চরম অস্থিতিশীল ব্রাজিলের অর্থনীতি

0
265

ডেস্ক রিপোর্ট : ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কট্টর ডানপন্থী জাইর বোলসোনারো এ বছরের ১ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি যখন দায়িত্ব নেন তখন দেশটির অর্থনীতি চরম অস্থিতিশীল অবস্থার মধ্যে ছিল। বোলসোনারো তার মেয়াদে অর্থনীতি সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন অনেকেই। একদল তার ওপর মোটেও আস্থা পারছিলেন না। তবে তার ক্ষমতায় আরোহন নিয়ে একটি গোষ্ঠী চরম উল্লসিত ছিল। এই দলটি হচ্ছে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়।

ব্রাজিলের ব্যবসায়ীরা নতুন প্রেসিডেন্ট বোলসোনারোকে ঘিরে আশায় বুক বাঁধলেও নির্বাচনের সময় থেকেই তিনি কিন্তু অর্থনীতি বিষয়ে নিজের অজ্ঞতার কথা দম্ভ নিয়েই বলে আসছেন। ক্ষমতায় আসার পর অর্থনীতি বিষয়ক সমস্ত সিদ্ধান্তের দায়-দায়িত্ব ব্যবসায়ী পাওলো গুয়েদেসের ওপর ছেড়ে দেন। প্রেসিডেন্টের চরম নির্ভরশীলতার কারণে তিনি দেশের অর্থনীতির ‘সুপার-মিনিস্টার’ হিসেবে আবির্ভূত হন। দায়িত্ব গ্রহণের পর এই অর্থমন্ত্রী দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলতে নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহনের অঙ্গীকার করেন।

তবে এসময় ব্রাজিলের অর্থনীতিকে আরেকটি মন্দার সম্ভাবনা থেকে টেনে তোলাই ছিল সবচেয়ে বড় কাজ। কারণ তখনও দেশটির অর্থনীতি দুই বছর আগের মন্দার ধাক্কায় ধুঁকছিল। দেশটির অর্থনীতি ২০১৪ সালের পরিস্থিতির মধ্যে আটকে রয়েছে। এ অবস্থায় অর্থমন্ত্রী গুয়েদেস কর ব্যবস্থা সহজ করা, পেনশন ব্যবস্থা সংস্কার, সম্পদ বিকেন্দ্রীকরনের মতো নানা ধরনের সংস্কারের কথা বলেন। বিনিয়োগকারীরাও উদার সংস্কারের সম্ভাবনা নিয়ে বেশ উচ্ছসিত ছিলেন।

কিন্তু এ উল্লাস থেমে যেতে বেশিদিন সময় লাগেনি। একের পর এক ভুলে সরকারের প্রতি প্রত্যাশার আলোটি ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। দায়িত্ব শুরুর পাঁচ মাসের মাথায় প্রশাসনের ভেতরেই রাজনৈতিক কূটচাল শুরু হয়েছে। এছাড়া দেশের জ্বালানি নীতিমালায় কুৎসিতরকম হস্তক্ষেপ এবং কংগ্রেসে সঠিক নেতৃত্বের অভাবের কারণে প্রবৃদ্ধি নিয়ে সার্বিক প্রত্যাশাই এখন ম্রিয়মান। এ অবস্থায় ব্রাজিলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস অর্ধেকে নামিয়ে এনেছেন বিশ্লেষকরা। এমনকি তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ২০২০ সালের আগে দেশটির অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির দেখা পাওয়া যাবে না।

ব্রাজিলের অর্থনীতি যে সত্যিই সামনে এগুচ্ছে না তা বোঝার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করা হলো।

কোন ধরনের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না
গত দশকে ব্রিকসভুক্ত (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) দেশগুলোর মধ্যে তারকা  হিসেবে ব্রাজিলের নাম উচ্চারিত হতো। উদীয়মান দেশগুলোর এ জোটটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বর্তমানে সুপারফাস্ট গতিতে এগুচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে এসব দেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিক থেকে উন্নত দেশগুলোকে ছাড়িয়ে যাবে।

তবে এই দশকে ব্রাজিলের অর্থনীতিতে যে ধরনের গতি দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে না যে ব্রিকসের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সমানতালে পা মেলাতে পারবে দেশটি। ২০১৫ ও ২০১৬ সালের মন্দায়  দেশটির অর্থনীতি প্রায় সাত শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। এখান থেকে পুনরুদ্ধারের গতিও খুব শ্লথ। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতিটি বছরে বড়জোর ১ দশমিক ১ শতাংশ সম্প্রসারিত হয়েছে।

