শাহীনুর ইসলাম : গুজব ও নেতিবাচক প্রচারণার ষড়যন্ত্রের মধ্যেই আয় ও মুনাফা বেড়েছে শতভাগ রপ্তানি নির্ভর পোশাকখাতের আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান রিং শাইন টেক্সটাইল লিমিটেডের। কিন্তু হঠাৎ করেই গুজবের শিকার হয়ে কোম্পানিটির সুনাম এবং ব্যবসা কার্যক্রমে এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

তবে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের দক্ষতা এবং শক্তহাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ফলে গুজব কাটিয়ে উঠেছে রিং শাইন টেক্সটাইল কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্টরা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

সূত্র জানায়, প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে তোলা ১৫০ কোটি টাকা নিয়ে রিং শাইন টেক্সটাইল লিমিটেডের ‘তিন পরিচালক দেশ ছেড়েছেন’। ‘কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাবে।’

গত বছরের শেষের দিকে এমন গুজব রটে। বাস্তবে কোম্পানিটির পরিচালকরা নববর্ষ পালনে ৯ জানুয়ারি এমডিসহ ৩ পরিচালক নিজ দেশ তাইওয়ানে গিয়েছিলেন। কোম্পানির তহবিলে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেননি।

গুজবের বিষয়ে জানা গেছে, কোম্পানিটি শেয়ারবাজার থেকে আইপিওর ১৫০ টাকা তুলে ব্র্যাক ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে জমা রাখে। আবার ব্র্যাক ব্যাংক থেকে এ কোম্পানি ঋণও নিয়েছে। এ অবস্থায় আইপিওর টাকা সরিয়ে নিলে ঋণের অর্থ আদায় অসম্ভব হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

ঋণ পরিশোধের চিত্র প্রকাশ করেছে ডিএসই

গুজবের আপদকালীন মুহূর্তে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা ঢাকা-চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ রিং শাইন কোম্পানি নিয়ে ‘ভিত্তিহীন গুজব’ সম্পর্কে কোন তথ্য প্রকাশ করেনি। এতে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ এবং শতভাগ রপ্তানীনির্ভর কোম্পানিটির সুনাম, শেয়ারপ্রতি দরসহ অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে চলতি অর্থবছরের ৬ মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা কমেনি বরং ৩১ শতাংশ বেড়েছে।

ভিত্তিহীন গুজবের গুজবে ভেঙ্গে পড়া কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সুং ওয়ে মিনসহ তিন পরিচালক গত ২৯ জানুয়ারি দেশে ফিরে কাজে যোগ দিয়েছেন। একই সঙ্গে রিং শাইন টেক্সটাইলের পরিচালনা পর্ষদ প্রোসপেক্টাস অনুযায়ী অর্থ হাতে পাওয়ার ১৮ মাসের মধ্যে নির্দিষ্ট সময়ে বিদেশি উরি ব্যাংকের ২২ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ প্রক্রিয়া সংশোধন করেছে।

গুজবের কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, রিং শাইন টেক্সটাইলের মূল উদ্যোক্তা সিঙ্গাপুরের সুং ইয়াও মিন ও গো জিওক সিয়ান। তারা দুজনই ২০০২ সালে তাদের সমদুয় শেয়ার কোম্পানিটির বর্তমান চেয়ারম্যান সুং জাই মিন ও পরিচালক হ্যাং শিই লাইয়ের কাছে হস্তান্তর করেন। বর্তমানে কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন সুং উই মিন।

গুজবের পেছনে রয়েছে, দেশের বেসরকারি একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও সরকারদলীয় নেতা রিং শাইন কোম্পানির এমডি সুং ওয়ে মিনকে তার ব্যাংকে আইপিও থেকে পাওয়া ১৫০ কোটি টাকা জমা রাখতে বলেন। একই সঙ্গে তার ব্যাংক থেকে সব ফরেন এলসি করার চাপ দেন। এতে বিমর্ষ হয়ে পড়েন এমডি।

শেয়ারপ্রতি দরের চিত্রটি স্টক বাংলাদেশ থেকে নেয়া

ঠিক এ সময়ে নববর্ষ পালন এবং এমডির শ্বাশুড়ি মারা যাওয়ায় গত ৯ জানুয়ারি এমডিসহ ৩ পরিচালক ও উদ্যোক্তাসহ মোট ৯ জন নিজ দেশ যান। তারা সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক। এ সময় ছড়িয়ে পড়ে গুজব। সেই গুজব ঠেকাতে ও ব্যবসার হাল ধরতে ২৯ জানুয়ারি দ্রুত দেশে ফিরে আসেন তিন পরিচালক।

তারা হলেন- ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সুং ওয়ে মিন এবং পরিচালক ও এমডির বোন সুং ওয়েন লি অ্যাঞ্জেলা এবং পরিচালক ও এমডির মামী হাসিয়ো লিউ ই চাই।

