গ্রীস ইকোনমিক ক্রাইসিস কি, কেন, কি বা হবে ?

1
5958

মোহাম্মাদ মুশফিকুর রহমান : অনেকেই আমরা গ্রীস ইকোনমিক ক্রাইসিস শুনচ্ছি চারিদিকে। কিন্তু কি, কেন, কি বা হবে কিছুই বুঝি না। বাংলাদেশে ও কি এ রকম হতে পারে? আসুন জেনে নেই কি বা আছে গ্রীস ইকোনমিক ক্রাইসিসে।

প্রসঙ্গ গ্রীস ইকোনমিক ক্রাইসিসঃ
এখন মজা করে বলা হচ্ছে যদি তোমার পকেটে জিরো ইউরো থাকে এবং তোমার কোন দেনা না থাকে তাহলে তুমি গ্রিসের চেয়ে প্রায় ৩৫০ বিলিওন ইউরো ধনী। গ্রীসের অবস্থা ভয়াবহ, ব্যাংকে টাকা নাই বলে বাধ্য হয়ে গ্রীসের সব ব্যাংক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ATM বুথগুলো এখনও খোলা আছে কিন্তু নিয়ম করা হয়েছে একজন দিনে সর্বচ্চ ৬০ ইউরো তুলতে পারবে বুথ থেকে। পুরো দেশ প্রায় ৩৫০ বিলিওন ইউরো দেনায় ডুবে আছে।
ইউরোপিয়ান একটি ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রির এই অবস্থা কেন? কিভাবে হলো? কেন হলো? এখন ওদের পরিণতি কি? আসুন একটু ঘেঁটে দেখা যাক।
একদম ব্যাসিক থেকেই শুরু করি। ধরুন আপনার বন্ধু আলমের একটা দোকান আছে। তো তার খুব অর্থনৈতিক সমস্যা, দোকানে মাল নাই, দোকান চলতেছে না এইসব বলে সে আপনার কাছে এক হাজার টাকা ধার চাইলো। সে আপনার ভালো বন্ধু, সুতরাং আপনি টাকাটা তাকে দিলেন। দিয়ে বললেন ঠিক একমাসে যেন ফেরত দিয়ে দেয়। একমাস গেলো, টাকাটা ফেরত চাইলে সে আবারও দোকানে কাস্টমার নাই, মাল নাই এইসব বিভিন্ন ওজুহাতে বলল সে আপাতত কোনভাবেই টাকাটা ফেরত দিতে পারবে না, টাকা তারকাছে নাই ই, ফেরত দিবে কোথা থেকে? এখন আপনি চিন্তা করলেন আপনার ১০০০ টাকা কি তাইলে পানিতে যাবে? শেষে আপনি নিজে থেকেই তাকে আরও ১০০০ টাকা ধার দিলেন, দিয়ে বললেন এই টাকা দিয়ে দোকানে আবার মালামাল তোলো, নিজে একটু কম বাজেখরচ করো, মনোযোগ দিয়ে দোকান করো। তারপর টাকা জমিয়ে একসাথে আমার ২০০০ টাকা দুইমাস পরে ফেরত দিয়ো। এই ব্যাপারটাকে অর্থনৈতিকভাবে বড় স্কেলে বলা হয় “Bailout”। এটার অর্থ হচ্ছে অর্থনৈতিকভাবে খতিগ্রস্থ কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠানকে অর্থনৈতিক সাহায্য প্রদান করা যাতে করে তারা সেই টাকায় নিজেদের অবস্থার উন্নতি করে আপনার আগের পাওনা সহ এখনকারটা পরিশোধ করতে পারে। এইবার ধরেন, আপনার বন্ধু আলম আপনার কথা শুনলো না, দোকানে মনোযোগ দিলো না, নিজে নিজের ব্যাক্তিগত বাজে খরচ কমালো না এবং তারফলে যা হবার তাই হলো, দুইমাস পরে সে আপনার ২০০০ টাকা ফেরত দিতে পারলো না। এখন আপনি তার উপর একটু রাগান্বিত হলেন। শেষমেশ আপনাকে শান্ত করতে সে বলল – আচ্ছা দোস্ত মাইন্ড কইরো না, আসো একটা ডিল করি। আমি তোমারে এই ২০০০ টাকা মাসপ্রতি ২০০ টাকা কইরা ১০ মাসের ইন্সটলেশনে দিয়ে দিবো, এই নাও এই মাসের ২০০ টাকা। প্রতিমাসের প্রথম দিনেই তুমি ২০০ কইরা পাইয়া যাবা কথা দিলাম। আপনি বাধ্য হইয়া রাজি হইলেন। এইটাকে অর্থনীতির ভাষায় বলে “Restructuring the Debt” বা “Refinancing of Loans”। কিন্তু রাজি হইয়া আপনি কিছু কন্ডিশন দিয়ে দিলেন, যেমন আলমকে প্রতিদিন ১৪ ঘন্টা দোকানে বসতে হবে, আলম প্রতিমাসে ৩ হাজার টাকার বেশি খরচ করতে পারবে না ইত্যাদি। আলম অলস মানুষ, তার জন্য দিনে ১৪ ঘণ্টা কাজ করা অনেক টাফ, কিন্তু বাধ্য হয়ে রাজি হইলো। এইটাকে বলা হয় “Austerity Measures”। মানে Debt Restructuring এর সময় দেয়া শর্তাবলি। এইটুকু বুঝলে গ্রীসের অবস্থা ধরতে খুব সুবিধা হবে।