দুঃসংবাদের এখানেই শেষ নয়। বছরের  শুরুতেই অর্থনীতিবিদরা ২০১৯ সালের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস অর্ধেকেরও বেশি কমিয়েছে।

বেকারত্বের সমস্যা ঘোচে নি
ব্রাজিলের অর্থনীতির দুঃসময়ে যাদেরকে সবচেয়ে বেশি মূল্য চুকাতে হচ্ছে তাদের মধ্যে অন্যতম দেশটির শ্রমগোষ্ঠী। ২০১২ সালে দেশটিতে বেকারত্বের সংখ্যা ছিলো ৭৬ লাখ। চলতি বছর যা বেড়ে হয়েছে এক কোটি ৩৪ লাখ। খোদ প্রেসিডেন্টই মনে করছেন এই সংখ্যা বাস্তব চিত্র প্রতিফলিত করছে না। পরিস্থিতি আরো ভয়ানক।

বেকারত্বের ওপর সরকারের পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে,দেশের কর্মগোষ্ঠীর মধ্যে দুই কোটি ৮৩ লাখের শ্রম ব্যবহৃত হচ্ছে না। অর্থাৎ এই মানুষগুলো হয় কাজ করছে না অথবা সামর্থের তুলনায় কম কাজ করছে তারা। আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ করছেন এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে  মজুরিও বাড়ছে না। চারবছর আগে ব্রাজিলে মন্দা শুরুর পর থেকে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ২৫ শতাংশ বেড়েছে।

নির্বাচন পরবর্তী উদ্যেম হারিয়ে ফেলেছে মুদ্রা ও শেয়ারবাজার
নির্বাচনকালীন সময়ে ব্রাজিলের মুদ্রা রিয়াল শক্তিশালী হয়ে উঠে। এটি ছিলো বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দৃঢ় আস্থার পরিস্কার সংকেত। গত বছরের শেষের দিকে প্রধান আন্তর্জাতিক কৌশুলিদের নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করে ব্লুমবার্গ। সেখানে দেখা যায় মুদ্রা, বন্ড ও শেয়ারবাজার-  এ তিনটি বিষয়ের ওপর বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি বাজি রাখছেন।

কিন্তু পাঁচমাস পর সামগ্রিক পরিস্থিতিই প্রায় উল্টে গিয়েছে। শেয়ার ও মুদ্রাবাজার দুটিই আবার বছরের শুরুর অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছে।

এখনো ঋণে নিমজ্জিত
ব্রাজিলের বামপন্থী সরকার জিলমা হোসেফের আমলে বিভিন্ন সরকারি কাজে বিপুল পরিমান অর্থ ব্যয় করা হয়। ফলে দেশটির আর্থিক ঘাটতিও বেড়ে যায়। দেশের এ পরিণতির জন্য অভিশংসনের মুখে পড়তে হয় হোসেফকে। তার পতনের পর ব্রাজিল সরকার আর্থিক ঘাটতি কমিয়ে আনতেই তার সমস্ত শক্তি ব্যয় করতে থাকে।

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন ব্রাজিলের অর্থনীতির এ দশার জন্য মূল দায়ি পেনশন ব্যবস্থা। অন্যান্য দেশের তুলনায় ব্রাজিলের কর্মীরা অনেক আগেই অবসর গ্রহন করে থাকেন (৫০ বছরের শুরুতেই)। সঙ্গে নেন বিপুল পরিমান সুবিধাও। বিশেষ করে সরকারি কর্মচারীরা এ সুবিধা সবচেয়ে বেশি পেয়ে থাকে। এ অবস্থায় বোলসোনারো অবসরভাতা কমিয়ে আনার পাশাপাশি অবসর গ্রহনের বয় পুরুষদের জন্য ৬৫ ও নারীদের জন্য ৬২ করার প্রস্তাব দিয়েছেন।

ব্রাজিলের সার্বিক ঋণের পরিমান এখন অর্থনীতির ৫১ শতাংশ। সরকার বলছে এখনই কোন পদক্ষেপ গ্রহন না করা হলে ২০২৩ সাল নাগাদ ঋণের আকার দাঁড়াবে সার্বিক অর্থনীতির সমান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here