পেয়েছে বিদ্যুৎ, সড়ক যোগাযোগ, বন্দর, ভৌত অবকাঠামো, কৃষি, পল্লী ও মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাত।

বাজেটকে ‘প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন ও সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রযাত্রা’ আখ্যায়িত করে অর্থমন্ত্রী বলেন, গত বছর ছিল সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনের শেষ বছর। এসব লক্ষ্য অর্জনে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে আমরা উল্লেখযোগ্য সফলতা পেয়েছি। প্রতি দশকেই আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বেড়েছে প্রায় ১ দশমিক ০ শতাংশ হারে। বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে এক উন্নয়ন বিস্ময়। তিনি বলেন, এসব কর্মকৌশল বাস্তবায়ন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশকে সংরক্ষণ করে অপরিসীম প্রাণশক্তিতে ভরপুর এই উদ্যমী জাতি অচিরেই পৌঁছে যাবে সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্তে।

সরকারের ধারাবাহিকতা দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে উচ্চতর এক সোপানে পৌঁছে দেবে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, আর্থ-সামাজিক অবস্থা উন্নয়নে দারিদ্র্য বিমোচনই আমাদের সব কর্মকা-ের মূল লক্ষ্য। চলতি অর্থবছরেই ৭ দশমিক ০৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। এর ফলে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৬৬ ডলারে উন্নীত হবে বলেও জানান তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, দারিদ্র্য, অসমতা, নারীর ক্ষমতায়ন, স্যানিটেশন, মাতৃমৃত্যু, আয়ু, শিক্ষা প্রভৃতি সামাজিক সূচকে দেশের অবস্থান আরো সুদৃঢ় হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে এ দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে দেখতে চাই। এ লক্ষ্য অর্জনে আমরা প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, আয়ের সুফল সার্বজনীন করা, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বক্তৃতায় তার স্বপ্নের দিগন্ত প্রসারিত করার কথা উল্লেখ করে ‘আগামীর পথে অগ্রযাত্রা : খাতভিত্তিক পরিকল্পনা’ অধ্যায়ে মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অবসর সুবিধা বোর্ড, বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারীদের কল্যাণ ট্রাস্ট, সড়ক-সেতু অবকাঠামো উন্নয়ন, যানজট নিরসন, রেল উন্নয়ন, নদীর নাব্য বৃদ্ধি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সুরক্ষা, নারী ও শিশু উন্নয়ন বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে মিল রেখে বাজেটে যোগাযোগ খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। অর্থবছরের জন্য যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এবারের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৮ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে শিক্ষাকে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিগত অর্থবছরগুলোর মতো এবারো শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে মোট বাজেটের ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ। এবার শিা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ৪৯ হাজার ১০ কোটি টাকা। গতবার ছিল ৩১ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা।

পদ্মা সেতু সরকারের অন্যতম রাজনৈতিক অঙ্গীকার। শুধু পদ্মা সেতুর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৬ হাজার ২৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। বাজেটে সরকার বরাবরই কৃষি খাতকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে আসছে। প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৩ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, বাজেটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

বরাদ্দ করা হয়েছে মোট বাজেটের এক হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। রেল যোগাযোগের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেটে রেলপথ খাতে উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন মিলিয়ে ১১ হাজার ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। সড়ক ও মহাসড়কে ১০ হাজার ৯১০ কোটি, নৌ-পরিবহনে ২ হাজার ৫৫ কোটি এবং বেসামরিক বিমান ও পর্যটন খাতে ৫৪৯ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে।

নারীর ক্ষমতায়নে এ সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। এ লক্ষ্যে জাতীয় বাজেটে নারীর অংশ নিশ্চিত করতে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে ২ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী বলেন, আগের ধারাবাহিকতায় নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ, যৌন নির্যাতন, যৌন হয়রানি, নারী ও শিশুপাচার রোধে সংশ্লিষ্ট আইনের যথাযথ প্রয়োগ করা হবে।

জাতীয় উন্নয়নে নারীকে সম্পৃক্ত করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, শিা ও কর্মেেত্র নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি ধর্মের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে নারীবিদ্বেষী প্রচারণা ও সামাজিক বিধি-নিষেধ আরোপের বিরুদ্ধে সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইনগত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। তিনি আরো বলেন, নারীকে স্বাবলম্বী করতে ক্ষুদ্রঋণ কাযকর্মের সম্প্রসারণ করা হবে। নারীর দতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ প্রণোদনা থাকছে।

সমাজের সুবিধাবঞ্চিত বিভিন্ন গোষ্ঠীকে নানা ধরনের ভাতা দেয়া অব্যাহত রেখেছি উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এর আওতায় ২ মার্চ পর্যন্ত মোট ১৪ লাখ ৯০ হাজার ১০৫ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। শনাক্তকৃত সব প্রতিবন্ধী ব্যক্তির তথ্য ডিজএবিলিটি ইনফরমেশন সিস্টেম ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের জন্য বাজেটে ১ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা রাখার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী।

বাজেট বক্তৃতার শেষে অর্থমন্ত্রী সব ধরনের অকল্যাণকর ও জনবিরোধী কর্মকা- থেকে বিরত থাকার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, শত প্রতিকূলতার মাঝেও জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন ও অংশগ্রহণ, উদ্দীপ্ত যুবশক্তির গঠনমূলক কর্মোদ্যাগ এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রজ্ঞা ও দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাবে এক আলোজ্জ্বল আগামীর পথে। ২০৪১ সালের বাংলাদেশ বিশ্বসভায় পরিচিত লাভ করবে একটি সমৃদ্ধ, আধুনিক ও কল্যাণ রাষ্ট্রের অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here