ভাটির পথে গোল্ডেন সান

0
2097

বিশেষ প্রতিনিধি : বাংলাদেশ ও তাইওয়ানের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত গোল্ডেন সান লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি প্রধানত গৃহস্থালি বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করে থাকে। পাশাপাশি গার্মেন্ট অ্যাকসেসরিজ, খেলনা, ইলেকট্রিক ফ্যান ছাড়াও বিভিন্ন স্পেয়ার পার্টস তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি।

সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান গঠন করে সময়ে সময়ে ব্যবসায় সম্প্রসারণও অব্যাহত রাখে প্রকৌশল খাতের কোম্পানিটি। তবে ব্যবসা চলছে উল্টো রথে। তিন বছর ধরে কোম্পানির বিক্রি ধারাবাহিকভাবে কমছে। চলতি বছর লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে দীর্ঘদিন মুনাফায় থাকা কোম্পানিটি।

গোল্ডেন সানের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১২ সাল পর্যন্ত কোম্পানির উৎপাদিত পণ্যের বিক্রি ও মুনাফা ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে। তবে পরের বছর থেকেই পণ্য বিক্রিতে চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে কোম্পানিটি। এর সঙ্গে যোগ হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা। এতে ধারাবাহিকভাবে বিক্রি কমতে থাকলেও ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত কোম্পানিটি নিট মুনাফা দেখাতে সক্ষম হয়। তবে নতুন হিসাব বছরের শুরুতে পণ্য বিক্রি ৬৩ শতাংশ কমে যাওয়ায় ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা নিট লোকসান করে এ কোম্পানি।

২০১২ সালে গোল্ডেন সান ১৭৮ কোটি ৮১ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করে। পরের বছরগুলোয় বিক্রি কমে ২০১৩ সালে ১৬৬ কোটি ও ২০১৪ সালে ১৪১ কোটি ৯০ লাখ টাকায় নেমে আসে। রফতানি কমতে থাকায় কোম্পানির নিট মুনাফাও কমতে থাকে। ২০১২ সালে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী মুনাফা ছিল ৪৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা, যা ২০১৪ সালে দাঁড়ায় ৩০ কোটি ৬২ লাখ টাকা।

গত ৩০ জুন পর্যন্ত ১৮ মাসে নিট মুনাফা ১৫ কোটি ২৮ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। অথচ ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসেই কোম্পানির নিট মুনাফা ছিল ১৯ কোটি ১৩ লাখ টাকা। বিক্রি অনেক কমে যাওয়ায় হিসাব বছরের পরবর্তী সময়ে লোকসান গোনে কোম্পানিটি।

লোকসানের এমন অবস্থার জন্য গোল্ডেন সানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) আমিনুল ইসলাম রাজনৈতিক অস্থিরতাকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, ২০১৪ ও ২০১৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা কোম্পানির গার্মেন্ট অ্যাকসেসরিজের ব্যবসায় বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কোম্পানি অনেক গ্রাহক হারায়, যার প্রভাব এখনো রয়েছে। এছাড়া অগ্নিনির্বাপণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কমপ্লায়েন্ট না হওয়ায় অ্যাকর্ড-অ্যালায়েন্সের স্বীকৃতিও পাওয়া যাচ্ছে না। এটিও বিক্রির ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে চলতি বছরের মধ্যে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাসহ কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন আমিনুল ইসলাম। বিক্রি বাড়লে অধিকাংশ বাধা দূর হবে। এছাড়া এ সময়ে গোল্ডেন সানের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান গোল্ডেন ইনফিনিটিও বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসবে, যা মোট বিক্রি বাড়াতে সহায়ক হবে।

পূর্ববর্তী কয়েক প্রান্তিকে লোকসানের ধারাবাহিকতায় চলতি প্রথম প্রান্তিকে (২০১৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) কোম্পানির বিক্রি এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ৬৩ শতাংশ কমে গেছে। সাবসিয়ািরি প্রতিষ্ঠানসহ হিসাব করলে গেল প্রান্তিকে গোল্ডেন সানের মোট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ১৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

সময়ের ব্যবধানে বিক্রির বিপরীতে কোম্পানির উৎপাদন ব্যয়ও অনেক বেড়ে গেছে। চলতি প্রথম প্রান্তিকে বিক্রীত পণ্যের উত্পাদন ব্যয় (কস্ট অব গুডস সোল্ড) প্রায় ৯৮ শতাংশে ঠেকেছে, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৭৫ শতাংশ।

উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পর প্রশাসনিক ও সুদ বাবদ খরচের পর কোম্পানির পরিচালন লোকসান দাঁড়ায় ৪ কোটি ৩ লাখ টাকা, যেখানে ২০১৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে কোম্পানির পরিচালন মুনাফা ছিল ৬ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। গেল প্রান্তিকে অবশ্য অপরিচালন আয়ের সুবাদে চলতি প্রথম প্রান্তিকে লোকসানের বোঝা কিছুটা হালকা হয়েছে। অপরিচালন আয়, কর ও অন্যান্য আয়-ব্যয় মিলিয়ে গেল প্রান্তিকে শেষ পর্যন্ত নিট লোকসান দাঁড়ায় ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ছিল ৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ব্যবসায়িক বিভিন্ন দিকের পাশাপাশি কোম্পানির মূল উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেলাল আহমেদের অসুস্থতা এবং চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিবাদও কোম্পানির স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করেছে। বেলাল আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সারে ভুগছেন। রফতানি বাড়ানোর বিষয়গুলো মূলত তিনিই দেখভাল করতেন। কাস্টমসের সঙ্গে কিছু বিবাদে কোম্পানির ওয়্যারহাউজ সিলগালা করার মতো ঘটনাও ঘটে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিক্রি কমতে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নিয়মিতভাবেই ব্যবসায় সম্প্রসারণ করে আসছে গোল্ডেন সান। ২০১২ সালে প্রেসার কুকারসহ বিভিন্ন তৈজসপত্র উৎপাদন ও রফতানির জন্য তাইওয়ানের প্রতিষ্ঠান চি-হুং টেকনোলজির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে আলাদা কোম্পানি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয় গোল্ডেন সান। যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হয় গোল্ডেন সিএএসএ লিমিটেড। কোম্পানিতে গোল্ডেন সানের মলিকানা ৭০ শতাংশ ও চি-হুংয়ের মালিকানা ৩০ শতাংশ।

গোল্ডেন সিএএসএ লিমিটেড বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর পর ২০১৩ সালে একটি ডায়িং কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেয় গোল্ডেন সান। জিএসএল ডায়িং লিমিটেড নামের সাবসিডিয়ারিটি গঠনের ঘোষণা আসে ২০১৩ সালের অক্টোবরে। কোম্পানির ৯০ শতাংশ শেয়ার গোল্ডেন সানের কাছে আর বাকি ১০ শতাংশ শেয়ারের মালিক বেলাল আহমেদ।

২০১৪ সালের ১ মার্চ আরেকটি সাবসিডিয়ারি কোম্পানি গঠনের ঘোষণা আসে। শতভাগ খেলনা রফতানির লক্ষ্যে জার্মান শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী স্টিফেন ক্রিসটেনশনের সঙ্গে যৌথভাবে জিএসএল এক্সপোর্ট লিমিটেড নামের কোম্পানিটি গঠন করে গোল্ডেন সান।

সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানে ৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে গোল্ডেন সান। জিএসএল এক্সপোর্ট লিমিটেড ২০১৪ সালের অক্টোবরেই বাণিজ্যিক উত্পাদনে আসে। সে সময় গোল্ডেন সান জানিয়েছিল, প্রথম বছরে জিএসএল এক্সপোর্ট লিমিটেড ৪০ কোটি টাকার পণ্য রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে। তবে মূল কোম্পানির বর্তমান বিক্রি ও মুনাফায় এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে না।

এছাড়া স্টিলের বিভিন্ন আসবাব তৈরির জন্য গোল্ডেন ইনফিনিটি নামে আরো একটি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে গোল্ডেন সান। সাবসিডিয়ারিটির কারখানা স্থাপন ও মেশিনারি ক্রয়ে ৯২ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। গোল্ডেন ইনফিনিটির ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ শেয়ারের মালিক গোল্ডেন সান।

বিভিন্ন সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান গঠন ও এতে অর্থায়ন করতে গিয়ে গোল্ডেন সানের সুদ বাবদ খরচ বাড়ছে। ২০১৫ সালের প্রথম নয় মাসে কোম্পানির সুদ বাবদ খরচ হয়েছে ৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩ কোটি টাকা। আর চলতি প্রথম প্রান্তিকেই সুদ বাবদ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা।

২০০৭ সালে শেয়ারবাজারে আসা গোল্ডেন সানের পরিশোধিত মূলধন ১৭১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ২০১২ সালে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ৪ টাকা ২৬ পয়সা। ৩০ জুন পর্যন্ত ১৮ মাসে তা ৮৯ পয়সায় নেমে আসে আর চলতি প্রথম প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয় ১৩ পয়সা।

উল্লেখ্য, রফতানির শর্তে কারখানার জন্য কাঁচামাল আমদানির পর তা খোলাবাজারে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ (বন্ড সুবিধার অপব্যবহার) উঠেছে তালিকাভুক্ত কোম্পানি গোল্ডেন সান লিমিটেডের বিরুদ্ধে। দুই বছরে অভিযোগে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে তিনটি মামলা করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট চট্টগ্রাম কার্যালয়।

তবে শুল্ক কর্মকর্তাদের অনুসন্ধানকে ত্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করে তা পুনঃঅনুসন্ধানের জন্য এনবিআর চেয়ারম্যানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে গোল্ডেন সান কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপের কথাও জানিয়েছে কোম্পানিটি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here