কাহিনীর শুরু বলা যায় ২০০১ সালে যখন কিছু পলিটিক্যাল এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গ্রীস EU এর ইনভাইটেশনে “The Single Currency Fold” এ যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য হয়। সোজা কথা, তখন থেকে গ্রীসের ন্যাশনাল কারেন্সি হয়ে যায় ‘ইউরো’।
আর ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার সুবাদে অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন গতিশীল করার লক্ষ্যে তারা EU অধ্যুষিত ব্যাংক এবং IMF থেকে সহজ শর্তে এবং একরকম বিনা সুদে ঋণ নেয়ার অধিকার অর্জন করে। এই সুবিধার ব্যাপক মিসইউজ করে গ্রীস। ইচ্ছামতো বিপুল পরিমাণ ইউরো ধার নেয় ইউরোপিয়ান ব্যাংক এবং IMF থেকে। এবং সবথেকে ভয়ানক ভুল যেটা করে সেটা হলো আপনার বন্ধু আলমের মতই বাজে খরচ করা শুরু করে। যেমন প্রয়োজনীয়ভাবে প্রচুর টাকা খরচ করে এথেন্স অলিম্পিক আয়োজন, পাবলিক সেক্টরে হিসাবছাড়া ব্যয়, রিটায়ারড সিটিজেনদেরকে দেয়া হিউজ পেনসান ইত্যাদি ইত্যাদি। আরেকটা বড় সমস্যা তাদের জন্য যেটা সেটা হলো তাদের অর্থনীতির একটা বিশাল অংশ Tourism Based হয়ে যায়। টুরিস্টরা কিন্তু ক্যাস ইউরো খরচ করে ঘুরেফিরে চলে যায়, তারা সরাসরি সরকারকে কোন ট্যাক্স দেয়না। এবং সেখানে প্রায় ৩০% সিটিজেন unemployed। সুতরাং ট্যাক্স ফ্লো খুব কম। সবমিলিয়ে এসব কারনে শেষমেশ তারা সময়মত EFSF এবং IMF এর দেনা সময়মত শোধ করতে ব্যর্থ হয়। শেষে আলমকে আপনি যেমন আবার টাকা দিয়েছিলেন ঠিক সেভাবেই IMF আবার গ্রীসকে ধার বা Bailout দেয় এবং তাদের ইকোনমি পুনরুদ্ধার করে টাকা ফেরত দিতে বলে। এভাবে বেশ কিছু Bailout পাওয়ার পর গ্রীস যখন বুঝতে পারে তারা এই টাকা ফেরত দিতে পারবে না তখন তারা Debt Restructuring এর আবেদন করে এবং বলে যে আগামী ৫০ বছরে নির্দিষ্ট ইন্সটলেশনে এই টাকা শোধ করবে। IMF এবং EFSF তখন বলে তারা এই ডিল মেনে নিবে যদি গ্রীস কিছু Austerity তে রাজি থাকে। যেমন গ্রীসের পাবলিক সেক্টরে ব্যয় কমাতে হবে, লাইব্রেরী, পেনশন ইত্যাদি খাতে তারা যে বাড়তি ব্যয় করছে সেটা কমাতে হবে, জনগণের ট্যাক্স বাড়াতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিছু কিছু শর্ত খুব brutal। এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা যে, কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিশাল ঋণে পড়লে তার কাছে দেশের সার্বভৌমত্ব হারাতেই হয়, মানে তাদের কথা মানা ছাড়া উপায় থাকেনা। আর ঐতিহাসিক কারণেই গ্রীসের জনগনের প্রাইড এবং দেশপ্রেম একটু বেশি। বাইরের অর্গানাইজেশনের কথামতো তারা চলবে না। দেশের সার্বভৌমত্ব বিসর্জিত হয় এমন কিছু তারা করবে না, না খেয়ে মরলেও না।


