৪টি কৌশলে ৮০ শতাংশ অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমেই পাচার

0
545

সিনিয়র রিপোর্টার : চার কৌশলে অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে অর্থ পাচার। ৮০ শতাংশ অর্থ পাচারই ব্যাংকের মাধ্যমে হয়। তা হলো- আমদানি রপ্তানিতে পণ্য ও সেবায় ওভার এবং আন্ডার ইনভয়েসিং, আমদানি-রপ্তানীতে বহুমাত্রিক ইনভয়েসিং, পণ্য ও সেবা সম্পর্কে মিথ্যা বর্ণনা। একইভাবে শিপমেন্টের ক্ষেত্রেও ওভার এবং আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমেও অর্থ পাচার হচ্ছে।

রাজধানীর মিরপুরে বিআইবিএম অডিটোরিয়াম এবং বাংলাদেশ ব্যাংক চট্টগ্রাম অফিসে মঙ্গলবার ‘ট্রেড সার্ভিসেস অপারেশনস অব ব্যাংকস’ শীর্ষক বার্ষিক পর্যালোচনা কর্মশালায় গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে আসে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এবং বিআইবিএম নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান।

এছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন বিআইবিএমের মুজাফফর আহমেদ চেয়ার প্রফেসর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বরকত-এ-খোদা, পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হেলাল আহমদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এবং বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলি।

আরো উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক মূল্যায়ন এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা অধিদফতরের কমিশনার ড. মঈনুল খান এবং এইচএসবিসি ব্যাংকের গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড রিসিভেবলস ফাইন্যান্সের কান্ট্রি হেড মোহাম্মদ শহিদুজ্জামান। কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধূরী।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে সব পণ্য আমদানিতে কম শুল্ক দিতে হয়, বিশেষ করে মূলধনী যন্ত্রাংশ, শিল্পের কাচাঁমাল এবং খুচরা যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে বেশি মূল্য দেখিয়ে অর্থ পাচার করা হয়। আবার সরকারি প্রণোদনা পেতে রপ্তানি পণ্যে বেশি মূল্য দেখানো হয়।

বিআইবিএমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের জন্য এ মুহূর্তে ইউএন কনভেনশন গ্রহণ করা প্রয়োজন। এছাড়া অর্থ পাচার ঠেকাতে এলসি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোরারোপ করা হয়।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্ন্তজাতিক বাণিজ্যের অর্থায়নে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের আধিপত্য বেশি। ২০১১ সালে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে রফতানি হয় ৭১ শতাংশ। সেই সময় রাষ্ট্রায়াত্ত্ব বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে হয়েছিল ১৮ শতাংশ। অবশিষ্ট বিদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ২০১৭ সালে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে রফতানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ শতাংশ। রাষ্ট্রায়াত্ত্ব ব্যাংকের কমে দাঁড়িয়েছে পাঁচ শতাংশে।

আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ট্রেড সার্ভিসের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেকটি দেশে ট্রেড সার্ভিসের ক্ষেত্রে আলাদা রেগুলেশন রয়েছে। এক্ষেত্রে আমরাও নতুন গাইডলাইন করতে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, বর্তমানে ব্যবসাভিত্তিক অর্থপাচার বাড়ছে। তবে অর্থপাচার প্রতিরোধে কাজ করছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফইউ)।

বিআইবিএমের চেয়ার প্রফেসর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. বরকত-এ- খোদা বলেন, অর্থ পাচার বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেও অর্থ পাচার ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না।

পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হেলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, এলসি গ্যারান্টি ও ফি কমানোর জন্য বাংলাদেশকে ভিয়েনা কনভেনশনের সদস্য হওয়া উচিত। কেননা, আমাদের বেশিরভাগ রপ্তানী হয় ইউরোপ ও আমেরিকাতে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিসের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ হুমায়ূন কবির বলেন, চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যাংক কর্মীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। এনবিআরের (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) কাস্টমস ভ্যালুশন অ্যান্ড ইন্টারনাল অডিট কমিশনারেটের কমিশনার ড. মঈনুল খান বলেন, অর্থ পাচারের ৮০ শতাংশই ট্রেডের মাধ্যমে হচ্ছে। বর্তমানে এটা প্রতিরোধ করা জরুরী হয়ে পড়েছে। বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচার বন্ধ করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, অর্থ পাচার বন্ধে এলসি খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তারা জড়িত হয়ে পড়ে। ব্যাংকগুলোকে অর্থ পাচারের কৌশল তদারকি করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বিআইবিএমের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াছিন আলী বলেন, এটি খুবই আশঙ্কার বিষয় যে, ৮০ শতাংশ অর্থ পাচারই ব্যাংকের মাধ্যমে হয়। শুধু অর্থপাচারের ক্ষেত্রে নয়, রাষ্ট্রয়াত্ত্ব ব্যাংকগুলো সমস্যায় আছে। এই সমস্যা সমাধানে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।

তিনি বলেন, ঋণের সুদহার কমানোর কথা বলা হচ্ছে। ঋণের সুদহার কমালে আমানতের সুদহারও কমবে। তবে আমানতের সুদহার কখনো মূল্যস্ফীতির নিচে নামানো যাবে না। সম্প্রতি ব্যাংক মালিকরা নানা দাবি দাওয়া আদায়ের ইস্যু তুলে তিনি বলেন, ব্যাংক মালিকরা নানা ইস্যু নিয়ে সরকারের কাছে যায়। কিন্তু, খেলাপি ঋণ আদায়ের ব্যাপারে তাদের উদ্যোগ কি? খেলাপি ঋণ আদায়ে এবং মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে তারা কি সরকারের কাছে সাহায্য চেয়েছে?

এইচএসবিসি ব্যাংকের কান্ট্রি হেড অব গ্লোবাল ট্রেড অ্যান্ড রিসিভ্যাবলস ফিন্যান্স মোহাম্মদ শহিদুজ্জামান বলেন, অর্থ পাচার রোধে প্রথমেই ব্যাংককেই ভূমিকা পালণ করতে হবে। ব্যাংক তার দায়িত্ব পালন করলেই অর্থ পাচার কমে আসবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here