অভিযোগ রয়েছে, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ খেলাপিদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছেন। তালিকায় রিং শাইন টেক্সটাইলের খেলাপি হওয়া ঋণের পরিমাণ ৪২ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে এই কোম্পানির কোনো খেলাপী ঋণ নেই।

আইপিও প্রসপেক্টাসে তিনটি পদ্ধতিতে কোম্পানিটির শেয়ারের ভ্যালুয়েশন করা হয়েছে। এর মধ্যে ইকুইটিভিত্তিক ভ্যালুয়েশনে কোম্পানিটির শেয়ারদর ২৩ টাকা ১৭ পয়সা, হিস্টোরিক্যাল আর্নিংয়ের ভিত্তিতে ২৮ টাকা ৪৬ পয়সা ও সমজাতীয় শেয়ারের বাজারমূল্যের গড়ের ভিত্তিতে কোম্পানিটির শেয়ারের ভ্যালুয়েশন ৩২ টাকা ১১ পয়সা।

ঋণশূন্য কোম্পানিটির গুজব ছড়িয়ে পড়ায় বর্তমানে শেয়ারের দও কমেছে। কোম্পানি হারাতে বসেছে তার ব্যবসায়িক সুনাম। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রপাগান্ডায় দেশে-বিদেশে নষ্ট হচ্ছে কোম্পানিটির সব সম্ভাবনা।

এদিকে, রিং শাইন টেক্সটাইলের দ্বিতীয় প্রান্তিকে শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) ৩১ শতাংশ বেড়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের ৬ মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর’১৯) এ মুনাফা বেড়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) জানায়, চলতি অর্থবছরের ৬ মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে শূণ্য দশমিক ৯৬ টাকা। আগের বছরের একই সময়ে ইপিএস হয়েছিল শূণ্য দশমিক ৭৩ টাকা। সে হিসাবে মুনাফা বেড়েছে শূণ্য দশমিক ২৩ টাকা বা ৩১ শতাংশ।

প্রথম প্রান্তিকে আইপিও পরবর্তী এবং করপরবর্তী মুনাফা হয়েছে ১৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, যা আগের একই সময়ে ছিল ১৪ কোটি ২১ লাখ টাকা। প্রথম প্রান্তিকে ইপিএস ৭০ পয়সা হয়, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৫০ পয়সা।

খেলাপি ঋণের বিষয়ে রিং শাইন টেক্সটাইলসের আইপিও প্রসপেক্টাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাভারের গণকবাড়ীতে ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ডিইপিজেড) কোম্পানিটি ১৯৯৮ সালে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। রিং শাইন টেক্সটাইলসের ৩০ জুন ২০১৮ সালে পণ্য বিক্রি হয়েছে ৯৯৯ কোটি ৫৩ লাখ ৪১ হাজার টাকা।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ ও শতভাগ রপ্তানী নির্ভর কোম্পানিটি ৩০ জুন ২০১৭ সমাপ্ত হিসাব বছরে ৮৮১ কোটি ২৪ লাখ ৯৬ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করেছে। কোম্পানিটির স্বল্প মেয়াদী ঋণ রয়েছে ৩৭৯ কোটি ৭৫ লাখ ২৪ হাজার টাকা, যা একটি কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনার জন্য অপরিহার্য।

প্রসপেক্টাসে রপ্তানী কাজে (এলসি) ইনভেন্টরি ২৯৩ কোটি ৫৪ লাখ এবং রিসিভেবল ২৮৪ কোটি টাকা লোন দেখানো হয়েছে। যা শতভাগ রপ্তানী নির্ভর একটি কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনার কাজে বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ রয়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। দুটির সমন্বয় করলে কোম্পানির কোন ঋণ থাকে না। যা অনেক বিনিয়োগকারী না জেনে আতঙ্কগ্রস্ত হচ্ছেন বা গুজবে তিনি ভুল করছেন।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বৃহৎ কোম্পানিটি নিয়ে বিনিয়োগকারীদের একটি পক্ষ জানিয়েছে, কোম্পানির শেয়ারের পরিমাণ বেশি এবং বিশাল মূলধনের কোম্পানি হওয়ায় ‘গেমলার এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। তাই গুজবে ক্ষতি করছে। এতে শেয়ার দর পড়লে তারা ঢুকে পড়বে এবং ঠিক সময়ে তারা বেরিয়েও যাবে।’

কিন্তু রিং শাইন টেক্সটাইল লিমিটেড কর্তৃপক্ষের যথাযথ উদ্যোগের ফলে জুয়াড়িদের অপচেষ্টা ব্যর্থ হতে চলেছে। কোম্পানিটির উৎপাদন ও রপ্তানী কার্যক্রম পুরোদমে এগিয়ে চলছে। এরফলে চলতি অর্থবছর আরো বেশি মুনাফা অর্জনের প্রত্যাশা করছে কোম্পানিটি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here