গ্রীসের অনেক জনগনই এই Austerity Plan মানেনি। জনগনের এই ইমোসনকে কাজে লাগিয়ে গ্রীসের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী Alexis Tsipras তার নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন। তার নির্বাচনী ইশতেহার ছিলো সে অস্টেরিটি প্লানের ঘোরতর বিরোধী এবং সে বিভিন্ন সোশ্যাল প্রোগ্রামে কন্সেন্ট্রেট করে সেখান থেকে নতুন জব তৈরি করে Money Flow বাড়াবে এবং দেনা পরিশোধ করবে। এই এজেন্ডার কারণে হিউজ মেজরিটি নিয়ে সে এই বছরের শুরুতে নির্বাচনে জয়লাভ করে গ্রীসের প্রধানমন্ত্রী হন। নির্বাচনে তো জয়ী হলেন, এইবার তো বাস্তবতা ফেস করতে হবে। তিনি আর মানি ফ্লো বাড়াতে পারলেন না। চলতি মাসে গ্রীসের IMF এর কাছে ১.৭ বিলিওন ইউরো এবং ইউরোপিয়ান ব্যাঙ্কের কাছে ৩.৫ বিলিওন ইউরো পাওনা ছিলো। সেটা তার সরকার শোধ করতে পারেননি। এই মর্মে শেষ মিটিং এ IMF আর EFSF বলেছে গ্রীস যদি এখনও তাদের Austerity Plan মেনে নিতে রাজি থাকে তাহলে তারা এই দেনা আবার নতুন Debt Restructuring এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ফেরত দেয়ার সুযোগ দেবে। অবশ্যই নতুন এই Austerity Plan অনেক Brutal এবং তাদের দেশের সার্বভৌমত্বের একরকম পরিপন্থিই বলা যায়। প্রধানমন্ত্রী Alex এই Austerity Plan মানবেন না সোজা জানিয়ে দিলেন, না খেয়ে মরলেও তিনি দেশের সার্বভৌমত্ব খোয়াতে রাজি নন। তো এখন যেটা হয়েছে সেটা হলো এই বিশাল দেনার কারণে কোন ইনভেস্টর নতুন করে ইনভেস্ট করছে না, সরকার কাউকে লোন দিচ্ছে না, দেশে নতুন চাকরি নাই, মানুষের পকেটে টাকা নাই, ব্যাংকে টাকা নাই, আনএমপ্লয়মেন্ট বারতেছে, সব মিলে গ্রীসের ভজঘট অবস্থা। তো এই সিচুয়েসনে বাধ্য হয়ে আগামী পরশুদিন পাঁচ তারিখে এই Austerity Plan নিয়ে একটি Yes-No ভোটের আয়োজন করা হয়েছে যেখানে জনগন ডিসাইড করবে তারা Austerity এর পক্ষে না বিপক্ষে। পক্ষে বেশি ভোট পড়লে Alex এবং তার সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে আর বিপক্ষে বেশি ভোট পড়লে সে এবং সরকার থাকবে কিন্তু সেক্ষেত্রে আল্টিমেটলি হয়তো গ্রীসকে EU থেকে বের হয়ে যেতে হবে এবং শুধু তাই না পুরা গ্রীসে প্রবল অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়ে যাবে। কারণ No Austerity means No deal। Austerity plan পাস না হলে EU গ্রীসকে আর কোন অর্থ সাহায্য দেবে না। But দেশের এই অবস্থায় তাদের সাহায্য লাগবেই, নাহলে গ্রীসের খুব শীঘ্রই জিম্বাবুয়ে, মিয়ানমার বা কেনিয়ার মতো দেশে পরিনত হতে সময় লাগবে না।


এই হলো গ্রীসের বর্তমান অবস্থা, যেদিকেই যাক দেশের অবস্থা খুব ভালো হওয়ার আর সম্ভাবনা নাই। Austerity মেনে নিলে সারাজীবনের জন্য EU এর দাস হয়ে যেতে হবে, না মেনে নিলে না খেয়ে মরতে হবে। ঋণ এমনই ভয়াবহ জিনিস।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here