টাকা থাকলেই কি শেয়ার ব্যবসা করা যায়?

2
6793

নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি- ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী হিসেবে শেয়ার মার্কেটে আছি ২০০৭ এর শুরু থেকে। কোন প্রকার পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই অনেকটা ঝোঁকের বশে  পুঁজিবাজারে ঢুকে পড়ি। এক বন্ধুর পরামর্শে মাত্র ৩০ হাজার টাকায় একটি ব্যাংক শেয়ার কিনে শুরু। প্রথম ২/৩ দিন দাম বাড়লেও এর পর থেকেই মূল্য পতন শুরু। দাম যত পড়ে আমার হতাশা তত বাড়ে। অথচ বাজারে অন্য ব্যাংকগুলোর শেয়ার দর তখন বাড়ছিল।

পতনের কারণ খুজতে গিয়ে বুঝতে পারলাম– এ ব্যবসার অ-আ, ক-খ কিছুই আমি জানিনা। কোন কিছু না জেনে, না বুঝে, ধার করা বিদ্যায় ব্যবসা করলে লোকসান সম্ভব। এটা আমার সৌভাগ্য যে, শেয়ারবাজারে লাভের আগেই ক্ষতি হওয়ায় আমার টনক নড়ে। টাকা হারানোর শোক ভুলে তাই শেয়ারবাজার নিয়ে পড়া-লেখা শুরু করি। নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়।

ইন্টারনেট ঘেটে বিভিন্ন ব্লগ, ওয়েবসাইট, ম্যাগাজিন, পত্রিকা পড়েই শিখছি বাজারে ব্যবসার নিয়ম-কানুন। খুবই কষ্টকর পদ্ধতি, কোথা থেকে শুরু করব- এটা বুঝতেই ৬ মাস লেগেছিল আর রিসোর্সের সল্পতা ছিলই। আমাদের শেয়ার বাজারের মূল সমস্যা হল- প্রচুর অজ্ঞ বিনিয়োগকারীর উপস্থিতি, এখানকার ৮০ ভাল লোক শিক্ষিত হলেও তাদের কতজনে শেয়ার ও শেয়ার মার্কেট সম্পর্কে জ্ঞান রাখে! আর জ্ঞান লাভের চেষ্টা করে কতোজনে তা  আল্লাহই জানে। তবুও সবার লাভের চেষ্টা, সন্তোষজনক।

প্রথমেই আসুন শেয়ার বাজারের প্রচলিত কিছু টার্মস শিখি-

  • Earning Per Share (EPS): শেয়ার প্রতি আয় – ধরুণ কোম্পানি ‘ক’ এর মোট বাৎসরিক আয় ১০০ টাকা এবং মোট শেয়ারের সংখ্যা ১০ টি । সুতরাং শেয়ার প্রতি আয় হল ১০০/১০ = ১০ টাকা । এটি যত বেশি হবে সেই শেয়ার তত বেশি ভাল হলে বিবেচিত হবে।
  • Net Asset Value (NAV): শেয়ার প্রতি নিট সম্পদ –একটি কোম্পানি দুই ধরণের উৎস থেকে তার ব্যবসায়িক মূলধন যোগাড় করে – (১) শেয়ার ধারীদের মূলধন ও (২) ধার/ ব্যাংক লোন। এই মূলধনে অর্জিত সম্পদ থেকে সব ধরনের লোন বাদ দিলে পাওয়ায় যায় নিট সম্পদ।
  • ধরুন কম্পানি ক এর নিট সম্পদ ১০০০ টাকা এবং মোট শেয়ারের সংখ্যা ১০ টি । সুতরাং শেয়ার প্রতি নিট সম্পদ হল ১০০০/১০=১০০ টাকা । এটা যত বেশি হবে সেই শেয়ার তত ভাল এবং এর দাম ও বেশি হবে।
  • Price Earning Ratio (P/E): কোম্পানির বাজার মূল ও আয়ের অনুপাত। ধরুন কম্পানি ক এর শেয়ার প্রতি আয় ১০ টাকা এবং মার্কেটে চলতি মূল্য ১৪০ টাকা । সুতরাং দাম ও আয়ের অনুপাত হল ১৪০/১০ = ১৪ । এটা যত বেশি হবে সেই শেয়ার বিনিয়োগের জন্য তত বেশি ঝুকিপূর্ণ। সাধারনত এই অনুপাত ২০ এর বেশি হলেই সেই শেয়ারকে ঝুকিপূর্ন ভাবা হয়। শেয়ার কেনার সময় এই অনুপান যত কম হয় ততই ভাল।
  • Face value : শেয়ারের প্রাথমিক মূল্যের উপর ভিত্তি করে কোম্পানি ক্যাশ বোনাস ঘোষণা করে। আমাদের বাজারের প্রয় সব শেয়ারের ফেস ভ্যালু এখন ১০ টাকা।
  • Market value: – চলতি বাজার মূল্য।
  • The authorized capital: – কোন কম্পানির সর্বোচ্চ মূলধনের পরিমান (আপার লিমিট)।
  • Paid-Up Capital: শেয়ারের প্রাথমিক মূল্য/ফেস ভ্যালু অনুযায়ি সকল শেয়ারের মোট মূল্য।

