সিনিয়র রিপোর্টার : প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থে এ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স লিমিটেডের নন-অক্সিডাইজিং ফারনেস (এনওএফ) প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিসহ অবকাঠামো স্থাপনের কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

শুধু গ্যাসের সরবরাহ পেলে এক মাসের মধ্যেই পরিবেশবান্ধব এ প্লান্টে উত্পাদন শুরু সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন কোম্পানির কর্মকর্তারা।

গতকাল নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে এ্যাপোলো ইস্পাতের কারখানা ঘুরে দেখা যায়, এনওএফ প্রকল্পের জন্য জার্মানি থেকে আমদানি করা সব যন্ত্রপাতি বসানোর কাজ শেষ। অবকাঠামোগত স্থাপনার নির্মাণকাজ আগেই সম্পন্ন হয়েছে। সম্প্রতি এ প্রকল্পের জন্য গ্যাস বরাদ্দের অনুমোদনও পেয়েছে কোম্পানিটি। তবে সেখানে এখনো গ্যাস সংযোগ পায়নি তারা।

গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে এক মাসের মধ্যেই প্লান্টটি চালু করা যাবে বলে জানিয়েছেন কোম্পানিটির জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জহির হোসেন। তিনি বলেন, নতুন এ প্রকল্পে উত্পাদন শুরু হলে কোম্পানির বার্ষিক বিক্রি ৫১৮ কোটি টাকা বাড়বে বলে আশা করছি, যার সুবাদে বার্ষিক মুনাফা প্রায় ৪৩ কোটি টাকা বাড়বে। একই সঙ্গে এ প্লান্টে ২৫০ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে। শুল্ক, মূসক ও কর বাবদ বছরে কোম্পানির কাছ থেকে সরকার আরো ৭০ কোটি টাকা পাবে।

কোম্পানির প্রকৌশলীরা জানান, নন-অক্সিডাইজিং ফারনেস বা এনওএফ হচ্ছে এমন এক প্রযুক্তি, যেখানে অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে টিন উত্পাদন করা হয়। এ ধরনের টিনে সহজে মরিচা ধরে না। এ কারণে এনওএফ প্রযুক্তিতে উত্পাদিত টিনের স্থায়িত্ব অনেক বেশি হয়।

এছাড়া সাধারণ প্রযুক্তির কারখানায় অ্যাসিড ব্যবহার করে টিনের কাঁচামাল থেকে ধুলাবালি সরানো হয়। কিন্তু এনওএফ প্রকল্পে উচ্চ তাপের সাহায্যে ধুলাবালি ও ময়লা পরিষ্কার করা হবে। এনওএফ প্রযুক্তিতে সালফিউরিক অ্যাসিড, কস্টিক সোডা ও লেডের ব্যবহার ছাড়াই ঢেউটিন উত্পাদন করা হয়। এ কারণে একদিকে প্রকল্পটি তুলনামূলক বেশি পরিবেশবান্ধব।

এ্যাপোলো ইস্পাতের মহাব্যবস্থাপক (প্রকল্প) লে. কর্নেল (অব.) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, প্রচলিত পদ্ধতিতে ঢেউটিন গ্যালভানাইজিংয়ের ক্ষেত্রে জিংকের পাশাপাশি সিসাও ব্যবহার হয়, যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাছাড়া এ পদ্ধতিতে গ্যালভানাইজিং করা টিনের স্থায়িত্বও কম হয়ে থাকে। এ কারণেই পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ঢেউটিন তৈরির লক্ষ্যে নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়।

কর্মকর্তারা আরো জানান, ২০১৩ সালে পুঁজিবাজারে ১০ কোটি শেয়ার ছেড়ে মোট ২২০ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করে এ্যাপোলো ইস্পাত। আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের মধ্যে ১৫৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ পরিশোধ ও ৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা নতুন এনওএফ প্রকল্পে ব্যয়ের ঘোষণা দেয় কোম্পানি।

২০১৫ সালের মধ্যেই এ প্রকল্পে বাণিজ্যিক উত্পাদন শুরুর পরিকল্পনা ছিল তাদের। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলার মতো ঘটনার কারণে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বিদেশী টেকনিশিয়ানরা  সময়মতো কাজে আসছিলেন না। এ কারণে এনওএফ প্রকল্পের কাজ সঠিক সময়ে শেষ হয়নি। তাছাড়া তীব্র ঘাটতির কারণে নতুন করে গ্যাসের সংযোগ প্রদান বন্ধ থাকাও প্রকল্পের কাজ পেছানোর একটি কারণ।

তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ নির্দেশনায় গত মে মাসে অন্য কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে এ্যাপোলো ইস্পাতের নতুন প্লান্টেও গ্যাস সংযোগ দেয়ার অনুমোদন হয়। এর পর পরই প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করে চালুর উদ্যোগ নেয় কোম্পানিটি।

প্রসঙ্গত, ষাটের দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান থেকে জিপি শিট আমদানি করে স্থানীয় প্লান্টে ঢেউটিন তৈরি করার মাধ্যমে ব্যবসা শুরু করেন এ্যাপোলো ইস্পাতের উদ্যোক্তারা। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে এ্যাপোলো স্টিল মিলসের যাত্রা শুরু হয়। উচ্চ চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৩ সালে  কোম্পানিটি দ্বিতীয় লাইন চালু করে।

পরে ১৯৯৭ সালে জাপানি প্রযুক্তির সমন্বয়ে দেশের সর্বপ্রথম কন্টিনিউয়াস গ্যালভানাইজিং লাইন (সিজিএল) চালু করে এ্যাপোলো ইস্পাত কমপ্লেক্স লিমিটেড। বর্তমানে এ্যাপোলো ইস্পাতের সিআই শিট উত্পাদন ক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন। কোম্পানিটি কোল্ড রোল্ড কয়েল, গ্যালভানাইজড কয়েল ও শিট উত্্পাদন করে থাকে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশে ঢেউটিনের বাজারের সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ একেএস স্টিলের মুরগি মার্কা ঢেউটিনের দখলে। আর ১৮ দশমিক ৫০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার নিয়ে তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে এ্যাপোলো ইস্পাতের রানী মার্কা ঢেউটিন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here