চেইনশপ ‘স্বপ্ন’, বিক্রি বাড়লেও কি লোকসানে থাকবে?

0
373

সিনিয়র রিপোর্টার : করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে দেশের বেশিরভাগ জেলাই লকডাউনে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রায় সব ধরনের শিল্পকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। তবে নিত্যপণ্য সামগ্রী বিক্রেতা হিসেবে সুপারশপগুলো খোলা রয়েছে।

সাধারণ মানুষও করোনা সংক্রমণ রোধে কাঁচাবাজার এড়িয়ে চলায় সুপারশপগুলোতে ভিড় করছেন। ফলে সুপারশপগুলোয় বেচাকেনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর সুফল পেতে শুরু করেছে দেশের সবচেয়ে বড় রিটেইল চেইনশপ ‘স্বপ্ন’। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের সময় প্রতিষ্ঠানটির বিক্রি বেড়েছে ৫০ শতাংশ।

তবে করোনাভাইরাসের এই সংক্রমণকালে বিক্রিতে এমন উল্লম্ফনের পরও স্বপ্ন কি লোকসান এড়াতে পারবে? এমন প্রশ্ন তুলছেন স্বপ্নর মূল কোম্পানি এসিআই লিমিটেডের বিনিয়োগকারীরা। হুমায়ুন আহমেদ নামে একজন বিনিয়োগকারী বলেন, স্বপ্নর বিক্রি প্রতিবছরই বাড়ছে। তবে এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লোকসানও বাড়ছে।

ধারাবাহিকভাবে স্বপ্নর বড় অঙ্কের লোকসানের প্রভাব মূল কোম্পানি এসিআইয়েও পড়ছে। এতে বিনিয়োগকারীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান এসিআই লিমিটেডের একটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান রিটেইল চেইনশপ ‘স্বপ্ন’। ২০০৮ সালে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর পর থেকেই স্বপ্ন ধারাবাহিক লোকসানে রয়েছে। প্রতিবছরই এর লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে। তবে করোনাভাইরাস স্বপ্নর জন্য আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করছে।

বর্তমানে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের বিক্রি কমলেও এই রিটেইল চেইনশপটির বিক্রিতে বড় অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর গত মার্চ মাসে বিক্রি থেকে স্বপ্নর আয় হয়েছে ১৩১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

২০১৮-১৯ হিসাব বছরে প্রতি মাসে স্বপ্নর গড় বিক্রি ছিল ৮২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর চলতি ২০১৯-২০ হিসাব বছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রতিষ্ঠানটির মাসিক গড় বিক্রি দাঁড়ায় ৯১ কোটি টাকায়।

অঙ্কের হিসেবে বিক্রি বাড়লে মুনাফাও বাড়বে। তবে স্বপ্নর ক্ষেত্রে এ হিসাবটা কাজ করছে না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে কোম্পানিটির বিপুল ব্যাংকঋণ ও এর সুদজনিত ব্যয়। বড় অঙ্কের ব্যাংকঋণ থাকায় ধারাবাহিকভাবে স্বপ্নর বিক্রি বাড়লেও সুদবাবদ অস্বাভাবিক ব্যয়ের কারণে লোকসান গুনতে হচ্ছে। অবশ্য ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের কারণে কোম্পানিটি পরিচালন মুনাফাও করতে পারেনি। যদিও মার্চে বিক্রি থেকে প্রাপ্ত আয়ে উল্লম্ফনের কারণে পরিচালন মুনাফার মুখ দেখেছে বলে জানিয়েছেন স্বপ্নর নির্বাহী পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির।

সাব্বির হাসান নাসির বলেন, স্বপ্ন বর্তমানে দেশের শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলোর একটি। গ্রাহক আস্থা ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে পারায় প্রতিদিনই স্বপ্নর বিক্রি বাড়ছে। এছাড়া করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে আমাদের হোম ডেলিভারিও বেড়েছে। ফলে গত মার্চে স্বপ্নর বিক্রি বেড়েছে ৫০ শতাংশ বেশি। তবে চলতি মাসে সরকার সুপারশপ চালানোর সময় কমিয়ে দিয়েছে। তারপরও এপ্রিলে বিক্রিতে ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রয়েছে।

সাব্বির বলেন, বিক্রি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্নর পরিচালন মুনাফাও বেড়েছে। এখন আমরা পরিচালন মুনাফায় রয়েছি। তবে ব্যাংকঋণের কারণে নিট লোকসানে পড়তে হচ্ছে।

২০১৮-১৯ হিসাব বছরে স্বপ্নর নিট লোকসান হয় ১৫৭ কোটি টাকা, যা আগের বছর ছিল ১৩৫ কোটি টাকা। ২০১৮-১৯ হিসাব বছর শেষে স্বপ্নর পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫২ কোটি টাকা, যা ২০১৯-২০ হিসাব বছরের প্রথমার্ধে ১ হাজার ১৩০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৮-১৯ হিসাব বছর শেষে স্বপ্নর ব্যাংকঋণ ছিল ৬৮৭ কোটি টাকা।

এসিআই সূত্রে জানা গেছে, সুদজনিত ব্যয়ে বিপুল লোকসানের কারণে স্বপ্নর জন্য অংশীদার খুঁজছে এসিআই। গত বছর স্বপ্নর অংশীদারিত্ব নিতে বিদেশি কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে স্বপ্নর ভ্যালুয়েশন নিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দ্বিমত থাকায় এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি এসিআইর পর্ষদ।

কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে স্বপ্নর ভ্যালুয়েশন ছিল ৩৩০ মিলিয়ন ডলার। এখন বিক্রিতে যে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে তাতে এর ভ্যালুয়েশন ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে বলে কোম্পানিটির কর্মকর্তারা মনে করছেন। তবে পর্ষদের প্রত্যাশা আরও বেশি বলে জানা গেছে। স্বপ্ন পুরো অথবা আংশিক বিক্রির বিষয়ে চলতি বছরও বিদেশিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তবে করোনার কারণে তা এখন থমকে গেছে।

এসিআইর সাবসিডিয়ারিগুলো ১০টি খাতে বিভক্ত। এর মধ্যে স্বপ্নসহ মোট পাঁচটি খাতে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে এসিআইকে। বিগত বছরগুলোতে সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান এসিআই লজিস্টিকের রিটেইল চেইনশপ ‘স্বপ্ন’ এসিআই লিমিটেডের সবচেয়ে বড় লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ছিল।

চলতি হিসাব বছরে লোকসানি কোম্পানি হিসেবে স্বপ্নকে ছাড়িয়ে গেছে অপর সাবসিডিয়ারি এসিআই হেলথকেয়ার লিমিটেড। চলতি প্রথমার্ধে এ সাবসিডিয়ারি করপূর্ববর্তী লোকসান দিয়েছে ৮৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এ সময় রিটেইল চেইন শপ স্বপ্নর করপূর্ববর্তী লোকসান দাঁড়িয়েছে ৭৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

এছাড়া কনজিউমার ব্র্যান্ড, ফুডস ও প্রিমিয়াফ্ল্যাক্সও লোকসানে রয়েছে। সব মিলিয়ে পাঁচ খাতের ব্যবসায় এসিআইর সাবসিডিয়ারিগুলো চলতি প্রথমার্ধে ২৬০ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here