ব্যবসা বাণিজ্য সম্পর্কিত পত্রিকা, ডিএসইর নিউজ পড়ুন। শেয়ার বাজারে থাকা কোম্পানিগুলোর খোঁজ-খবর এখানেই পাবেন। আর যারা সেকেন্ডারি মার্কেটে যাবেন তারা বিনিয়োগ করার পুর্বেই বাজার পর্যবেক্ষণ করুন এবং আপনার বাজার সম্পর্কিত জ্ঞান কতটা- তা যাচাই করুন। বাজারে লেনদেন শুরুর আগে ভার্চুয়াল ট্রেডিং করুন। মানে প্রথমে কাগজে-কলমে বা কল্পিত টাকায় শেয়ার কিনে ২/৩ মাস ব্যাবসা করুন।

প্রথমেই মনে মনে ধরুন আপনার কাছে ১,০০,০০০ টাকা আছে । এবার আপনার পছন্দের শেয়ারগুলো কিনুন (ভার্চুয়ালি)। লাভ হলে বেচুন আর লস হলে বাঁচার উপায় খুঁজুন। এভাবে ৩-৪ মাস ভার্চুয়াল ট্রেডিং করলেই আপনি বুঝতে পারবেন আসল মার্কেটে আপনার অবস্থা কেমন হবে। এই বাজারে আপনিও মুনাফা করতে সক্ষম? কনফিডেন্স অর্জিত হলেই নগদ টাকায় ধীরে ধীরে বিনিয়োগ শুরু করুন।

2 COMMENTS

  1. সালাম নিবেন,আপনার আর্টিকেলটি পড়লাম,ভাল লাগলো। এ মার্কেটকে আমি বেশ ভয় পাই,কারন আমি ২০০৯’র জানুয়ারী মাসে প্রথম সেকেন্ডারী মার্কেটে অল্প পুজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করি। ব্যবসায় লাভ সন্তোষজনক হয়ায় পরবর্তীতে আরো কিছু মোট ৫ লক্ষ টাকা,এটা লাভ আসলে মিলে ২০১০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দাড়াই ৮.৫ লক্ষ টাকায়। এরপর ধ্বস নামে মার্কেট ভাল হবে মনে করে মূলধন তুললাম না। এই টাকা ৩ লক্ষে নেমে আসে। বর্তমানে আবারও কিছু পুজি নিয়ে (৩ লক্ষ টাকা) গত ২২/১১/১৫ তারিখে পূনরায় ব্যবসা শুরু করি। আমি নেটের বিভিন্ন মাধ্যমে শেয়ার মার্কেট সম্পর্কে ধারনা নেয়ার চেষ্টা করি তবুও মনে হয় যে, এখানে আমার ঙ্গান খুবিই অপ্রতুন মনে হয়। আপনি যে আটিকেলটি লিখেছেন সে গুলো আমি যাচাই করে দেখি কিন্তু এখানে আমার প্রশ্নের কোন উত্তর পায়নি। এন.এ.ভি কম,এসেট ভ্যালূ কম,পি.ই বেশী অনেক ক্ষেত্রে এসব শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে।
    এব্যাপারে আপনার কিছু ঙ্গান আমাকে শেয়ার করলে আমি ধন্য হবো।
    আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন।

    • সালাম। আপনার পর্যবেক্ষন সঠিক। মার্কেটে প্রায়ই লক্ষ করা যায় যে কম ইপিএস, কম এনএভি ও বেশী পিই এমন স্টকগুলোর দাম লাগামহীন ভাবে বাড়ে। বিনিয়োগের জন্য বিপদজনক হলেও এদের মুল্য বৃদ্ধি অনেক বিনিয়োগকারীকে চুম্বকের মত আকর্ষন করে। একটু লক্ষ করলে দেখবেন যে এদের প্রায় সব গুলই ছোট মূলধনের কোম্পানি। মাত্র ২০-৩০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের এই কোম্পানিগুলোর শেয়ার সংখ্যা অনেক কম। তাই চাইলেই বড় পুঁজির জুয়ারীরা এগুলোর দাম ব্যপক ভাবে উঠা নামা করাতে পারে। কোম্পানির আয় রোজগারের সাথে এদের মুল্যের কোন সম্পর্ক নেই। উতপাদন বন্ধ বা ক্রমাগত লোকসানে থাকা কোম্পানিও কারসাজির পাল্লায় পড়ে দাম হু হু করে বাড়ে। এগুলোর দাম যেহেতু অল্প কিছু বড় বিনিয়োগকারীর ইচ্ছানুযায়ি বাড়ে কমে সেহেতু ছোট পুঁজির বিনিয়োগকারিদের জন্য এগুল মৃত্যু ফাদ। হাতে গোনা ২-৪ লাভ করতে পারলেও অধিকাংশই উচ্চমূল্যে শেয়ার কিনে লম্বা সময়ের জনয় আটকে যায় অথবা ক্ষতি স্বীকার করে এই ফাদ থেকে মুক্তি পান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here